১২ জুলাই ২০১৭


বন্যায় কমেনি দুর্ভোগ, অনেকে পাননি সরকারি ত্রাণ

শেয়ার করুন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরপাড়ের বড়লেখার ছয় ইউনিয়নে ধীর গতিতে বন্যার উন্নতি হচ্ছে। শুক্রবার বিকাল থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও প্রতিদিনের বৃষ্টির কারণে দ্রুত বন্যার উন্নতি হচ্ছে না। রাস্তা-ঘাট ও বসত ঘরের কিছু পানি কমলেও বন্যার্তদের দুর্ভোগ বাড়ছে। পানি নামার সাথে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে সেই সাথে দেখা দিচ্ছে অসুখ-বিসুখ। অনেকের গায়ে জ্বর উঠেছে। যা জল বসন্তের লক্ষণ। তবে এখনো নৌকা দেখলে দুর্গত মানুষজন দৌড়ে বেসামাল ভীড় জমাচ্ছেন। মঙ্গলবার সরেজমিনে হাওর এলাকা ঘুরে জানা গেছে- এখনো সরকারি ত্রাণ পায়নি ৭০-৮০ ভাগ মানুষ।

সরকারি ত্রাণ বিতরণে কতিপয় জনপ্রতিনিধির স্বজনপ্রীতির কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, সংগঠন ও ব্যক্তি বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করছেন।

সরেজমিনে তালিমপুর ইউনিয়নের হাল্লা, পূর্বহাল্লা, খুটাউরা, আহমদপুর, নুনুয়া, দুর্গাপুর, শ্রীরামপুর, মুর্শিবাদকুরা, পাবিজুরি, গগড়া, পশ্চিম গগড়া, কটালপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এখনো ত্রাণ পায়নি প্রায় ৩’শ দুর্গত পরিবার। এরা ভোট রাজনীতির শিকার হয়ে দুর্যোগে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের ভোলারকান্দি, রাঙ্গিনগর, দশঘরি, বাড্ডা, ব্রাহ্মণেরচক গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় একই অবস্থা সরকারি ত্রাণ পায়নি অনেকে। এসব এলাকার বেশিরভাগ বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এখনো পানিতে নিমজ্জিত। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। বাহন হিসেবে নৌকাই ভরসা এসব এলাকার বাসিন্দাদের।

হাওরপাড়ের দুর্গত মানুষের জন্য উপজেলা প্রশাসন তালিমপুর ইউনিয়নের হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয়, হাকালুকি প্রাইমারি স্কুল, সুজানগরের ছিদ্দেক আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও আজিমগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলসহ ১৪টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় সাড়ে ৩’শ পরিবার মাথা গোজার ঠাঁই করে নেয়। তবে হাওরপাড়ের লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দি দিনাতিপাত করছেন। বোরো, আউশ, আমন ধান, সবজি ক্ষেত হারিয়ে নি:স্বদের নীরব কান্না চলছে। দেখা দিয়েছে গোখাদ্য চরম সংকট। হাওরে প্রচুর ঢেউ থাকায় মাছও ধরতে পারছে না মৎস্যজীবি পরিবারের লোকজন। সীমাহীন দুর্ভোগের পাশাপাশি আর্থিক অনটনে মানবেতর জীবন-যাপন হাওরপাড়ের বানভাসি মানুষের নিত্যসঙ্গী। হাওরের ভেতরের বাড়িগুলোতে আফাল ঢেউ তাদের প্রতিনিয়তই তাড়া করে। দফায় দফায় দেখা দেয়া বন্যায় হাওর তীরবর্তী বাসিন্দাদের দুর্ভোগ যেনো পিছু ছাড়ছে না।

প্রায় দুই মাস আগের থেকে তারা চরম ভোগান্তির শিকার। আর গত একমাস ধরে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়ে হাহাকার বেড়েছে হাওর তীরবর্তী মানুষের মধ্যে।

হাওর এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ – মেম্বার ও চেয়ারম্যানরা শুধু মুখ চিনে ও যারা ভোট দিয়েছে তাদেরকেই ত্রাণ দিচ্ছেন। কেউই তাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না। বন্যার্থদের সাথে যে, অন্য রকম রাজনীতি চলছে, তার প্রমাণ নিজ চোখে না দেখলে কখনো বিশ্বাস করা যাবে না।
হাওর তীরবর্তী মানুষগুলোর দাবি, ফেঞ্চুগঞ্জের বুড়িকিয়ারি বাঁধই তাদের একমাত্র দু:খের কারণ। আর এই বাঁধ অপসারণ বা হাওর খনন না করলে এ দুর্ভোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। এমনকি সিলেট বিভাগের অন্যান্য হাওরগুলোতে যেভাবে হাওর উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, সেভাবে হাকালুকির উন্নয়নে কোনো ভূমিকা এখনো দেখা যায়নি।

তালিমপুর ইউনিয়নের আহমদপুর গ্রামে বাসিন্দা বৃদ্ধা রেবতি বিশ্বাস, রায়মোহন বিশ্বাস, রাজন বিশ্বাস প্রমুখ অভিযোগ করেন – চরম দুর্ভোগ পোহালেও এখনো কেউ তাদের একমুঠো সরকারি ত্রাণ দেয়নি। ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে যাচ্ছে বাড়িঘর। কেউ কিছু না দিলেও ইউপি চেয়ারম্যান একদিন তাদের দেখে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, সাহায্য করবেন। কিন্তু এখনো কিছুই দেননি।

পশ্চিম মুর্শিবাদকুরা গ্রামের হাওরের সুবেদা বেগম, মিনারা বেগম, ফারুক আহমদ, কালা মিয়া, মঈন উদ্দিন প্রমুখ অভিযোগ করে বলেন – এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি। তবে কিছুদিন আগে একটি সংস্থার পক্ষ থেকে চিড়া, মুড়িসহ কিছু খাদ্য সামগ্রী পেয়েছেন। হাওরের ঢেউয়ের কারণে মাছও ধরা যাচ্ছে না। পরিবার পরিজন নিয়ে খুবই মানবেতর জীবন-যাপন করছি।

দুর্গাপুরের বাসিন্দা নজিব আলীর ছেলে ফখর উদ্দিন পক্ষাঘাতগ্রস্থ। আট সদস্যের পরিবার নিয়ে খুবই মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন – ত্রানর লাগি চেয়ারম্যান ও মেম্বারর দ্বারে দ্বারে ঘুরছি তবুও একটু ত্রাণ পাইছি না।

মুর্শিবাদকুরা গ্রামের সুবেদা বেগমকে দেখা গেলো এক ছেলে কোলে ও অন্য ছেলেকে নৌকায় বসিয়ে দ্রুত পাশবর্তী অপেক্ষাকৃত উঁচু বাড়িতে উঠছেন। জানালেন হাওরে আফাল ঢেউ উঠছে। ডরাইয়া (ভয়ে) হুরুতা (সন্তান) নিয়ে নিরাপদে আইলাম (আসলাম)।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজাদের রহমান জানান – ইতোমধ্যে এক হাজার ৮৫০ জন ক্ষতিগ্রস্তের মধ্যে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ২৫০.৫৮ মেট্টিক টন চাল ও ২৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এবং জিআর কর্মসূচির আওতায় দুর্গতদের মধ্যে ১৫২ মেট্টিক টন চাল ও নগদ ৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা বন্যায় দূর্গতদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। তবে কিছু কিছু এলাকায় এখনো ত্রাণ না পাওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম সুন্দর জানান- পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। সব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদেরকে বলা হয়েছে ত্রাণ সবাই যেনো পায়। তবুও কেউ কেউ ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। আমি বিষয়টি দেখছি।

 

 

(আজকের সিলেট/১২ জুলাই/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন