৯ জানুয়ারি ২০১৮


কোয়ারিতে কোয়ারিতে মৃত্যুর মিছিল

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেটে বিভিন্ন পাথর কোয়ারিতে মৃত্যুর মিছিল থামছে না কিছুতেই। পাথরখেকোদের তা-বে পাথর কোয়ারিগুলোতে শ্রমিকদের মৃত্যু যেন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা! গেল বছর বিভিন্ন কোয়ারি থেকে এবং টিলা কেটে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে প্রাণ হারান অন্তত ৩৫ জন শ্রমিক। এ বছরের শুরুটাও হয়েছে একসাথে পাঁচ পাথর শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা দিয়ে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, পাথর উত্তোলনে রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীরা জড়িত রয়েছেন। যে কারণে এদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিলেটের ভোলাগঞ্জ, জাফলং, লোভাছড়া, শাহ আরেফিন টিলা, বিছনাকান্দিসহ বেশ কয়েকটি পাথর কোয়ারি থেকে অবৈধভাবে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে পাথর উত্তোলন করছে। সরকারের পালাবদলের সাথে পাথরখেকো চক্রের নেতৃত্বেও আসে পরিবর্তন। যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে, সে দলের স্থানীয় নেতারাই হয়ে ওঠেন পাথরখেকো চক্রের মূলহোতা। এজন্য কোয়ারিগুলোতে শ্রমিকদের প্রাণহানি অব্যাহত থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের দাপটে পার পেয়ে যায় পাথরখেকোরা। পরিবেশ ধ্বংস করে চলতে থাকে তাদের তান্ডব।

সিলেট জেলা ও পুলিশ প্রশাসন হঠাৎ হঠাৎ অভিযান চালায় কোয়ারিগুলোতে, পুড়িয়ে দেয় পরিবেশ বিধ্বংসী বোমা মেশিন। কিন্তু অভিযানের দু-তিনদিন পর থেকেই ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে পাথরখেকোরা। ফলে মৃত্যুর মিছিল থামছে না কিছুতেই।

গত মঙ্গলবার বিকেলে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে সাত্তার মিয়া, হেলাল মিয়া, আলীম উদ্দিন, নান্নু মিয়া ও খালেক গংদের গর্ত থেকে পাথর উত্তোলনকালে প্রাণ হারান পাঁচ শ্রমিক। এর আগে গত বছরের ২৩ জানুয়ারি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহ আরেফিন টিলা কেটে পাথর উত্তোলনের সময় ভূমি ধসে পাঁঁচ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই টিলা থেকে পাথর উত্তোলনকারে গেল বছর আরো অন্তত ছয় শ্রমিক প্রাণ হারান। এছাড়া গত বছরের বিভিন্ন সময়ে লোভাছড়া, বিছনাকান্দি, জাফলং পাথর কোয়ারিতে মারা যান আরো অন্তত ২৪ শ্রমিক।

এদিকে, গত মঙ্গলবার পাঁচ পাথর শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ১৬ জনকে আসামি করে নিহত জহুর আলীর মেয়ে জকিরুন বেগম মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন গোয়াইনঘাট থানার ওসি (তদন্ত) হিল্লোল রায়। বুধবার দায়েরকৃত মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে বর্তমানে আরেক মামলায় কারাগারে থাকা সাত্তার মিয়াকে। পুলিশ শাহাব উদ্দিন নামের একজনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া ওই ঘটনায় কাল সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আমিনুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পরিবেশ ধ্বংস করে সিলেটে বিভিন্ন কোয়ারিতে চলছে পাথর উত্তোলন। পাথরখেকোদের তা-বে ধ্বংসের মুখে প্রকৃতিকন্যা খ্যাত জাফলং।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিম বলেন, পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের নেপথ্যে রয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। ফলে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিতে চায় না। মাঝে মধ্যে দু-একটি অভিযান চালানো হলেও তা ফলপ্রসু হচ্ছে না।

সিলেটের পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জেলা ও পুলিশ প্রশাসন কোয়ারিগুলোতে অভিযান চালালে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। পরিবেশবিধ্বংসী এই কর্মকা- বন্ধ করতে জনতার সম্পৃক্ততা ও সচেতনতা প্রয়োজন।

এদিকে, যারা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানিয়ে গতকাল বিকেলে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছে বেলা, বাপা, সনাক, ব্লাস্টসহ আটটি সংগঠন।

(আজকের সিলেট/৯ জানুয়ারি/ডি/এসসি/ঘ.)

শেয়ার করুন