১৪ জুলাই ২০১৭


হাকালুকিতে বন্যার নেপথ্যে ‘বুড়িকিয়ারি’ বাঁধ

শেয়ার করুন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় হাকালুকি হাওর সাগরে রুপ নিয়েছে। প্রায় তিন মাস ধরে এসব এলাকার মানুষ পানিবন্দী।

হাকালুকি হাওরে অকাল বন্যার অন্যতম কারণ হাওরের পানি নিষ্কাশন স্থল তথা কুশিয়ারা নদীর সাথে সংযোগস্থলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত সেই বিতর্কিত “বুড়িকিয়ারি” বাঁধ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের ভয়াবহ বন্যায় সেই বাঁধ অপসারণের দাবিতে হাকালুকি হাওর তীরে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম হয়। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়। তারপরও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, “বুড়িকিয়ারি” বাঁধ নির্মাণের পর বিকল্প উপায়ে কুশিয়ারা নদীর সাথে হাকালুকি হাওরের সংযোগস্থল অর্থাৎ জুড়ী নদীর এক কিলোমিটার খনন কাজের জন্য ২০১১ সালে ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। লুটপাট হয় সিংহভাগ টাকা। ২০১১ সালের ২ এপ্রিল তৎকালীন পানি সম্পদমন্ত্রী হাকালুকি হাওরের দুঃখ বলে পরিচিত বুড়িকিয়ারির বিতর্কিত সেই বাঁধ এলাকা ও জুড়ী নদীর সাথে কুশিয়ারার সংযোগস্থল এলাকা পরিদর্শন করেন। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কিন্তু আজও কোন সুফল পায়নি এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী, সংশ্লিষ্ট কৃষিবিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হয়। ফলে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে তিনটি উপজেলার হাকালুকি হাওর এলাকার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ও আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায়।

এরপর জুন মাস পর্যন্ত আরো কয়েক দফা টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল নেমে হাওরপাড়ের কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল, কাদিপুর, ব্রাহ্মণবাজার, বরমচাল, ভাটেরা ও জয়চন্ডী ইউনিয়ন এবং কুলাউড়া পৌর শহরের আংশিক, জুড়ীর জায়ফরনগর ও পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন এবং বড়লেখার তালিমপুর, সুজানগর, দাসেরবাজার ও বর্ণি ইউনিয়নের অন্তত শতাধিক গ্রাম বন্যাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তলিয়ে যায় কুলাউড়া-জুড়ী-বড়লেখা সড়কের বিভিন্ন স্থান।এ অবস্থায় জুন মাসের শেষ দিক থেকে ওই সড়কে বাস ও অটোরিকশা চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

তিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জলাবদ্ধ লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে আশপাশের উচু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে তোলা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠেছেন। জুড়ীর জায়ফরনগর উচ্চবিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ৩০টি পরিবার আশ্র্রয় নিয়েছে। সেখানে আশ্র্রয় নেয়া দীঘলবাক গ্রামের অনন্ত বিশ্বাস বলেন, ‘অতো দিন পানির মাঝেও বাড়িত আছিলাম। গত ১ সপ্তাহ ধরি পানি বেশি অই যাওয়ায় আর ঘরো টিকতাম পারছি না। ইখানও আইয়া উঠছি।’

কুলাউড়ার উপজেলার ভূকশিমইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, এপ্রিল মাস থেকে তার এলাকার মানুষ পানিবন্দী। পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় হাওরে পানি দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু নামছে খুব ধীরে।

কুলাউড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বী জানান, কিছু পরিবার দেড়-দুই মাস ধরে আশ্রয় কেন্দ্রে আছে। তাদের সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে কিছু দিনের মধ্যেই এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠা যাবে।

শাহ-নিমাত্রা রাবার বাগানের চেয়ারম্যান আলহাজ আজিজুর রহমান আজিজ জানান, হাকালুকি হাওরের পানি হাওরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে জুড়ী নদী হয়ে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে নিষ্কাশিত হয়। ইতিমধ্যে জুড়ী নদী পলিতে ভরাট হয়ে গেছে।

এ ছাড়া ২০০৪ সালের দিকে ফেঞ্চুগঞ্জে জুড়ী নদীর শাখার মোহনায় “বুড়িকিয়ারি” বিলের কাছে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়। আবার জুড়ী নদীর মোহনার পাশে দুটি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিনিয়তই ইটভাটার বালি নদীতে গিয়ে পড়ছে এসব কারণে দিন দিন পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে এখানে একটু পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টিপাত হলেই বন্যার সৃষ্টি হয়। তবে এবার বন্যা অবশ্য ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

 

 

 

(আজকের সিলেট/১৪ জুলাই/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন