২৩ জুলাই ২০১৭


বিয়ানীবাজার ছাত্রলীগ দুই বছরে ৪৩ সংঘর্ষ, ২ খুন

শেয়ার করুন

বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি : বিয়ানীবাজার উপজেলা ও পৌর শাখা ছাত্রলীগের কমিটি নেই ১৩ বছর থেকে। ৬ বছর থেকে সরকারি কলেজেও কমিটি নেই। উপজেলা ছাত্রলীগের সর্বশেষ আহবায়ক একটি হত্যামামলার প্রধান আসামি হয়ে ৫ মাস ধরে কারাগারে। একই কমিটির দুই যুগ্ম আহবায়কের একজনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগে ও অপরজন ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন।

বিয়ানীবাজার ছাত্রলীগ নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত দুই বছরে ৪৩ বার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। এসব সংঘর্ষে কারো চোখে গুলি লেগেছে, আবার কারো বুকে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২ শতাধিক। নিজেদের মধ্যে মারামারির দায়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে মোট ৪৭টি মামলা দায়ের করেছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে খালেদ আহমদ লিটু (২৫) নামের এক ছাত্রলীগ কর্মী এবং নিজু আহমদ (১৫) নামের এক সবজি বিক্রেতা কিশোর খুন হন।

এখানে ছাত্রলীগের ৬টি গ্রুপ বিবদমান অবস্থায় রয়েছে। তারা কেউ, কারো কথা শুনেনা। ছাত্রলীগের এতসব বিরোধ মীমাংসায় কেউ এগিয়েও আসেনা। অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগ কিংবা কেন্দ্রীয় ও জেলা ছাত্রলীগ তাদের বিবাদের বিষয়ে ‘ভালোই ওয়াকিবহাল’। কিন্তু তারাও একেকজন একেক গ্রুপের সমর্থনে থাকায় ছাত্রলীগে জ্বলে ওঠা উনুনের তাপমাত্রা কেবল বাড়ছে।

এ দিকে, গ্রুপিং কোন্দলের কারণে বিয়ানীবাজারে ছাত্রলীগ পৃথকভাবে মিছিল, সভা-সমাবেশ করে। এসব মিছিলে লোকবল বাড়াতে আবার ‘ভাড়াটিয়া’ কর্মীদের ডাক পড়ে। আর নেতাদের ডাকে ‘হাজিরা’ ভিত্তিতে যোগ দেন নরসুন্দর, মুছি, দোকানের কর্মচারী, বখাটে, অছাত্র, ব্যবসায়ী, দাগী অপরাধী, মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারী। মিছিলে আসে দর্জি, মিস্ত্রি আর শ্রমজীবীরা। গত ১৭ জুলাই কলেজ ক্যাম্পাসে গুলিতে নিহত খালেদ আহমদ লিটুও অছাত্র ছাত্রলীগ কর্মী। সে ছাত্রলীগের একটি গ্রুপের সকল মিছিল, সভায় সক্রিয় অংশ গ্রহণ করত।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা জানান, বিয়ানীবাজারে ৬টি গ্রুপ সক্রিয় আছে। এগুলো হচ্ছে, প্রপার গ্রুপের মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বে রয়েছেন যুবলীগ নেতা আতিকুর রহমান ও জেলা ছাত্রলীগের সদস্য কাওছার আহমদ, জাফর আহমদ। রিভারবেল্ট গ্রুপের নেতৃত্বে মাথিউরা ইউপি চেয়ারম্যান শিহাব উদ্দিন, জেলা ছাত্রলীগের তথ্য সম্পাদক মো. আমান উদ্দিন, ইকবাল হোসেন তারেক। পল্লব গ্রুপের নেতৃত্বে সাবেক যুগ্ম আহবায়ক আবুল কাশেম পল্লব, জামাল গ্রুপের নেতৃত্বে সাবেক আহবায়ক জামাল হোসেন। পাভেল মাহমুদ গ্রুপের নেতৃত্বে জেলা ছাত্রলীগের আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক পাভেল মাহমুদ ও স্বাধীন গ্রুপের নেতৃত্বে জেলা ছাত্রলীগের সদস্য কেএইচ সুমন।

বিবদমান এসব গ্রুপগুলোর কোনো কর্মী তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ জড়ায়। ছাত্রলীগের ইদানিং বেশিরভাগ সংঘর্ষ আবার ‘মেয়েঘটিত’। ত্রিভূজ প্রেমের কারণে বেশিরভাগ সংঘর্ষ হয় বলে ছাত্রলীগ নেতা পাভেল মাহমুদ জানান। গত ১৭ জুলাই কলেজের শ্রেণিকক্ষে গুলিতে নিহত খালেদ আহমদ লিটুর মৃত্যু পূর্ববর্তী উত্তেজনা এবং পল্লব গ্রুপের সাথে সৃষ্ট ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াও ‘হৃদয়ঘটিত’ কারণে ঘটেছে বলে তিনি আরো জানান। বিবদমান গ্রুপগুলোর সবার দাবি অবশ্য অভিন্ন। তাঁরা কমিটি চায়, নেতৃত্বের আসনে বসতে চায়।

জেলা ছাত্রলীগের সদস্য কাওছার আহমদ বলেন, কত বছর থেকে কমিটি হয়নি। আর কমিটি না হওয়ার কারণে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থেকে গ্রুপিং বাড়ছে, সংঘর্ষ হচ্ছে।

প্রায় একই মত জেলা ছাত্রলীগের তথ্য সম্পাদক মো. আমান উদ্দিনের।

তিনি বলেন, ‘অভিভাবকরা এখানে কোন্দল জিইয়ে রেখেছেন।’

ছাত্রলীগের কোন্দল প্রসঙ্গে বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জাকির হোসেন জানান, ‘জেলা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ রহস্যজনক কারণে কমিটি না দিয়ে কোন্দল সৃষ্টি করছে। বিগত দিনে কর্মীসভা করে কমিটি ঘোষণার তারিখ দেওয়ার পরও তাঁরা কারো ইশারায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে রক্তপাত বাড়াচ্ছে। সিলেটের সব উপজেলায় ছাত্রলীগের কমিটি থাকলেও শুধুমাত্র বিয়ানীবাজারে কমিটি না থাকার কারণ খুঁজে পাচ্ছিনা।’

পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবাদ আহমদ জানান, ‘১০-১৫জন নিয়ে মিছিল করলে গ্রুপ হয়ে যায়না। বিয়ানীবাজারে একসময় দু’টি গ্রুপ ছিল। এখন আখের গোছাতে যে যার মত করে গ্রুপ তৈরী করছে। সঠিক পরিবেশ তৈরী করে কমিটি গঠন করার পদক্ষেপ নিলে সবার জন্য ভালো।’

বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক দ্বারকেশ চন্দ্র নাথ বলেন, ‘ছাত্রলীগের গ্রুপিং নিয়ে আমরা খুব সমস্যায়। তবে এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়, তাই কলেজ প্রশাসনের কিছু করার নেই।’

সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরী বলেন, ‘প্রায় ১৩ বছর ধরে উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি নেই। কলেজেও কমিটি নেই। এ অবস্থায় ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করতে অবৈধভাবে যাঁরা গ্রুপিং জিইয়ে রাখেন, তাঁরাই মূলত সকল খারাপ কাজের জন্য দায়ী। এর দায় ছাত্রলীগ নেবে না।’

 

(আজকের সিলেট/২৩ জুলাই/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন