২৫ জুলাই ২০১৭


কাঁকন বিবির চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বীর প্রতীক কাঁকনবিবির চিকিৎসার্থে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সেই সাথে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার চিকিৎসার ব্যয় ভার বহনের ঘোষণা দিয়েছে।

হাসপাতালের তৃতীয় তলার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ৮ নং কেবিনে চিকিৎসাধীন কাকন বিবির শারীরিক অবস্থার ক্রমশ উন্নতি হচ্ছে। ১০১ বছর বয়সী কাকন বিবি গত চার দিন ধরে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হক জানান, সোমবার সকালে কাঁকন বিবির কেবিনে এসি (এয়ার কন্ডিশন) সংযোজন করা হয়েছে। মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হাসপাতালের পক্ষ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় মেডিকেল সার্ভিস প্রদান করা হবে। প্রয়োজন হলে তাকে হাসপাতালের বাইরেও চেক আপ করানো হবে। কাঁকনবিবির চিকিৎসার সমস্ত ব্যয়ভার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহন করবে বলে জানান তিনি।

হাসপাতালের জনৈক ইন্টার্ন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কাঁকনবিবির হার্টে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তার শরীরে সোডিয়ামেরও স্বল্পতা রয়েছে। এরই মধ্যে তাকে এ সংক্রান্ত চিকিৎসাও দেয়া হয়েছে।

ওসমানী হাসপাতালে বীর প্রতীক কাঁকন বিবির চিকিৎসা সেবায় ব্যস্ত সেবিকারা।

কাঁকন বিবির একমাত্র মেয়ে ছখিনা বিবি জানান, গত বুধবার ব্রেনস্ট্রোক করেন তার মা। এরপর থেকে তার মায়ের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। গত শুক্রবার থেকে তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে এখানেই তার চিকিৎসা চলছে।

কাঁকন বিবিরি জামাতা আব্দুল মতিন জানান, তার শাশুড়িকে শ্বাসনালী কেবল দুধ পান করানো হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারি খরচে তার চিকিৎসা সেবা ও তত্বাবধান চলছে। এজন্য তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, সোমবার সকাল ১০ টায় বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শিশির চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একদল চিকিৎসক তাকে পর্যবেক্ষণ করেন। চিকিৎসকরা পর্যবেক্ষণ করে চলে যাওয়ার পর তার আত্মীয়-স্বজন ও তাকে দেখতে আসা লোকজন তাকে দেখার সুযোগ পান। এ সময় তিনি সবার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। হাসপাতালে আসা লোকজন তাঁর মাথায় হাত বুলালে তিনি চোখের ভাষায় তাদের চেনার সংকেত দেন।

১৯৭১ সালে কাঁকন বিবি তিন মাসের কন্যা সন্তান সখিনাকে রেখে যুদ্ধে চলে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি রাজাকারদের হাতে শ্লীলতাহানির শিকার হন। তিনি কেবল মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচর হিসেবেই কাজ করেননি, সেই সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধেও অংশ নেন।

১৯৭১ এর জুনে পাকিস্তানী বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন কাঁকন বিবি। তাদের বাঙ্কারে দিনের পর দিন অমানুষিকভাবে নির্যাতন সহ্য করতে হয় তাকে। এরপর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। তখনই কাঁকন পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জুলাই মাসে তার সঙ্গে দেখা হয় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী তার সঙ্গে সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর শওকতের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেন। তার ওপর দায়িত্ব পড়ে গুপ্তচর হিসেবে বিভিন্ন তথ্য জোগাড়ের। কাঁকন বিবি শুরু করেন পাকিস্তানিদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করার কাজ। তার সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালিয়ে সফল হন।

গুপ্তচরের কাজ করতে গিয়েই দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজারে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে পুনরায় ধরা পড়েন তিনি। এবার একনাগাড়ে ৭ দিন পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারেরা তাকে বিবস্ত্র করে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। লোহার রড গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে দেয়া হয় ছ্যাঁকা। মৃত ভেবে অজ্ঞান কাঁকন বিবিকে পাকি বাহিনী ফেলে রেখে যায়। তাকে উদ্ধার করে বালাট সাব-সেক্টরে নিয়ে যাওয়া হয়। সুস্থ হয়ে তিনি পুনরায় ফিরে যান বাংলাবাজারে। নেন অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ।

মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর তাকে প্রশিক্ষণ দেন। এর পরবর্তীকালে তিনি সম্মুখযুদ্ধ আর গুপ্তচর উভয় কাজই শুরু করেন। কাঁকন বিবি প্রায় ২০টি যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

 

(আজকের সিলেট/২৫ জুলাই/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন