২৭ জুলাই ২০১৭


ফুল দিবসের গল্প

শেয়ার করুন

শাহিদ হাতিমী : মুবাশশিরা। নাবালিগা মেয়ে। নিষ্পাপ চাহনি। কথায় পটু। ফুটফুটে এক শিশু। মায়ের সাথে পাঠশালাতে যাতায়াতে প্রতিদিন একটা গল্প শোনা প্রায় রুটিন হয়ে গেছে মুবাশশিরার। সাতপাঁচ ভেবে মেয়েটির মা সত্য-কথ্য, কল্প-টল্প একটা কিছু বলেন। আজ ১লা এপ্রিল এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে গল্পের বর্ণনাকারী ছিলেন অন্যজন। আজকের গল্পে মুবাশশিরা যেনো ভিন্ন কিছু পেয়েছে। যেহেতু আজ ছিল রহস্যময় এক দিবস, সেহেতু গল্পটাও মুবাশশিরার মনোভূমিতে রেখাপাত করেছে নতুন আঙ্গিকে। স্কুল ছুটি। নীড়ে ফিরছে সবুজ পাখিরা। ক্লান্ত আগামীরা। মুবাশশিরাও মায়ের সাথে বাড়ি চললো। কিন্তু প্রতিদিনের মতো আজ আর মায়ের কাছে গল্প শোনার আবদার করলো না। মা ভাবলেন হয়তো ক্ষিদে পেয়েছে, তাই কথা বলছে না। কাকতলীয়ভাবে এক ফুল বিক্রেতা এসে মুবাশশিরার মা’কে ফুল কিনবেন কিনা জানতে চায়। তিনি না করতে যেয়ে শেষ করার আগেই মুবাশশিরা প্রশ্ন করে মা আজকে জানি কী দিবস? মা চিন্তা করলেন হয়তো ফুল দেখে বলছে, তাই তিনি ঝটপট বলে ওঠলেন আজ “ফুল দিবস” মা’মনি। নো মা নো। নো, মানে? স্যার বলছেন আজকে ‘এপ্রিল ফুল’ দিবস। মাদরাসা পড়ুয়া ও পর্দাশীলা নারী মুবাশশিরার মা এবার বুঝার বাকি থাকলো না যে, ক্লাসে গল্প শোনে নেওয়াতে পথে পথে আজ আর তাকে কুরআন হাদিসের কাহিনী শোনাতে হচ্ছে না। তিনি মেয়েকে বললেন, মা’মনি তোমার স্যার আর কি কি বলেছেন? জানো মা, আজকের দিবস নিয়ে স্যার ক্লাসে অনেক মজার মজার গল্প বলেছেন। স্যার বলছেন তথাকথিত জ্ঞানীরা আজকের দিনেও নাকি অনেক কর্মসূচী হাতে নেয়। আজকের সূর্য্যদোয়ের মধ্য দিয়ে চলমান দিবসটির নাম হচ্ছে ‘এপ্রিল ফুল। এর বাংলা ‘বোকা দিবস’। ক্লাস টিচার সিয়াম সাহেব কেনো জানি ‘গল্পটি ভূমিকা ছাড়াই শুরু করে দিয়ে ছিলেন!
তিনি হাদিয়া নামের এক ভদ্রশ্রীর কথা দিয়ে শুরু করলেন। একদা, ফোন রিসিভ করে তিন মিনিট শুধুমাত্র কান্নার আওয়াজ শোনতে পেল হাদিয়া। হ্যালো হ্যালো বলতে বলতে এক পর্যায়ে হৃদপিন্ড হাপিত্যেশ করছিলো হাদিয়ার। যাক, সাড়া মিললো। ফোনটা করেছে হাদিয়ার বান্ধবী তানিয়া। ভারী কণ্ঠে তানিয়া কেঁদে কেঁদে বললো, সইগো আমি বড় বিপদে আছি! আমাকে উদ্ধার কর, তুই ছাডা কেউ আমাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসবে না! কি কস? হাদিয়া, তুই কোথায়? কি হয়েছে? প্লিজ প্লিজ সই আমার, এতো জানতে চাসনা, আমি মোবাইলে সব বলতে পারবোনা, তুই যতো দ্রæত পারিস টিএসসিতে আয়! আর শোন, সাথে তুহিনকে নিয়ে আসবি। আসছিস তো? হ্যা, আসছি, একটু ওয়েট কর!
মিনিট দশেকের মধ্যে হাদিয়ারা উপস্থিত হলো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনা ‘টিএসসিতে’। টিএসসিতে এসে তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। চড়কগাছ হাদিয়াদের অবস্থা। তারা দেখতে পেল জাতীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন আয়োজিত একটি কনসার্ডে তানিয়া ড্যান্স করছে! হাদিয়ারা ত অবাক এবং নির্বাক! একি? একটু আগে যে কান্নার সাগরে সাঁতার কাটলো, খুব বিপদ জানালো, সে এখন নাচতেছে! উৎফুল্ল ও উদ্বেলিত? এটা কি করে হয়? হাদিয়া- তুহিনরা রাগে গোসসায় জুতা হাতে নিয়ে আগাচ্ছিল তানিয়ার দিকে। ততক্ষণে তািনয়া বিষয়টি আঁচ করতে পেরে হাস্যরসে একটি তাজা গোলাপ হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো। একদিকে জুতা অপরদিকে ফুল ব্যাপারটা কি? উৎসুক জনতা জমালো ভীড। কৌশলে তানিয়া ফুলসহ হাদিয়াকে পেছন দিক থেকে এসে জড়িয়ে ধরলো, এবং তুহিনের দিকে গোলাপটি বাড়িয়ে দিল। এপ্রিল ফুলের শুভেচ্ছা।
তুহিন অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করলো, তানিয়া এমনটি কখনো কোন মানুষ করতে পারে? তানিয়া দ্রæত জবাব দেয়, সবদিন না পারলেও আজকের দিন পারে ভাইয়া! আজকের দিন কেন পারে? এবার তানিয়া অট্টহাসিতে মেতে ওঠলো। ক্ষুব্ধ হাদিয়া বললো, আজ তরে খুন করে ফেলবো, কতো জরুরী কাজ ফেলে তোকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছি, আর তুই কিনা হাসছিস! আরে সই, তোরা কি জনিস না, আজ বিশ্ব বুকা দিবস?! মানে এপ্রিল ফুল? তাই তোদের বুকা করার একটা অযুহাত ওটা। এবার উৎসুক জনতাসহ সবাই ভেবাচ্যাকা খেল, হাসিতে ফেটে পড়লো! সিয়াম স্যার গল্পটাকে এখানেই ইতি করে দিলেন মাকে বলল মুবাশশিরা।
ফুল দিবসের গল্প শোনে মুবাশশিরার মা দরাজ কন্ঠে মেয়েকে কাছে ডেকে বললেন, এই গল্পটায় অনেক ভাবার আছে মা। এই যে, এপ্রিল ফুলকে পালন করতে কী নির্লজ্জ মিথ্যার ছড়াছড়ি, এটা কোন মুসলমানের ছেলে মেয়েদের জন্য মানায় কি? খবরদার, মা! এমন গল্পে উদ্বেলিত হবার কোন জু নেই। এটা বেঈমানদের অপকালচার ও অপপ্রচার। এমন বাটপার শয়তান শয়তানীদের আবেগী কথনে কখনো মনোযোগ দিতে নেই। এমন ধৃষ্টদের এড়িয়ে চলতে হবে! আমি চাই এপ্রিল ফুলের নামে বুকা দিবসে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে খুশি হওয়া কপোকপোতির উপর এক পুকুর থুথু নিক্ষেপ করার মতো সাহসি হবে আমার মেয়ে। দ্বীনদার মানুষের মেয়েরা কখনো বিজাতীয় সংস্কৃতিকে লালন করতে পারেনা। ধোঁকাবাজ, মিথ্যুক, প্রতারণামুলক কাজে উৎসাহকারিদের চপেটাঘাতের কৌশল শেখাতে হবে আমাদের ছেলেদের। তোমাদের ভাইদের। মুসলিম মেয়েদের। ইসলামে এপ্রিল ফুল বা বোকা দিবসের নামে কোন দিবস টিবস নেই। এটা ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের চক্রান্ত। মায়ের উপসংহার শুনে মুবাশশিরা প্রত্যয় গ্রহণ করে আসুন আজ থেকে এপ্রিল ফুলকে না করি, না বলি।

 

(লেখক : সম্পাদক- পুষ্পকলি সাহিত্য সংঘ, সিলেট।)

 

শেয়ার করুন