আজ শুক্রবার, ২২শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং

টিলাগড়ে ৪ মাসে ৩ খুন, এর পর কে?

  • আপডেট টাইম : January 8, 2018 12:17 PM

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেটে ছাত্রলীগের সব চেয়ে অবিশপ্ত এলাকা হচ্ছে টিলাগড় ইউনিট। এখানে একের পর এক হত্যাকান্ড সহ নানান বিতর্কিত ঘটনায় বারবার চলে আসছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সবক’টিই নেতিবাচক। একটির ঘটনার রেশ শেষ হতে না হতেই টিলাগড়ে জন্ম নিচ্ছে আরেক ঘটনা। বিগত ৪ মাসের মধ্যে টিলাগড়কেন্দ্রীক ছাত্রলীগের গ্রুপিং রাজনীতির বলি হতে হয়েছে তিন জন ছাত্রলীগ কর্মীকে। নিহতরা হচ্ছেন জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম, ওমর আহমদ মিয়াদ ও সর্বশেষ তানিম খান। এর মধ্যে মাসুম ছিলেন ছাত্রলীগের সুরমা গ্রুপের কর্মী। আর ধারাবাহিক এই হত্যাকান্ডের কারনে রাজনীতি সচেতনরা টিলাগড় পয়েন্টকে ‘মার্ডার পয়েন্ট’ বলে নাম দিয়েছেন।

সিলেট নগরীতে এখন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে ‘টিলাগড় ছাত্রলীগ’। ছাত্রলীগের এই বলয়ের নেতাকর্মীদের সন্ত্রাস ও অপকর্মে বিতর্কে জড়াচ্ছে পুরো ছাত্রলীগ। টিলাগড়কেন্দ্রীক আওয়ামী লীগের দুই নেতার বিরোধের কারণে নিয়মিতই সংঘাতে জড়াচ্ছে তাদের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতারা। সংঘাত, প্রাণহানি, ছাত্রাবাস ভাংচুরসহ বিভিন্ন ধরণের অপকর্ম করেও শুধু নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। ফলে ধারাবাহিকভাবেই ঘটছে সংঘাত।

এই ইউনিটের ঘৃন্য রাজনীতির বলি হয়ে একের পর এক মায়ের কোল খালি হচ্ছে। খোদ ছাত্রলীগের সবেক নেতারা সহ সিলেটবাসীর মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এর পর কোন মায়ের বুক খালি হবে?

হামলাকারীরা সরাসরি টিলাগড়কেন্দ্রীক ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত। এর আগে গত ১৬ অক্টোবর প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ছাত্রলীগের হিরন মাহমুদ নিপু গ্রুপের সক্রিয় কর্মী এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা ওমর আহমদ মিয়াদকে। আর সর্বশেষ রবিবার রাত ৯ টার দিকে টিলাগড়েই নিভলো তানিম খান (২২) নামের আরেক ছাত্রলীগ কর্মীর জীবন প্রদীপ। তানিম খান টিলাগড়কেন্দ্রীক রঞ্জিত সরকার গ্রুপের কর্মী। এ ঘটনায় এপর্যন্ত চার জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে আটককৃত জাকির হোসেন (২৫) কে স্থানীয় কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদের অফিসের সামনে থেকে তাকে আটক করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন- রবিবার রাত পৌণে নয়টার দিকে প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়ে তানিম খান নামের ছাত্রলীগ কর্মী গুরুতর আহত হন। গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেলে নেয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত ছাত্রলীগ কর্মী তানিম খান সিলেট সরকারি কলেজের বিএ পাস কোর্সের শিক্ষার্থী।

টিলাগড় এলাকায় ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীন বিরোধ নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ ছাত্রলীগের দুটি অংশের মধ্যে। সিলেটের প্রধান দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমসি কলেজ ও সিলেট সরকারী কলেজের অবস্থান টিলাগড়ে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অবস্থানও এই এলাকায়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার নিয়েই দ্বন্দ্বে জড়ায় ছাত্রলীগের দুটি অংশ। এই বিরোধ যেনো কিছুতেই থামছে না। থামছে না প্রাণহানিও।

এর আগে গত ১৬ অক্টোবর প্রকাশ্য দিবালোকে টিলাগড় মসজিদ সংলগ্ন রাস্তার সামনে অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে ছাত্রলীগের খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ। নিহত মিয়াদ সিলেট এমসি কলেজে বিএসএস এবং লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ের ছাত্র ছিলেন। ওই দিন বেলা ৩টার দিকে প্রকাশ্যেই ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় তোফায়েল নামের এক ছাত্রলীগ কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন। মিয়াদের বাবার করা মামলায় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরীকে প্রধান আসামী করা হয়। এরপর কেন্দ্রের এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বাতিল করা হয় সিলেট জেলা ছাত্রলীগের কমিটি। যা এখনো পুনর্গঠনে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

তারও আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিকালে শিবগঞ্জে জাকারিয়া অহমদ মাসুমের উপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। আগের দিন রাতে নগরীর সোবহানীঘাটে আলী আহমদ মাহিন নামের এক ছাত্রলীগকর্মীকে মারধর করে মাসুমসহ ছাত্রলীগের আরো কয়েকজন কর্মী। এর জের ধরেই পরেরদিন হামলায় খুন হন মাসুম। হামলাকারী মাহিন ও তার সঙ্গীরা টিলাগড়কেন্দ্রীক ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত। মাহিন ও তার সঙ্গীরা মাসুমকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে ফেলে গিয়েছিল। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে তার মৃত্যু হয়।

নিহত মাসুম সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শান্তিগঞ্জের মাসুক মিয়ার ছেলে। তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সমর্থিত সুরমা গ্র“পের কর্মী। হামলাকারী মাহিন ছাত্রলীগের টিটু-ডায়মন্ড গ্র“পের কর্মী বলে জানা গেছে।

এ তিন খুনই শুধু নয়। এর আগেও প্রায় ১৭ বছর আগে ২০১০ সালের ১২ জুলাই অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে টিলাগড়ে খুন হন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের ৮ জনের নাম উলে¬খসহ অজ্ঞাত আরও ১০/১৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন পলাশের বাবা বীরেশ্বর সিংহ। এ মামলায় মূল অভিযুক্তদের কয়েকজনকে বাদ দিয়ে ৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ন্যায় বিচার নিয়ে শঙ্কিত পলাশের সহপাঠী ও সহকর্মীরা।

জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরন মাহমুদ নিপু বলেন, গত বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন এমসি কলেজের প্রবেশ করতে না পেরেই রায়হান অনুসারী বহিরাগতরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে তানিমকে হত্যা করেছে।

অভিযোগের ব্যাপারে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরীর সাথে যোগােযাগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

এব্যাপারে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইনের সাথে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

 

(আজকের সিলেট/৮ জানুয়ারি/এসটি/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email
  •  
  •  
  •  
  •  

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ