আজ মঙ্গলবার, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২১ ইং

সিলেটে ভুয়া নবাবের ‘কানেকশন’ খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা

  • আপডেট টাইম : November 3, 2020 9:48 AM

ডেস্ক রিপোর্ট : নবাব স্যার সলিমুল্লাহ খানের নাতি সেজে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় গ্রেফতার আলী হাসান আসকারীর সিলেট কানেকশন খুঁজছে গোয়েন্দারা।সিলেটে কার দাওয়াতে এসেছিলেন। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মহল কারা? এবার সেই সুঁতোয় টান দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নবাবের ভুয়া নাতির কানেকশন অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দাদের একাধিক ইউনিট। এমন তথ্য জানা গেছে গোয়েন্দা সূত্রে।

আর সেই কানেকশনের নেপথ্যে উঠে আসছে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) কাউন্সিলর ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদের নাম। ইতোপূর্বে তিনি এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ, টিলাগড়ে গ্রুপিং কোন্দলে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় সমালোচিত। আর নতুন করে আবার সমালোচনার মুখে পতিত হলেন ভুয়া নবাব কানেকশনে।

যদিও তার ঘনিষ্ট সহপাঠি এক ব্যবসায়ী দাবি করেছেন নবাব সলিমুল্লাহর ভুয়া নাতি পরিচয় দানকারী আলী হাসান আসকারীর সঙ্গে আজাদের পরিচয় ছিল না। তবে আরেক ব্যবসায়ী বলছেন, আজাদের মাধ্যমেই নবাবের ভুয়া নাতির সঙ্গে পরিচিত হন তারা। সেই বন্ধুত্বের সুবাদে সম্মান জানাতে গিয়ে ‘উচ্চ মাপের প্রতারক’ এর সম্মানে ডিনার পার্টি দিযেছেন তারা।

এ বিষয়ে সিলেটের শিল্পপতি আতাউল্লাহ সাকের বলেন, নবাবের ভুয়া নাতি পরিচয়দানকারী আলী হাসান আসকারী সঙ্গে আগে থেকে পরিচয় ছিল না। মৌলভীবাজার বাড়ি ঢাকার ব্যবসায়ী কাজল সালেকের মাধ্যমে তিনি সিলেটে এসে দরগাহ গেইটে অবস্থিত স্টার প্যাসিফিকে উঠেন। কাজল সালেক তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা রায়হানের বাড়িতে যেতে চাইলে কাউন্সিলর আজাদকে অন্তর্ভূক্ত করেন। আজাদের মাধ্যমেই কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে রায়হানের বাড়ি যাওয়া হয়। দেখতে নবাব বংশের লাগলেও এতো বড় মাপের প্রতারক তা তিনিও জানতেন না।

সাকের বলেন, হয়তো তার সিলেট আসা ছিল আমাদের ব্যবসাকে টার্গেট করেই। সাধারণত; নবাবের নাতি শুনে যে কারো আগ্রহ জাগবে দেখা করার। সে কারনে ডিনার পার্টি দিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের পরিচিত ঘনিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাংবাদিককে দাওয়াত করি। তবে পরবর্তীতে তার প্রতারণার খবর জানতে পেরে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়েছি।

তিনি বলেন, তাছাড়া বিশ্বাস করার উপায় নেই ‍ভুয়া নবারের নাতি পরিচয়দানকারী ব্যক্তি ঢাকা ও সিলেটে তার অডেল সম্পদ রয়েছে দাবি করে বলেন, সেগুলো উদ্ধার নিয়ে সরকারের সঙ্গে মামলাও চলছে। মন্ত্রী আমলা থেকে সমাজের উঁচু তলার মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে এবং ছবিও দেখান তিনি। মূলত; আরেক বাটপার সাহেদের দেখা পেয়েছিলাম!

নৈশভোজে অংশ নেওয়া পেট্রলপাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জুবায়ের আহমদ চৌধুরী বলেন, সারকারখানা অকশনে নেওয়া নিয়ে ওইদিন আমাদের মিটিং ছিল স্টার প্যাসিফিকে। সেখানে ভুয়া নবাব পরিচয়দানকারী ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন কাউন্সিলর আজাদ। তখন ওই ব্যক্তি সাকেরের আমন্ত্রণে আসা সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপ করছিলেন। তখন জানতে পারলাম দেখা হওয়ার তিনদিন আগে থেকে তারা সিলেটে অবস্থান করছেন। হয়তো সিলেটে ব্যবসায়ীদের টার্গেট করেই ছিল তার আসা। এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৩ অক্টোবর নবাবের ভুয়া নাতি পরিচয়দানকারী আলী হাসান আসকারীসহ সিসিক কাউন্সিলর আজাদসহ ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি সিলেট আসেন। এরপর ১৬ অক্টোবর নগরীর বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনে নিহত রায়হান উদ্দিনের স্বজনদের সান্ত্বনা জানাতে বাসায় যান।

এ সময় আসকারীর সঙ্গী হন কাউন্সিলর আজাদ, কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরান, সিলেটের শিল্পপতি আতাউল্লাহ সাকের, জুবায়ের আহমদ চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন। রায়হানের বাড়ি থেকে ফিরে ওই রাতে নগরীর একটি অভিজাত হোটেলে নৈশভোজ সারেন তারা, যার একাধিক ছবিসহ নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেন আলী হাসান আসকারীসহ পার্টিতে অংশ নেওয়া অনেকে। নিজের আইডি থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া পোস্টে নবাবের ভুয়া নাতি আলী হাসান আসকারী কাউন্সিলর আজাদকে তার বন্ধু উল্লেখ করেন।

এদিকে আসকারীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন। গত ২৮ অক্টোবর তিনি লন্ডন গেছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। আলী হাসান আসকারী গ্রেফতারের পর তার সঙ্গে আজাদের বিশেষ সম্পর্ক নিয়ে সিলেটে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। কারণ আসকারীই আজাদকে বন্ধু আখ্যায়িত করে নিজের ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। আজাদই সিলেটের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের আসকারীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক তরুণীকে ধরে নিয়ে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িতরা কাউন্সিলর আজাদের বন্ধু আওয়ামী লীগ নেতা রনজিত সরকারের অনুসারী। এক সময় তারা দু’জনে মিলে এক গ্রুপ চালাতে। শাসন করতেন টিলাগড় ও আশপাশের এলাকা। শিক্ষাঙ্গনে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে কোন্দল দেখা দিলে দু’জন দুই মেরুতে অবস্থান নেন। এতে করে টিলাগড়কেন্দ্রিক দ্বিধাবিভক্ত ছাত্রলীগের দু’টি গ্রুপে হানাহানিতে গত ১০ বছরে অন্তত হাফ ডজনের উপরে তাজা প্রাণ ঝরেছে। তাদের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অস্ত্রের মহড়া, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক কারবার, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। আর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলেও দাপটে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে। ফলে বিচার বঞ্চিত ভোক্তভোগীরা।

Print Friendly, PDF & Email
  •  
  •  
  •  
  •  

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ