আজ মঙ্গলবার, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২১ ইং

‘পরের জায়গা পরের জমি, ঘর বানাইয়া আমি রই…’

  • আপডেট টাইম : December 4, 2020 10:18 AM

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : ‘ওই জায়গাটা জুড়ে আমার ৫ একর জমি ছিলো, এদিকে ছিলো বসতবাড়ি, ওপাশে ছিলো ফসলি জমি। এই জমিতে উৎপাদিত ফসল দিয়েই চলতো আমাদের পুরো পরিবার। সেই বাড়িও নেই, ফসলি জমিও নেই। পুরোটাই বালুচর। আমার এখন কিছুই নেই। সব শেষ। বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়ে এখন পরের জমিতে ঘর করে থাকি। ছবি তুলে কি হবে? কেউ কোনো খোঁজ খবর পর্যন্ত নেয়না! আল্লাহ ছাড়া আমাদের কেউ নেই।’ নদীর পাড়ে দাড়িয়ে হাত দিয়ে নিজের হারানো জমির অবস্থান দেখাচ্ছিলেন আর এভাবেই প্রতিবেদককে বলছিলেন নদী ভাঙ্গনে বাস্তুচ্যুত বয়োবৃদ্ধ মোঃ আবু সিদ্দিক।

শুধু মোঃ আবু সিদ্দিক-ই নন, সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ছুটে আসেন তার মতো বাস্তুচ্যুত আব্দুস ছাত্তার, জব্বার, আব্দুল হাই, ফালু মিয়া, শাহাবুদ্দিন, শাহজাহান, কামাল, লিলু, ফুল মিয়া, আবুল মিয়া, হানিফ আলী, ইসমাইল হোসেন, ময়মনা, ফজিলা, আতিকা, লিপি, হালিমাসহ আরো অন্তত ১০টি পরিবারের সদস্যরা। একে একে সবাই তাদের অতীত বসতভিটা ও ফসলি জমি হারানোর কথা জানান। জানান নিজেদের অসহায়ত্বের কথা। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের ওপর উদাসীনতার অভিযোগ এনে অনেকে ক্ষোভও প্রকাশ করেন।

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন নরসিংপুর। এই ইউনিয়নের পূর্ব চাইর গাঁও গ্রামের বুক চিঁড়ে সীমান্তের ওপারে ভারত থেকে উৎপন্ন হওয়া খরস্রোতা সোনালী চেলা নদী বাংলাদেশের ভেতরে প্রবাহিত হয়েছে। বালি-পাথরের জন্য নদীটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও এখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এখন আতঙ্কের নাম সোনালী চেলা। এ নদীর নাম শুনলেই তাদের চোখে ভেসে উঠে হারানো বসতবাড়ি, ফসলি জমিজমা চিত্র। বছরের পর বছর সোনালী চেলা নদীর তীব্র ভাঙ্গনে সবকিছু হারিয়ে এখন উদ্বাস্তুদের জীবন বেছে নিয়েছেন অনেকেই। অথচ এককালে তাদের সবই ছিলো। নদী ভাঙ্গনে এসব ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আজোবধি সরকারি ভাবে কোনো ধরনের পুনর্বাসন কিংবা সহায়তার উদ্যোগ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সোনালী চেলা নদী ভাঙ্গন এখনো অব্যাহত রয়েছে। ভাঙ্গন কবলিত অংশ থেকে নিজেদের বসতঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন অনেকেই। দিন দিন ভাঙ্গনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদী পাড়ের বাসিন্দারা। ভাঙ্গনে ইতোমধ্যে বিজিবির টহল চৌকি, কাস্টমস অফিস, বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনসহ বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে গেছে। বিজিবির টহল চৌকি ও কাস্টমস অফিস অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘর না থাকায় অনেক অসহায় পরিবারকে অস্থায়ী খুপরি বানিয়ে বসবাস করতে দেখা গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা ঈসমাইল হোসেন জানান, নিজের জমি হারিয়ে পরের জমিতে ঘর বানিয়ে থাকছি। আমরাও তো এদেশের বাসিন্দা। এমপি, চেয়ারম্যান, চেম্বার কিংবা প্রশাসনের লোকজন কেউ আমাদের খোঁজ খবর রাখেনি। আমরা কোন অবস্থায় আছি তা দেখার মতো কেউ নেই। কার কাছে যাব, কারা আমাদেরকে সহযোগিতা করবে এই ভরসা খোঁজে পাচ্ছিনা। স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী সোহেল আহমেদ সোহেল জানান, নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত এখানকার লোকজন খুবই কষ্টে আছে। তাদেরকে দ্রুত পুনর্বাসনের দাবি জানাই।

মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ আব্দুর রহিম প্রতিবেদককে জানান, এবিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। ইউএনও এবং এমপি মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ করুন।

এবিষয়ে জানতে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া সুলতানার মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দেওয়া হয়েছে। কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

Print Friendly, PDF & Email
  •  
  •  
  •  
  •  

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ