আজ শনিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২১ ইং

তিন মাসেও থামেনি রায়হানের মায়ের আহাজারী

  • আপডেট টাইম : January 11, 2021 10:33 AM

কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদ (৩২) হত্যা মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি মাসেই মামলার অভিযোগপত্র দেবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তবে, মূল অভিযুক্ত বরখাস্ত হওয়া দারোগা আকবর হোসেন ভ্ইূয়াকে পালাতে সহায়তাকারী ‘সিনিয়র কর্মকর্তা’ এখনো শনাক্ত হয়নি। এ অবস্থায় আজ সোমবার আলোচিত রায়হান আহমদ হত্যাকাণ্ডের ৩ মাস পূর্ণ হচ্ছে।

পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খালেদ উজ্জামান জানিয়েছেন, ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার অভিযোগপত্র দেয়ার বিধান রয়েছে।

মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, চলতি মাসেই অভিযোগপত্র দিতে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। অভিযোগপত্র দাখিলের পর সকল তথ্য মিডিয়ায় উপস্থাপন করা হবে বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

তদন্ত শেষ পর্যায়ে
পিবিআই সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত রায়হান আহমদ হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য দারোগা আকবরের মোবাইল ফোন ও সিম- পিবিআইর নিজস্ব ল্যাবে পাঠানো হয়। গ্রেফতারের কয়েক দিন পর কানাইঘাটের সীমান্ত এলাকা থেকে আকবরের ২টি মোবাইল ফোন সেট, ৩টি সিম কার্ড, শার্ট, প্যান্ট, গেঞ্জি ও পাসপোর্ট সাইজের দু’টি ছবি ও এক নারীর দু’টি ছবি উদ্ধার করে পুলিশ।

প্রাথমিকভাবে এগুলো আকবরের বলে নিশ্চিত হওয়া গেলেও নারীর ব্যাপারে তেমন তথ্য মেলেনি। মূল অভিযুক্ত আকবরসহ ৪ পুলিশ সদস্যকে রিমান্ডে নিয়েও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। বর্তমানে বাদী পক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য লিপিবদ্ধের কাজ চলছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এরই মধ্যে ময়নাতদন্তের রিপোর্টও এসেছে। চাঞ্চল্যকর মামলা হওয়ায় অনেকটা ধীরে সুস্থে অগ্রসর হচ্ছে পিবিআই। চলছে সকল তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা।

হত্যাকাণ্ডের দু’দিন পর ১৩ অক্টোবর মামলাটি কোতোয়ালী থানা থেকে পিবিআই’র কাছে স্থানান্তর করে পুলিশ সদর দপ্তর। এর আগের দিন নিহত রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-২০। ধারা ৩০২/৩৪ দণ্ডবিধি তৎসহ নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ১৫(১)(২)(৩)২০১৩।

সিনিয়র কর্মকর্তা শনাক্ত হয়নি
সীমান্ত এলাকায় গ্রেফতারের আগে আকবরের স্বীকারোক্তির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। কয়েকটি খণ্ড ভিডিও’র একটিতে আকবর বলেন, ‘সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন আপাতত চলে যাও, ২ মাস পরে চলে আসবা, ২ মাস পর মোটামুটি সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ২ মাস পরে চলে আসবে।’

৯ নভেম্বর সকালেই তার এই বক্তব্য ভাইরাল হয়। কিন্তু এখনো সিনিয়র কর্মকর্তাকে শনাক্ত করা হয়নি। যার পরামর্শে ১৩ অক্টোবর কোম্পানীগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায় আকবর। পিবিআই এ বিষয়ে কোন তথ্য দিতেও রাজি হয়নি।

আকবর নিজেও তদন্তকারীদের কাছে স্বীকার করেন, ‘কোম্পানীগঞ্জের মাঝেরগাঁও এর একটি পরিবার পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।’

সূত্র জানায়, স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান, সিলেট জেলা পরিষদ সদস্য তামান্না আক্তার হেনা ও তার স্বামী হেলাল আহমদ আকবরকে সীমান্ত পার হতে সহযোগিতা করেন। এমনকি হেনা দম্পতির ঘরে এক রাত ছিলেন আকবর এমন তথ্যও পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

রায়হান হত্যার পর সাময়িক বরখাস্তের পরই কৌশলে সাংবাদিক নোমানের সহযোগিতায় নগর ছেড়ে কোম্পানীগঞ্জে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করে আকবর। এরপরই ভারতে পালিয়ে যায়। ৯ নভেম্বর সকালে কানাইঘাটের ডনা সীমান্ত থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বিভিন্ন মাধ্যমে কৌশলে পুলিশ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

কোন আসামী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়নি
আদালত সূত্র জানায়, রায়হান হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পর ২০ অক্টোবর সর্বপ্রথম কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাশকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর ২৪ অক্টোবর কনস্টেবল হারুন, ২৯ অক্টোবর এ.এস.আই আশেক এলাহীকে গ্রেফতার দেখায় পিবিআই। সাময়িক বরখাস্তের পর পুলিশ প্রহরায় ছিলেন তারা। কনস্টেবল টিটু ও হারুনকে দুই দফায় ৮ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। এএসআই আশেক এলাহীকে ৫ দিনের রিমাণ্ডে নেয়া হয়। ৯ নভেম্বর গ্রেফতারের পর দারোগা আকবরকে টানা ৭ দিনের রিমাণ্ডে নেয় পিবিআই। ৪ পুলিশ সদস্যকে রিমাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পরও কোন আসামী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়নি। এমনকি পিবিআই পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আওলাদ হোসেনও কোন আসামীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী গ্রহণের আবেদনও করেননি।

আলোচনায় ‘ছিনতাই ইস্যু’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার শুরু থেকেই রায়হান আহমদকে ছিনতাইকারী হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশ। নগরের কাষ্টঘর এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় রায়হানকে গ্রেফতার করে এএসআই আশেক এলাহী বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে আসেন। এমন বক্তব্য শুরু থেকেই প্রচার করা হয়।

১৯ অক্টোবর সোমবার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে কর্মরত ৩ প্রত্যক্ষদর্শী কনস্টেবল আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে ১৬৪ ধারার জবানবন্দী দেন।

কনস্টেবল দেলোয়ার হোসেন জবানবন্দীর এক পর্যায়ে বলেন, ‘ছিনতাইকারী সন্দেহে একজন লোক নিয়ে আসে। ছিনতাইয়ের শিকার একজন ব্যক্তি ও তার সাথে আরেকজন লোকও দাঁড়িয়ে ছিল’।

কনস্টেবল সাইদুর রহমান তার জবানবন্দীতে বলেন, ‘সিএনজি থেকে নামিয়ে ফাঁড়ির ভেতরে নিয়ে আসে। লোকটিকে এ কথা জিজ্ঞেস করায় তারা জানান, লোকটি একজন ছিনতাইকারী’। কনস্টেবল শামীম মিয়া তার জবানবন্দীতে বলেন, ‘লোকটিকে ছিনতাই এর ঘটনায় নিয়ে আসা হয়েছিল’।

তবে রায়হানের মা সালমা বেগম বলেন, ‘ছিনতাইয়ের বিষয়টি সাজানো নাটক। রায়হান যে সময় ঘর থেকে বেরিয়ে যায় তার পরনে যে শার্ট-প্যান্ট ছিল লাশের পরনে সেই কাপড় ছিল না। রায়হানের কোন টাকার সংকট নেই। তাহলে ছিনতাই করবে কেন’-প্রশ্ন মায়ের।

অ্যাকশন হল যাদের বিরুদ্ধে
পুলিশ সূত্র জানায়, রায়হান হত্যার পর ১২ অক্টোবর এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, এএসআই তৌহিদ মিয়া, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাশ ও হারুনুর রশিদকে সাময়িক বরখাস্ত করে এসএমপি। একই দিন বন্দরবাজার ফাঁড়ি থেকে এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজীব হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়।

আকবরকে পালাতে সহায়তাকারী হিসেবে এসআই হাসান আলীকে ২১ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক সৌমেন মিত্র ও এসআই আব্দুল বাতেনকে ১৮ নভেম্বর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ৪ দিন পর তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৫ অক্টোবর এসএমপি কমিশনার গোলাম কিবরিয়া রায়হানের বাড়িতে যান। ২২ অক্টোবর কমিশনার গোলাম কিবরিয়াকে এসএমপি থেকে বদলী করে পুলিশ সদর দপ্তর। দারোগা আকবর, এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল টিটু ও হারুন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে।

সেই সাইদুরের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা
পুলিশ জানিয়েছে, রায়হান আহমদের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগকারী শেখ সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ডলার জালিয়াতির অভিযোগে প্রতারণার মামলা হয়েছে। গত ৩ নভেম্বর কোতোয়ালী থানায় প্রতারণার এই মামলাটি দায়ের হয়। ২৫ অক্টোবর সাইদুর রহমান পিবিআই এর উপশহরস্থ অফিসে গেলে সন্দেহজনক হিসেবে তাকে আটক করে পিবিআই। ঐ দিনই তাকে ৫৪ ধারায় জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। তবে, সাইদুরের কাছ থেকে কি পরিমাণ টাকা ছিনতাই করেছিল রায়হান তা এখনো পরিষ্কার হয়নি। ছিনতাইয়ের বিষয়টি নিয়ে এখনো ধুম্রজাল রয়েছে। ছিনতাইয়ের বিষয়ে পিবিআইর কোন কর্মকর্তাই স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।

ফিরে দেখা ১১ অক্টোবর
নগরীর আখালিয়ার নেহারীপাড়ার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে ১১ অক্টোবর দিবাগত রাতে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে আসে। রাত ৩টা ৯ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে স্বাভাবিক অবস্থায় রায়হানকে ফাঁড়িতে ধরে আনে পুলিশ। সকাল ৬টা ২৪ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে রায়হানকে ফাঁড়ি থেকে বের করা হয়। ৬টা ৪০ মিনিটে ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হয় এবং ৭টা ৫০ মিনিটে মারা যায় রায়হান। ঐ দিনই ময়না তদন্ত শেষে তার লাশ দাফন করা হয়। পরে ১৫ অক্টোবর কবর থেকে রায়হানের লাশ উত্তোলন করে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে পুনরায় ময়নাতদন্তে করা হয়।

নির্যাতনে রায়হানের হাতের দু’টি আঙ্গুলের নখ তুলে ফেলে দারোগা আকবর। রাতভর নির্যাতন রায়হানের শরীরে ময়নাতদন্তে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৪টি আঘাত ছিল গুরুতর। নির্যাতনের সময় রায়হানের আর্তচিৎকারে ফাঁড়ির পার্শ্ববর্তী কুদরত উল্লা রেস্ট হাউসের বর্ডারদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতকদের গ্রেফতারের দাবিতে দলমত নির্বিশেষে সিলেটবাসী আন্দোলনে নামেন। সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন, মিছিল-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। বৃহত্তর আখালিয়াবাসী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেন।

সালমা বেগমের আহাজারী থামেনি
রায়হান আহমদ হত্যাকাণ্ডের ৩ মাস হতে চললেও গর্ভধারিণী মা সালমা বেগমের আহাজারী এখনো থামেনি। পুত্র হত্যার বিচারের জন্যে পিবিআইর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সালমা বেগম।

অতি সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, রায়হানের চাচা মঈনুল কুদ্দুস তাকে আমেরিকা নিয়ে যেতে সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করেছিলেন। তার কাবিনসহ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার ছেলেকে তারা মেরেই ফেলল।

তিনি বলেন, রায়হান হত্যার পর ওসি সেলিমের সাথে আকবরের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। রায়হানকে পালিয়ে যেতে নোমানসহ কয়েকজন সহযোগিতা করেছে। এ জন্যে ওসি সেলিম, নোমানকে আসামী করতে হবে।

আমি ন্যায় বিচার চাই। পুত্র হত্যার বিচার পেতে আমি আগুনেও ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত আছি। তিনি পিবিআইর কাছে সত্য, ন্যায় ও নিরপেক্ষ তদন্ত আশা করেন।

পিবিআই’র পুলিশ সুপার যা বললেন
পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খালেদ উজ্জামান সিলেটের ডাককে বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তে পাওয়া সকল তথ্যের বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মিডিয়ার যে সকল তথ্য এসেছিল সকল তথ্য ভেরিফাই করছে পিবিআই। আপাতত নির্দিষ্ট কোন ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না। তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তা, মাদক, ছিনতাই সবকটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে যা মিডিয়ায় এসেছে সব বিষয় নিয়ে পিবিআই তদন্ত করছে। রায়হান হত্যা মামলাটি পিবিআই গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে বলে জানান তিনি।

Print Friendly, PDF & Email
  •  
  •  
  •  
  •  

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ