আজ বৃহস্পতিবার, ২৮শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং

দুর্ঘটনায় প্রাণহানী আর কতো?

  • আপডেট টাইম : January 11, 2021 12:44 AM

করোনা মহামারীর কারণে গেল বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ২ মাসেরও অধিক সময় দেশজুড়ে ছিল কঠোর লকডাউন। যান চলাচল ছিল খুবই সীমিত। এরপরও গেল বছরে সারাদেশে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৩১০জন। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৯৬৯, রেল দুর্ঘটনায় ১২৯ ও নৌ দুর্ঘটনায় নিহত ২১২ জন। শুধুমাত্র সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯৬৯ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫০৫৮ জন।
২০১৮ ও ২০১৯ এই দুই বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০ সালে নিহত ও আহতের সংখ্যা তুলনামুলকভাবে কিছুটা কম দেখানো হলেও প্রকৃত সত্য আড়ালে রয়ে গেছে। কারণ গেল বছরের ২৬ শে মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশে কঠোর লকডাউন ছিল। মানুষ এবং যানবাহন ছিল সীমিত। এই দুই মাসের অধিক সময় যদি লকডাউন না থাকতো তাহলে গেল বছরের হিসেবটা অন্যরকম হতো। নিকট অতীতে আমরা দেখেছি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নিরাপদ সড়কের দাবীতে যখন সাধারণ ছাত্রদের পাশাপাশি কোমলমতি স্কুল ছাত্ররাও মাঠে নেমেছিল। তারা নিজেরা ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করে গাড়ী আটক করেছে। সেই সময়ে ছাত্রদের উপর হামলা-মামলার পাশাপাশি হাতুড়িপেটা করে মেরুদন্ড পর্যন্ত ভেঙ্গে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। সেই সময়ে ছাত্র সমাজের চাপের মূখে সরকার সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জড়িত চালকের মৃত্যু সহ কঠোর আইন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যায়ে পরিবহন মালিক শ্রমিক ফেডারেশনের ধর্মঘট ও হুমকী-ধামকীর কারণে আইন কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে চালক সমাজ আরো বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি সিলেটে সিএনজি অটোরিক্সার সামনে গ্রীল লাগানোর জন্য নির্দেশনা দেয় পুলিশ। কিন্তু এই আইন মানার পরিবর্তে সিএনজি চালকরা উল্টো ৩দিনের ধর্মঘট ডেকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে। এটা চালক সমাজের প্রতি সরকারের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। চালকদের এমন মারমুখী আচরণের কারণে সরকারের নমনীয়তায় কঠিন আইন প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে সড়ক দুর্ঘটনার ২০২০ সালের পরিসংখ্যানকে ছাড়িয়ে যাবে।
গত বছরের জানুয়ারি মাসে ৪৪৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৯৫ জন নিহত ও ৮২৩ জন আহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ৩৬৫টি দুর্ঘটনায় ৪৩৭ জন নিহত ও ৭৬২ জন আহত, মার্চে ৩৭৯টি দুর্ঘটনায় ৪৫৪ জন নিহত ও ৭৬৭ জন আহত, এপ্রিলে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩০ জন নিহত ও ১২০ জন আহত, মে মাসে ১৯৬টি দুর্ঘটনায় ২৪২ জন নিহত ও ২০৬ জন আহত, জুন মাসে ২৬০টি দুর্ঘটনায় ৩৩০ জন নিহত ও ২৩৩ জন আহত, জুলাই মাসে ২২০টি দুর্ঘটনায় ২৮৪ জন নিহত ও ১৯৭ জন আহত, আগস্ট মাসে ৩৪০টি দুর্ঘটনায় ৪৮৩ জন নিহত ও ৪২৩ জন আহত, সেপ্টেম্বরে ২১৬টি দুর্ঘটনায় ২৫০ জন নিহত ও ৪০৪ জন আহত, অক্টোবরে ২৩০টি দুর্ঘটনায় ২৬২ জন নিহত ও ৩৮৭ জন আহত, নভেম্বরে ২৬২টি দুর্ঘটনায় ৩১৬ জন নিহত ও ৩৭২ জন আহত এবং ডিসেম্বর মাসে ৩৬৩টি দুর্ঘটনায় ৪৫৮ জন নিহত ও ৩৯১ জন আহত হয়েছেন। এর বাইরে ৬৮২টি দুর্ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি ও রিলিজের পরে ৮২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া রেলপথে ১০৮টি দুর্ঘটনায় ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৩১ জন। ৭০টি নৌ দুর্ঘটনায় ২১২ জন নিহত এবং ১০০ জন নিখোঁজ হয়েছেন গতবছর।
২০১৯ সালে মোট ৪০০২ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫২২৭ জন নিহত ও ৬৯৫৩ জন আহত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে ৩১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪৩৯ জন নিহত ও ৭৪২৫ জন আহত হন।
মূলত সড়কের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিংয়ের অভাব, টাস্কফোর্সের ১১১টি সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া, চালকদের প্রতিযোগিতার প্রবণতা, দৈনিক চুক্তিতে গাড়ি চালানো, লাইসেন্সহীন চালক, পথচারীদের অসচেতনতা, বিরতিহীন গাড়ি চালনা, ফিটনেসহীন গাড়ি চালনা বন্ধে আইনের প্রয়োগ না থাকা, সড়ক ও মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি এবং মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, মহাসড়ক নির্মাণে ত্রুটি থাকায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা সহ যানবাহন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ভয়াল মিছিল থামাতে হবে। এজন্য সড়ক সহ পরিবহন আইনগুলোর পর্যালোচনা, নতুন আইন প্রনয়ন এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে কেউই রেহাই পাবেনা। কারণ কেউ জানতে পারবেনা সড়কে মৃত্যুর মিছিলের পরের যাত্রী কে আমি না আপনি?

Print Friendly, PDF & Email
  •  
  •  
  •  
  •  

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ