১৩ আগস্ট ২০১৮


‘আমার পুয়ারে রকিবে মারিলাইছে’

শেয়ার করুন

কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : সিলেটে পদ-পদবী নিয়ে ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ছাত্রদল। তাদের বিরোধ এত তীব্র ছিল যে, সিটি নির্বাচনে ছাত্রদলের বিদ্রোহীদের বাধার মুখে বি.এন.পি’র অন্যতম শীর্ষ নেতার পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠানস্থলও বাতিল করতে হয়েছিল। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ঢাকায় ঢেকে নিয়েও নেতা-কর্মীদের ক্ষোভ প্রশমন করতে পারেননি। সর্বশেষ গত শনিবার নিজ দলের সহকর্মীদের হাতেই খুন হন ছাত্রদল নেতা ফয়জুল হক রাজু (২৬)। ছাত্রদলের লাগামহীনতায় তটস্থ বিএনপি’র নেতাকর্মীরাও। তবে, সিলেট নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন নয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু সিলেটের ডাককে জানিয়েছেন, রাজু হত্যাকান্ডটি রাজনৈতিক নয়। তবুও বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

যেভাবে ক্ষোভের সূত্রপাত : সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কোনো ধরণের সম্মেলন কিংবা কাউন্সিল ছাড়াই গত ১৩ জুন সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। আলতাফ হোসেন সুমনকে সভাপতি ও দেলোয়ার হোসেন দিনারকে সাধারণ সম্পাদক করে সিলেট জেলা এবং সুদীপ জ্যোতি এষকে সভাপতি ও ফজলে রাব্বী আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে সিলেট মহানগর ছাত্রদলের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। রমজানের শেষ সময়ে কমিটি ঘোষণার পরই সিলেট ছাত্রদলে তুমুল ক্ষোভ উত্তেজনা দেখা দেয়। কমিটিকে টেকাতে নগরীতে নামে বিদ্রোহীরা।

কমিটির ৯ জনের পদত্যাগ : এদিকে, নবগঠিত কমিটির নেতৃবৃন্দ যাতে নগরীতে নামতে না পারে সেজন্যে পদ বঞ্চিত বিভিন্ন বলয়ের নেতাকর্মীরা এক প্ল্যাট ফর্মে এসে দাঁড়ান। তারা কমিটির বিরুদ্ধে নানা কর্মসূচী পালন করেন। কমিটি ঘোষণার পরদিন ১৪ জুন কমিটির পদবীধারী ৯ নেতা তাদের পদ থেকে পদত্যাগ করে কমিটি দ্রুত বাতিলের দাবী জানান। তাদের অভিযোগ, বিএনপি চেয়ারপার্সনের এক উপদেষ্টার মদদে মৎস্য ব্যবসায়ী, অছাত্র, বখাটেদের নিয়ে কমিটি গঠণ করা হয়। যা কখনো সিলেট ছাত্রদল মেনে নেবে না।

আমির খসরুও টিকতে পারেননি : সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গত ৯ জুলাই সোমবার দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সিলেটে আসেন। সিলেটে এসে ঐদিন বিকেলে উপশহর পয়েন্টস্থ অভিজাত হোটেলে প্রেস ব্রিফিং এর আয়োজন করে বিএনপি। এতে আমির খসরুর বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছাত্রদলের পদ বঞ্চিতরা হোটেলের বাইরে সংঘাতে জড়ালে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সেখানে ছুট যায়। এসময় বিক্ষুব্দ নেতাকর্মীদের হামলায় কমিটি গ্রুপের দুজন আহত হন। চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসময় কোন মতে বিদ্রোহীদের কাছ থেকে রক্ষা পান। পরে প্রেস ব্রিফিং হোটেলের পরিবর্তে আরিফের বাসায় করেন আমির খসরু।

আকরামের শেষ চেষ্টা : সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন চলাকালে আমির খসরুর সামনে সংঘটিত এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নড়েচড়ে বসে। ১৪ জুলাই শনিবার ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান সিলেটের পদবঞ্চিত বিদ্রোহী নেতাদের নিয়ে রাজধানী ঢাকায় বৈঠকে বসেন। বৈঠকে বলা হয়, ৩০ জুলাই সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর সিলেট ছাত্রদলের সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। সিটি নির্বাচনে দলের প্রার্থীর পক্ষে সকলকে মাঠে নামতে হবে। আকরামের নির্দেশের পরও অনেক নেতাকে নির্বাচনের মাঠে দেখা মিলেনি। তবে গ্রুপিং রাজনীতিতে সকল গ্রুপই ছিল সক্রিয়।

অতঃপর রাজুর লাশ : সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কমিটির বিরুদ্ধে পদ বঞ্চিত নেতাদের আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন ফয়জুল হক রাজু। রাজু ছিলেন মহানগর ছাত্রদলের সাবেক কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক। গত শনিবার রাত সোয়া ৯টায় নিজ আদর্শের সহকর্মীদের হাতে খুন হন রাজ। রাজুর সুরতহাল প্রতিবেদনে ৩৫টি আঘাতের কথা বলা হয়েছে। মাথার পেছনে, দু’হাতে, পায়ে, কানে, কপালসহ অসংখ্য স্থানে আঘাত আর আঘাত। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, আঘাতের ধরণ না দেখল বুঝানো যাবে না, কত নির্মমভাবে রাজুকে খুন করা হয়েছে।

‘আমার পুয়ারে রকিবে মারিলাইছে’ : আদরের পুত্র রাজুর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে ওসমানী হাসপাতালে ছুটে আসেন হতভাগ্য পিতা মোঃ ফজর আলী। হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে এসেই বিলাপ করে বলতে থাকেন ‘আমার পুয়ারে রকিবে মারিলাইছে, আমারে ৫ দিন আগেও একজনে কইছিল তোমার পুয়ারে রকিবে মারাইবো’, গত শনিবার রাত ১১ টায় বাবার বিলাপের দৃশ্য দেখে অনেকেই অশ্রুপাত করেন। পুত্রের জন্যে এক সময় মাটিতে লুটিয়ে আহাজারী করেন বৃদ্ধ ফজর আলী। ৪ সন্তানের মধ্যে ফয়জুল হক রাজু ছিল সবার বড়।

ফজর আলী পুত্রের জন্যে আক্ষেপ করে এও বলেন ‘আমরা হাবি গোষ্ঠী আওয়ামীলীগ করি- তুই কেনে ছাত্রদলে গেলেরেবা’। অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক ছাত্রদল নেতা আব্দুর রকিব মেয়র আরিফের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত। তবে, আব্দুর রকিব চৌধুরী এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন।

কেন্দ্রের দায়সারা জবাব : সিলেট ছাত্রদলের লাগামহীন এ অবস্থার ব্যাপারে জানতে চেয়ে গতকাল রোববার রাতে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল আহসান মিন্টুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা যতটুকু খবর নিছি, শনিবারের ব্যাপারতো কমিটি কেন্দ্রীক না। এটা এক পক্ষের ঘটনা মনে হচ্ছে। আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি।’

কমিটি বাতিল স্থগিত বা বর্ধিত হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আকরাম বলেন, আধিপত্য নিয়ে হয়তো এটি হতে পারে। আমরা আগে খোঁজ খবর নিয়ে দেখি আসলে সেদিন কি ঘটেছিল। এরপর দেখা যাবে কি পদক্ষেপ নেয়া যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেট বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা জানান, সিলেটে ছাত্রদলের কর্মকান্ডে তারাও অনেকটা বিরক্ত। নবনির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে তারা ছাত্রদলকে এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

(আজকের সিলেট/১৩ আগস্ট/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন