১৫ আগস্ট ২০১৮


‘জাতির প্রতি অগাদ বিশ্বাষই কাল হয় বঙ্গবন্ধুর’

শেয়ার করুন

১৫ আগস্ট বাঙ্গালি জাতির জন্য এক শোকাবহ কলংকময় দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, হাজারো বছরের শ্রেষ্ট বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যরা নৃশসংভাবে সপরিবারে হত্যা করে। তবে বঙ্গবন্ধুকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করা হলেও ইতিহাস থেকে নিশ্চিহৃ করতে পারেনি এচক্র। ইতিহাসের বাকেঁই স্থান করে নিয়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এর মাঝে কেটে গেলো প্রায় ৪৩ বছর। ৭৫ এর পরকর্তী সময় দেশের পরিস্থিতি কেমন ছিলো এসব কথা জানতেই আমরা আজ মুখোমুখি হয়েছি এক বরেণ্য মুজিব সৈনিকের। আজকের সিলেট পাঠকদের ৭৫ এর কথা জানাচ্ছেন সাবেক তুখোড় ছাত্রনেতা ও সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক বিজিত চৌধুরী। তাঁর সাথে কথা বলতে গিয়ে উঠে এসেছে তখনকার সময়ের নানা কথা। স্বাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছেন আমাদের প্রধান প্রতিবেদক।

আজকের সিলেট : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে কিছু বলুন?

বিজিত চৌধুরী : আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান ও প্রাণে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে খুব বেশী বলা সম্ভব নয়। তবে তখন আমি ক্লাস সেভেন-এ পড়তাম। বয়সে ছোট থাকলেও সেদিন এইটুকু অনুভব করেছিলাম যে দেশের আকাশ থেকে একটি নক্ষত্র ঝরে পড়েছিলো। ১৯৪৭ সালের পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাঙ্গালি জাতি বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যায়। সময়ের অনিবার্য দাবীর প্রেক্ষিতেই পূর্ব পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে জাতির নেতৃত্বে এগিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু। নিজের কর্মদক্ষতা, ত্যাগ তিতিক্ষাই বঙ্গবন্ধুকে পর্যায়ক্রমে জাতির পিতায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। স্বাধীনতার স্থপতিকে এভাবে হত্যা করা যায় তা কখনো বিশ্বাসযোগ্য ছিলনা। এমনকি বঙ্গবন্ধু নিজের এটি বিশ্বাষ করতেন না। বিভিন্ন গোয়েন্দাসংস্থা যখন রিপোর্ট দিলো যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তখনো তিনি এটি বিশ্বাষ করেন নি। তিনি বলেছিলেন- ‘এরা আমার ভাই। আমি এই জাতির জন্য জীবনের সবকিছু ত্যাগ করেছি। এ জাতি আমাকে কখনো হত্যা করতে পারে না।’ বঙ্গবন্ধুর এই অগাদ বিশ্বাষই শেষ পর্যন্ত কাল হলো।

আজকের সিলেট : এই হত্যাকান্ডের পেছনে মূল কারন কি ছিল বলে আপনি মনে করেন?

বিজিত চৌধুরী : স্বাধীনতার কিছুদিন পরপরই ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান, আসম আব্দুর রব ও হাসানুল হক ইনু গংরা বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করতে জাসদ গঠন করে। মুক্তিযোদ্ধে যারা বিরোধীতা করেছিল, যারা তখনও মনেপ্রাণে বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি তারা জাসদে যোগ দিল। দেশে অস্থিতিশীল করার জন্য গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হলো। এসব ষড়যন্ত্রই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়। এবং স্বাধিনতা বিরোধীদের সাথে আতাত করে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যরা এই কিলিং মিশনে অংশ নেয়।

আজকের সিলেট : ’৭৫ এর পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশ কেমন ছিলো?

বিজিত চৌধুরী : দীর্ঘ ৯মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীনতা লাভকারী যুদ্ধবিধস্ত দেশকে বঙ্গবন্ধু যখন পুনঃগঠন করতে ব্যস্থ ছিলেন, তখনই এই হত্যাকান্ড চালানো হলো। বঙ্গবন্ধুকে হ্যতার পূর্বে সেই সময়ে জাসদকে সারাদেশে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে মিছিল করত। কিন্তু ১৫ আগস্টের পর জাসদ ধীরে ধীরে বিলিন হতে থাকে। এমনকি বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে শহিদ হওয়ার দিনেও বর্তমান মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ তার অনুসারীরা ট্যাংকের উপর নিত্যকরে উল্লাস করেছিল। এর পর ধীরে ধীরে জাসদ নিশ্চিহ্ন হতে লাগলো। যারাই জাসদে ছিলেন তারা নিজ মহিমায় আবির্ভূত হতে লাগলেন। নতুন নতুন দল গঠন হলো। যদিও বঙ্গবন্ধু কন্যার অনুগ্রহে ইনু মন্ত্রী হয়েছেন তথাপি তার দলের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। যদিও ইনুরা বঙ্গবন্ধু হত্যায় সরাসরি অংশ গ্রহন করেনি তবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরীর ইতিহাসের দায় জাসদকেই নিতে হবে।

আজকের সিলেট : ’৭৫ এর ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ রয়েছে, আপনি কি মনে করেন?

বিজিত চৌধুরী : আসলে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেনাসমর্থিত, বিতর্কিত ও স্বৈরাচারী সরকার একে একে ক্ষমতায় আসার ফলে মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস বিকৃতির প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যার দীর্ঘ ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিলো। তবে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তোরসূরী জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর পাঠ্যপুস্তক সহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধের সঠিক জাতির কাছে তুলে ধরা শুরু হয়েছে। নতুন প্রজন্ম এখন মুক্তিযোদ্ধে সঠিক ও তথ্যনির্ভর ইতিহাস জানার সুযোগ পাচ্ছে। যে জাতি তার সঠিক ইতিহাস জানে না, সে জাতি উন্নত হতে পারেনা।

আজকের সিলেট : নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন?

বিজিত চৌধুরী : খুনীরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে খুন করেছিল তাদের সে উদ্দেশ্য সাময়িক পুরণ হলেও বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার মাঝেই জাতি আজ শেখ মুজিবুর রহমানকে খুঁজে পেয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়াতা ছাড়াই আমরা আজ পদ্মাসেতু করতে পারছি। দেশে আজ বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে আমরা এখন মহাকাশে পৌঁছেছি। তাই নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযোদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে বুকে লালন করতে হবে। তবেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে।

একজন বিজিত চৌধুরী
বিজিত চৌধুরী ১৯৭৯ সালে মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহন শুরু করেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ ৩ বছরের বেশী সময় কারাগারে ছিলেন। ১৯৯২ সালে তিনি ভোটের মাধ্যমে সিলেট জেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমানে মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

রাজনীতির পাশাপাশি বিজিত চৌধুরী মদন মোহন বিশ্ব বিদ্যালয় কলেজ-এর গভর্নিং বডির সদস্য, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট সদস্য, সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যকরী কমিটির সদস্য, সদ্য অনুষ্ঠিত সিলেট চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রি’র প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি রংমহল টাওয়ার এর পরিচালক এবং ডিস্ট্রিক্ট ফুটবল এসোসিয়েশন সিলেট এর কার্যকরী সদস্য এবং বেসরকারী কারা পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি একটি এনজিও সংস্থার নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

(আজকের সিলেট/১৫ আগস্ট/এসটি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন