৪ আগস্ট ২০১৭


আরেকটি শোকাবহ আগস্টে কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?

শেয়ার করুন

আদনান ফাহাদ : আগস্ট মাস শুরু হল আজ। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের অষ্টম মাস। অন্যকোনো দেশ ও জাতির জন্য অন্য আর ১১টি মাসের মতই; কিন্তু বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে আগস্ট মাস গভীর শোকের ও বেদনার মাস। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের ১৫ তারিখ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেনাবাহিনীর কিছু উচ্ছৃঙ্খল ও বিপথগামী সৈনিকের হাতে সপরিবারে প্রাণ দিয়েছিলেন। ১৫ ই আগস্ট তাই আমাদের জাতীয় শোক দিবস।

বিদেশে থাকায় সেই কালোভোরে প্রাণে বেঁচে যান জাতির জনকের দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুর সাথে সে হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন তাঁর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, ভাই শেখ নাসের ও কর্নেল জামিল, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শহীদ সেরনিয়াবাত, শিশু বাবু, আরিফ রিন্টু খানসহ অনেকে।

আগস্ট মাস তাই বাঙালির, বাংলাদেশের গভীর শোকের মাস। যে মহামানব জীবনের সবটুকু সময়, মেধা ও শারীরিক-মানসিক শ্রম দিয়ে, বছরের পর বছর পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অবর্ণনীয় অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে বাঙালির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাকে এই দেশেরই কিছু বেঈমান, বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে হত্যা করেছিল এই আগস্ট মাসে। আগস্ট মাস আসলেই যেন বাঙ্গালির বিবেক বলে উঠে ‘কাঁদো বাঙালি, কাঁদো’। জাতির জনককে হারিয়ে বাঙালি জাতি হতবিহবল হয়ে পড়লেও বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবার কোমর সোজা করে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনো দুর্নীতি আর নৈরাজ্য থাকলেও বিশেষ করে গত আট বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে উৎসাহব্যঞ্জক পরিবর্তন এসেছে।

জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা অদ্যাবধি অর্জিত না হলেও অভীষ্ট লক্ষ্যে বাংলাদেশ যে শত বাধা ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে, তার প্রমাণ হল, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩২তম অর্থনীতি। প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাসসহ মানব উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারত ও চিরশত্রু পাকিস্তানকে বহু আগেই পেছনে ফেলেছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ গত কয়েকবছরে ১২ শতাংশ অতি দারিদ্র্য হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে। ভারত ও মিয়ানমারকে আইনি লড়াইয়ে পরাজিত করে সুবিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন করে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে রাষ্ট্র হিসেবে তাঁর ভিত এখন অনেক শক্ত। শেখ হাসিনার সরকার আইনি প্রক্রিয়া মেনে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। গোলাম আযম, আলী আহসান মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাইদী কিংবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মত কুখ্যাত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে অনেক এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতু ইস্যুতে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ বিরোধিতা আর মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ে জিতে শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের শক্তিমত্তার প্রদর্শন করেছে। শেখ হাসিনা একজন বিপ্লবী জাতীয় নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে জাতির জনকের কন্যা হিসেবে তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করেছেন।

কিন্তু বাংলাদেশ-বিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র থেমে নেই। আগস্ট মাস আসলেই যেন অপশক্তি তৎপর হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে চায়। ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামীলীগের সমাবেশে স্মরণকালের ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রেতাত্মারা। শেখ হাসিনা আল্লাহর অশেষ কৃপায় প্রাণে বেঁচে গেলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ বহু আওয়ামী নেতা-কর্মী হতাহত হয়।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা চালায় একই জঙ্গিগোষ্ঠী। এই দিনে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)।

এরপরেও পথ হারায়নি বাংলাদেশ। অপশক্তির অপতৎপরতাও বন্ধ নেই। ২০১৩-১৫ সালে স্বাধীনতাবিরোধী জামাত ও তার রাজনৈতিক দোসর বিএনপির যৌথ সন্ত্রাসী তৎপরতায় বাংলাদেশের মানুষ বর্বরতার শিকার হয়েছে। সে বাধা দূরে ঠেলে বাংলাদেশ দ্রুতই কামব্যাক করেছে। কিন্তু গত আট বছরের নানা সাফল্যগাঁথা ম্লান করে দিচ্ছে উন্নয়নকাজে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের যৌথদুর্নীতির ফসল দুর্বল রাস্তাঘাট ও বাঁধসমূহ। ঢাকা, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা, জ্যামসহ নানাবিধ অব্যবস্থাপনা সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ম্লান করে দিচ্ছে। একটি দুর্নীতিমুক্ত ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম তৈরি করতে না পারলে জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠবে। নতুন প্রজন্মকে আগস্ট মাসের শোকাবহ ইতিহাস সঠিকভাবে জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বলীয়ান করে নির্মাণ করতে পারলেই কেবল একটি প্রকৃত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

(লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক।)

শেয়ার করুন