৬ আগস্ট ২০১৭


বিভক্ত বালাগঞ্জ-ওসমানীনগরে ছাত্রলীগ, বাড়ছে দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভ

শেয়ার করুন

বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর প্রতিনিধি : দীর্ঘদিন পর বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের চার সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হলেও ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছেন নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের গুঞ্জনে গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত থাকা ছাত্রলীগ নেতারা পদ বাগিয়ে নিতে জোর লবিং ও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। নিজেদের অনুগত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের পদ পাইয়ে দিতে ওসমানীনগর উপজেলা আওয়ামীলীগ ও যুবলীগের সিনিয়র নেতারাও বিভিন্নভাবে লবিং করছেন।

দীর্ঘদিন ধরে কমিটিবিহীন থাকা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন কিছুটা চাঙাভাব দেখা যাচ্ছে। আবার কয়েকটি বলয়ে বিভক্ত থাকা বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে কাক্সিক্ষত পদ না পেয়ে পদবঞ্চিতরা পাল্টা কমিটি ঘোষণা করেছেন। কমিটির ঘোষণার পর ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে আরো অনৈক্য বেড়েছে।

ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কিন্তু বিগত দিনে বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমন্বয়হীনতার অভাবেই ছাত্রলীগের কমিটি গঠন হয়নি। যেহেতু আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের অভিভাবক সংগঠন। তাই সম্মেলনের মাধ্যমে সুন্দর পরিবেশে ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করার দাবি জানিয়েছেন তৃণমূল ছাত্রলীগ কর্মীরা।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ ছাত্রলীগের হাতে নেই। নিয়ন্ত্রণ করেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সিনিয়র নেতারা। আর সিনিয়র নেতাদের বেশ কয়েকটি গ্রুপ ও উপগ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপ ও উপগ্রুপে এখন কর্মীদের অভাব নেই। এরা ছাত্রলীগের পদবিধারী না হলেও কর্মকান্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত। এদের মধ্যে রয়েছেন অনেক অছাত্র।

সূত্র জানায়, ২০০২ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রলীগে কমিটি গঠন করা হয়। গঠিত কমিটিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে কমিটিবিহীন হয়ে পড়ে বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রলীগ।

সম্প্রতি বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হলেও ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রলীগ কমিটিবিহীন রয়েছে। এতে ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন ত্রাণ বিতরণ করতে সম্প্রতি বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর এলে কমিটি গঠনের দাবি জানান ছাত্রলীগ নেতারা। নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। এরই ধারাবাহিকতায় বালাগঞ্জে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করে জেলা ছাত্রলীগ। কিন্তু ওসমানীনগর উপজেলায় ছাত্রলীগের কমিটির অপেক্ষায় থাকা নেতারা কাক্সিক্ষত পদের জন্য দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত রয়েছেন।

ওসমানীনগর উপজেলায় ছাত্রলীগের সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন এম মিজানুর রহমান মিজান, ইমরান হোসেন, জুবায়ের আমিন, রনি পাল, রাজন দেব, সুলেমান খান, বাপ্পু দেব। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন ফয়সুলুর রহমান, নিপ্পন সূত্রধর, সেলিম আহমদ।

এদিকে বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের দু’দিন পর পাল্টা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন নেতাকর্মীরা। ২০০২ সালে গঠিত উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর কয়েক দফায় সম্মেলনের প্রস্তুতি নেয়া হলেও দলীয় জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

দীর্ঘ ১৫ বছর পর গত ১৯ জুলাই সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ ও সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল ও নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগ ও বালাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। নতুন কমিটি গঠনের জন্য ২৫ জুলাইর মধ্যে জেলা কমিটির পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের বৃত্তান্ত আহবান করা হয়। এরপর গত ২৭ জুলাই বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের এক বছর মেয়াদি চার সদস্য কমিটি ঘোষণা করে জেলা কমিটি।

এই কমিটিতে সভাপতি পদে আব্দুর রকিব জুয়েল, সহসভাপতি পদে জুয়েল আহমদ, সাধারণ সম্পাদক পদে রুবেল আহমদ ও সাইফুর রহমান বেলালকে সহ-সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। এর পরদিন ২৭ জুলাই চারজনের নামোল্লেখ করে এক বছর মেয়াদি বালাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা দেয় জেলা কমিটি। এ কমিটিতে আবুল কালামকে সভাপতি, আব্দুল আজিজ ময়নুলকে সহসভাপতি, কামরুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক ও রাশেদ আহমদকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।

এদিকে গত ২৮ জুলাই বিকেলে স্থানীয় মোরারবাজারে বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের ব্যানারে ছাত্রলীগ নেতা জিয়াউল হক পান্নার সভাপতিত্বে ও ছাত্রনেতা কওছর আহমদের পরিচালনায় তৃণমূল ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ কর্তৃক সংগঠনের গঠনতন্ত্র বহির্ভূত ও সম্মেলনবিহীন উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি ফেইসবুকে প্রকাশ করা হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে পাল্টা কমিটি ঘোষণা করা হয়।

বিদ্রোহী কমিটিতে সভাপতি জিয়াউল হক পান্না, সহসভাপতি জাকির হোসেন, সাধারণ সম্পাদক কাউছার আহমদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম তাহমিদ চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউর রহমান ফাহিম ও সাজু আহমদকে দপ্তর সম্পাদক মনোনীত করা হয়েছে।

বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা শামীম আহমদ উপজেলা ছাত্রলীগের গঠিত কমিটিতে সহসভাপতি পদ ও তারেক আহমদ আহমদ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ চেয়েও বঞ্চিত হয়েছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বিদ্রোহী ছাত্রলীগ নেতারা অভিযোগ করে বলেন, বালাগঞ্জ উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে তিনটি ইউনিয়ন সিলেট-২ (বালাগঞ্জ সদর, বোয়ালজুড়, পুর্ব পৈলনপুর) আসন এবং তিনটি ইউনিয়ন সিলেট-৩ আসনের (দেওয়ান বাজার, পশ্চিম গৌরীপুর, পূর্ব গৌরীপুর) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সিলেট জেলা ছাত্রলীগ কতৃক অনুমোদিত নাম সর্বস্ব কমিটিকে সিলেট-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত একটি মাত্র ইউনিয়নের ছাত্রলীগ নেতাদের দিয়ে উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পদক এম রায়হান চৌধুরী বলেন, ওসমানীনগর উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের জন্য নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বৃত্তান্ত সংগ্রহের কাজ চলছে। শিগগির কমিটি ঘোষণা করা হবে।

বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা পর পাল্টা কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যোগ্যদেরকে দিয়েই বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি দেয়া হয়েছে। কমিটি গঠনের বিষয়ে ইউনিয়নভিত্তিক কোনো প্রাধান্য দেয়া হয় না। যারা পাল্টা কমিটি করেছে তাঁরা অনুপ্রবেশকারী। তাদেরকে চিহ্নিত করা হচ্ছে, এটি তাদের ব্যক্তিগত দায়।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে তারা তাদের যদি ভুল স্বীকার করেছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা আমাদের কাছে ভুল স্বীকার করলে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

ভুল স্বীকারের বিষয়ে বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের পাল্টা কমিটির সভাপতি জিয়াউল হক পান্না বলেন, আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে কমিটি গঠন করেছি। এ বিষয়ে কারো কাছে ভুল স্বীকার করার প্রশ্নই ওঠে না। যদি কেউ এ রকম বলে থাকেন তাহলে সেটা মিথ্যাচার। আমাদের গঠিত কমিটির পক্ষ থেকে আমরা ছাত্রলীগের সকল কর্মসূচিসহ জাতীয় দিবসগুলো পালন করব।

জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আখতারুজ্জামান চৌধুরী জগলু বলেন, ছাত্রলীগ হচ্ছে ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর হচ্ছে ছাত্রলীগের দুর্গ। সম্মেলন হচ্ছে একটি রাজনৈতিক দলের শিল্পকর্ম। কিন্তু বালাগঞ্জসহ অন্যান্য উপজেলায় সম্মেলন ছাড়াই কমিটি দেয়া হয়েছে। এতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ বাড়ছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে।

তিনি বলেন, সম্মেলনের মধ্যমে উপজেলাগুলোতে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়া না হলে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়বে। যোগ্যতার মাপকাঠিও নির্ণয় করা যাবে না। তবে সম্মেলনের বিকল্প হিসেবে কাউন্সিলরদের দিয়ে ভোটের মাধ্যমে কমিটি গঠন করলে তা অনেকাংশেই গ্রহণযোগ্যতা পায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

(আজকের সিলেট/৬ আগষ্ট/ডি/এসসি/ঘ.)

শেয়ার করুন