১১ আগস্ট ২০১৭


কমলগঞ্জে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে দঁড়ি দিয়ে বেধে রাখছেন মেয়ে

শেয়ার করুন

বিশ্বজিৎ রায়, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) থেকে : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের অবঃ সেনা সদস্য আব্দুর সাত্তার ১৯৭১ সালে ২৫ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের সময় ২ নং সেক্টরের চট্রগ্রাম এলাকায় শহীদ হয়েছিলেন। স্বামীহারা হয়ে স্ত্রী মেহেরজান বেগম (৬৫) কিছুটা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়েন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী এখন পাগল অবস্থায় দ্বিতীয় মেয়ের বাড়িতে বসবাস করলেও তার নিরাপত্তার কথা ভেবে মেয়ে তাকে লাইলনের দঁড়ি (রশি) দিয়ে ঘরে বেঁধে রাখছেন। অন্য দিকে অভিযোগ উঠেছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা উত্তোলন করে নিচ্ছেন তারই শ্যালক জমশেদ হোসেন। রঘুনাপুর গ্রাম ঘুরে এ চিত্র পাওয়া যায়।

সরেজমিন রঘুনাথপুর গ্রামে গেলে গ্রামবাসীরা জানান, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য আব্দুস সাত্তার ১৯৭১ সালে দেশ মাতৃকা রক্ষা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। এ সময় স্ত্রী মেহেরজান বেগম(৬৫) ও তাদের গর্ভজাত ২ বছরের সন্তান মেয়ে লাকী বেগমকে বাড়িতে রেখে যান। মুক্তিযুদ্ধে স্বামী মারা যাবার খবর শুনার পর থেকে স্ত্রী মেহেরজান বেগম কিছুটা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়েন। স্বামীহারা হয়ে পড়ায় মেহেরজান বেগম (৬৫)কে দেশ স্বাধীনের পর এ গ্রামের তাহির আলীর সাথে দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

দ্বিতীয় দফায় মেহেরজান বেগমের আরও একটি মেয়ে সাফিয়া বেগমের জন্ম হয়। বড় মেয়ে লাকী বেগম দুই বছর আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে মা মেহেরজান বেগম পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলে তার ছোট ভাই অবঃ সেনা সদস্য জমমেদ হোসেন ও অফর ভাই জসিম হোসেন তাকে (বোনকে) নিজ বাড়ি থেকে তাঁড়িয়ে দিলে ছোট মেয়ে সাফিয়া বেগম মায়ের দেখাশুনা করছেন। তবে মা মেহেরজান বেগম পুরোপুরি পাগল হয়ে যাওয়ায় কোথাও কোন দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন ভেবে তার নিরাপত্তার জন্য মেয়ে তাকে বাড়িতে হাতে লাইলনের দঁড়ি দিয়ে বেধে রাখছেন। মাঝে মাঝে দঁড়ির বাঁধন খুলে দেওয়া হয়।

মেয়ে সাফিয়া বেগম বলেন, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মা তার বাড়িতে আছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন তাদের মামা (শহীদ মুক্তিযোদ্ধার শ্যালক) অবঃ সেনা সদস্য জমশেদ হোসেন ভগ্নিপতির ভাতার টাকা উত্তোলন করে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। তিনি ইচ্ছে হলে বোন মেহেরজানকে কিছু টাকা দেন আর বাকী সমূহ টাকা নিজে নিয়ে যান। এ অবস্থায় মা মেহেরজান বেগম পুরো পাগল হয়ে এখণ গুরুতর রোগে ভোগছেন। ঠিকমত চলাফেরাও করতে পারছেন না। তার সার্বিক নিরাপত্তার কথা ভেবে মাঝে মাঝে বাড়িতে দঁড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হচ্ছে।

অন্যদিকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা জালিয়াতি বন্ধ করে নাতি হিসাবে সে দাবিদার বলে ভাতা গ্রহনের অনুমতি দিতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে লাকী বেগমের ছেলে আসাদুল হক একরাম (১২) কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে বিগত ৪ এপ্রিল ২০১৭ ইং লিখিত আবেদন করে। এ আবেদনের তদন্ত চলছে।

মেহেরজানের সাথে কথা বললে তিনি জানান, তাকে কেনো বেঁধে রাখা হয় তা তিনি জানেননা। স্বামীর ভাতার কথা জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বলেন তার স্বামীর ভাতার টাকাটা তার ভাই জমসেদ মিয়া তুলে খাচ্ছেন। তিনি বলেন লাকি ও সাফিয়া নামে তার দু’টি মেয়ে রয়েছে।

অভিযোগ সম্পর্কে মেহেরজান বেগমের অভিযুক্ত ভাই জমসেদ হোসেন বলেন, তিনিও একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য। ভাতা মেহেরজান বেগম নিজে উত্তোলণ করে এ টাকা দিয়ে নিজের চিকিৎসা সেবা গ্রহন করেছেন। ভাই হিসাবে তিনি সাথে ছিলেন। বোন মেহেরজানের জরায়ূ ক্যান্সার বলে তাকে দুইবার হাসপাতালে ভর্তি করিয়েও অস্ত্রোপচার করা যায়নি। তিনি কোন ভাতার টাকা উত্তোলণ করে নেননি। তিনি তার বোনের বিষয়টি নিয়ে অনেক কষ্ট করে ৭৬ লÿ টাকা উত্তোলনের জন্য প্রদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন কিন্তু তার মৃত ভাগ্নি লাকী বেগমের জন্য তা বাস্তবায়িত করা যায়নি। তিনি আরও বলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মেহেরজান বেগমের স্বামীর কাগজাদি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটিতে দাখিল না করাতে বর্তমানে ভাতা বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন তার বোন স্বাক্ষর করলেই ভাতা উঠে তাই তিনি মেরে খাবার প্রশ্নই উঠেনা।

এ ব্যাপারে কমলগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল মুনিম তরফদার বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বা তার সাথে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য ব্যবস্থা নিবেন।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হক বলেন, তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।

 

(আজকের সিলেট/১১ আগষ্ট/ডি/ডিটি/এসটি/ঘ.)

শেয়ার করুন