১৬ আগস্ট ২০১৭


সিলেটে বন্যায় ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ দেড় লাখ মানুষ

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সম্প্রতি পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট দু’দফা বন্যায় সিলেটের আট উপজেলার ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অকাল বন্যা কেড়ে নিয়েছে ৪ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমির ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচশত কিলোমিটার সড়ক। বন্যার কারণে জেলার ৯৯ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ ছিল। বন্যার্তদের সহায়তায় এ পর্যন্ত ৮৩৯ মেট্রিক টন চাল এবং ১১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদফতরের মাসিক প্রতিবেদনে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির এসব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে পাহাড়ি ঢল ও অতিবর্ষণের ফলে সৃষ্ট দু’দফার বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারি তহবিল থেকে বন্যা কবলিত এলাকায় যেসব সহায়তা দেয়া হয়েছে তাও উল্লেখ করা হয়েছে।

গত জুন মাসের শেষের দিকে পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গিয়ে সিলেটের আটটি উপজেলার সবগুলোই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, কানাইঘাটের একাংশ, বিশ্বনাথ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা।

ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদফতরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দু’দফা বন্যায় সিলেটের আট উপজেলার ৫৭ টি ইউনিয়নের ৪৭৭ টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩০ জন মানুষ বন্যাকবলিত হন। সব মিলিয়ে বন্যায় জেলার ২১ হাজার ২০টি পরিবার ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এ সময় পানিতে ডুবে মারা যান ৪ জন। যাদের মধ্যে বালাগঞ্জ উপজেলায় ৩ জন এবং দক্ষিণ সুরমায় ১ জন রয়েছেন।

বন্যা কবলিত বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জে ১২টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ১৫১ টি পরিবারের ৬৮৯ জন বন্যার্ত লোক আশ্রয় নিয়েছিলেন। বন্যায় সাড়ে তিন কিলোমিটার বাঁধের ক্ষতি হয়। এছাড়া আশিংক ক্ষতি হয়েছে আরও এক কিলোমিটার বাঁধের। ৯৯ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ থাকে। বন্যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধে ৭৮ টি মেডিকেল টিম কাজ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার মধ্যে বালাগঞ্জের ৬ ইউনিয়নের ৮৫টি গ্রামের ৭৮ হাজার ৫২০ জন মানুষ বন্যা কবলিত হন। এই উপজেলায় ৫৫৮ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

ওসমানীনগর উপজেলার ৮ ইউনিয়নের ৭৫ গ্রামের ১ হাজার ৪৭০ পরিবারের ৭ হাজার ৩৫০ জন লোক বন্যায় ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই উপজেলায় ৪৩৭ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে যায়।

বিয়ানীবাজারের ১১ ইউনিয়নের ৫৬ গ্রামের ২২ হাজার ৫৬০ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ হাজার ৫০ হেক্টর জমির ফসল।

ফেঞ্চুগঞ্জের ৫ ইউনিয়নের ৪৮ গ্রামের ৫৫০ পরিবারের ৩ হাজার ৩০০ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৫৫০ হেক্টর জমির ফসল।

গোলাপগঞ্জ উপজেলার ৯ ইউনিয়নের ১০১ গ্রামের ৩ হাজার ৩৮০ পরিবারের ১৬ হাজার ৯০০ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমির ফসল।

জকিগঞ্জের ৮ ইউনিয়নের ৭৮ গ্রামের ২২শ’ পরিবারের ১০ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

দক্ষিণ সুরমার বন্যাকবলিত ৪ ইউনিয়নের ১৬ গ্রামের ৪০০ পরিবারের ২ হাজার ২০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ৩৫০ হেক্টর জমির ফসল।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৬ ইউনিয়নের ১৮ গ্রামের ৬৭৫ টি পরিবারের ২৭শ’জন লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া বাকি পাঁচ উপজেলায় বন্যার কোন ক্ষয়ক্ষতি নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মফজুলের রহমান মজুমদার বলেন, ‘দু’দফা বন্যায় সিলেট জেলার আটটি উপজেলা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব উপজেলার ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত এসব সহায়তা বিতরণের পরেও বর্তমানে জেলা ত্রাণ তহবিলে ২২৫ মেট্রিক টল চাল এবং ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা মজুদ রয়েছে।’

কৃষি বিভাগ জানায়, দুই দফা বন্যায় সিলেটের আট উপজেলার বেশির ভাগ ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ কৃষক। তবে আউশ মৌসুমে ব্রী-৪৮ ও ২৮ এর ফলন ভাল হওয়ায় ক্ষতির প্রভাব কাটিয়ে উঠবেন বলে আশা প্রকাশ করেছে কৃষি বিভাগ।

সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ আলতাবুর রহমান জানান, দু’দফার বন্যায় আট উপজেলার বেশিরভাগ জমির ফসল বন্যায় তলিয়ে যায়। তবে পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া আউশে এবার পোকার আক্রমণ এবং চিটা না থাকায় ফলন ভাল হয়েছে। এ কারণে কৃষকরা বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে উঠবেন বলে আশা করছেন তিনি।

সিলেটের জেলা শিক্ষা অফিসার নূরুল ইসলাম জানান, বন্যায় সিলেটের শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ ছিল। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান শুরু হয়েছে।

সিলেট সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী উৎপল সামন্ত ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম মহসিন জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা-ঘাটের বিবরণ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা-ঘাটের মেরামত শুরু হবে বলে জানান তারা।

 

 

(আজকের সিলেট/১৬  আগষ্ট/ডি/এসসি/ঘ.)

শেয়ার করুন