৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭


হাওরপারের ঈদ আনন্দ অশ্রু হয়ে মিশছে পানিতে

শেয়ার করুন

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : অকাল বন্যায় ফসল হারানো সুনামগঞ্জের হাওরপারের লাখ লাখ কৃষক পরিবারে নেই ঈদুল আজহার উৎসাহ-উদ্দীপনা। আছে নিজের ও সন্তানদের নতুন কাপড় কিনে দিতে না পারার হতাশা, বুকভরা দীর্ঘশ্বাস। ফলে হাওরপারের মানুষগুলোর ঈদের সব আনন্দ চোখের জল হয়ে যেন হাওরের পানিতেই মিশে একাকার হচ্ছে। ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বাড়িতে যেখানে থাকত সাজ সাজ রব সেখানে আজ কেবলই শূন্যতা।

ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সাদৃশ্য গ্রামগুলোতে টাকার অভাবে অনেকেই প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই করতেও পারছে না। ফসলহানির পর থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দব্যমূল্যের দাম আকাশ ছোঁয়া। জেলার হাওরবাসী বর্ষার এই ছয় মাস বেকার থাকে। এই সময়ে হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলো মাছ না পাওয়ায় অসহায় বেকার সময় পার করছে।

জেলার বিভিন্ন হাওরপারের ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবার বছরের শুরুতেই চৈত্র মাসে জেলার দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, দোয়ারা বাজার, বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার হাওরের বাঁধ ভেঙে জীবন বাঁচার একমাত্র হাতিয়ার জেলার ১৫৪টি হাওরের ৯০ শতাংশ বোরো ধান, কালবৈশাখী ঝড়ে ৩০ হাজার ঘর-বাড়ির ক্ষতি হয়। আর সম্প্রতি আবারো বন্যায় ১২ হাজার হেক্টর ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ কৃষক পরিবারের মাঝে এখন ঈদের আনন্দ নেই। আছে বুকভরা দ্বীর্ঘশ্বাস, আর্তনাত আর আহাজারি। সরকারি ফেয়ার প্রাইজ, ওএমএস চাল, টিসিবির পণ্য বন্ধ, ভিজিএফ কার্ডে অনিয়মের কারণে সঠিকভাবে সহায়তাও পায়নি হাওরবাসী। সরকারি সহযোগিতা যা ছিল তাও প্রয়োজনের তুলনায় কম।

হাওরপারের কৃষক সাদেক আলী, রফিকুল ইসলাম জানান, বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল কৃষক পরিবারগুলোর চাষাবাদের গরু আর গোলা (ধান রাখার পাত্র) এখন শূন্য। এখন নেই ঘরে নগদ টাকা ও খাবার চাল। এই অবস্থায় নিজের ও পরিবারের জন্য দু-মুটো খাবার জোগাড় করার দায় হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ হাওরবাসী অর্থাহারে, অনাহারে, অভাব-অনটনকে সঙ্গী করে খেয়ে না খেয়ে অতিকষ্টে সামনে ঈদের সব আনন্দ ভুলে এখন দিনপার করছে ত্রাণের আশায়। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও সরকারের সুনজর না থাকায় এই মানবসম্পদ এখন সমাজের বোঝা হচ্ছে দিন দিন। যার জন্যে এই অনুন্নত অবহেলিত হাওরবাসীর কণ্ঠে কেবলেই শুধু বাঁচার আকুতি।

কৃষক করিম মিয়া বলেন, ‘কী কইমু ভাই এবার বোরো ধান হারিয়ে একবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছি। এখনত জান যায় খাইমু কই থ্যাইকা। এই বার ত বৈশাইকা গেল আর ক দি আগে আগুন মাইয়া ধানও গেল। ঈদ আইলেও কী হইব হাতে টাকা নাই পোলা মাইয়ারে কীভাবে নতুন কাপড় কিনা দিমু আর জীবন চালাইমু বুজতা পারতাছি না। কোরবানির কথা ত চিন্তাই করতা পারি না। শুনি সরকার নাকি হাওর উন্নয়নের লাগি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, মিল-কলখারকানা, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করে আমরার ব্যাপারে উদাসীন কেরে।’

জমির উদ্দিন ও সাজন মিয়া বলেন, ‘বোরো ফসলহানির পর কোনো আনন্দই নেই হাওরে। ঈদের আনন্দ আর এখন থাকব কী কইরা। বর্ষায় হাওরে মাছ ধইরাই জীবন বাঁচত কিন্তু হাওরের বোরো ধান ডুবার পর থেইকাই মাছ নাই। সরকারিভাবে মাছের পোনা হাওরে ছাড়ার কথা ছাড়ছে দায়সারাভাবে নাম মাত্র।’

তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মাসুক মিয়া, তাহিরপুর উপজেলার মুক্তিযুদ্ধা সন্তান খেলু মিয়াসহ জেলার সচেতন মহল মনে করেন, হাওরের বেকার জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিণত করার জন্য বোরো ধান চাষাবাদের পাশাপাশি বিকল্প কাজের জন্য মিল-কলখারকানা স্থাপন, হাওরের বিশাল নারী গোষ্ঠীকে কুটির ও হস্তশিল্পে পারদর্শী এবং আধুনিক ও উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হাঁস, মুরগি লালন-পালনের সঙ্গে যুক্ত করা হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অভাব থাকবে না জীবন বাঁচার অবলম্বন খুঁজে ঈদের আনন্দের মতোই জীবন উপভোগ করতে পাবে হাওরবাসী।’

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ফেরদৌস আলম আখঞ্জি বলেন, ‘সামনে ঈদের আনন্দ ভুলে হাওরবাসীরা এখন জীবন কীভাবে বাঁচাবে সেই চিন্তায় আছে। পরপর দু-বছর বোরো ধান হারানো কৃষক পরিবারের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। না হলে এই অসহায় হাওরবাসীর জীবনে প্রতি বছরেই ঈদের আনন্দের পরিবর্তে দুঃখের শেষ থাকবে না।’

সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহববুর রহমান জানান, জেলার বন্যা দুর্গত এলাকাগুলোতে ৬৩৭ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ ৯০ হাজার টাকা বিতরণ করা হচ্ছে। গৃহনির্মাণের সহায়তা হিসেবে ৯৬১ বান্ডিল টিন ও ২৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তাও বিতরণ করা হবে। সরকাবিভাবে বন্যা দুর্গত পরিবারকে সহায়তার কোনো কমতি নেই।

 

 

(আজকের সিলেট/৩ সেপ্টেম্বর/ডি/এসসি/ঘ.)

শেয়ার করুন