১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭


হুমকির মুখে হাকালুকি হাওড়পাড়ের শিক্ষার্থীদের জীবন

শেয়ার করুন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের বড়লেখায় অবস্থিত এশিয়ার বৃহত্তম হাওড় হাকালুকিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হলেও মূলত মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণেই এবার হুমকির মুখে পড়েছে এ জেলার শিক্ষার্থীদের জীবন। বিষয়টি এখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিভাবকদেরও।

বিশেষ করে কৃষক ও জেলে পরিবারগুলো যেখানে দু’বেলা দু-মুঠো ভাত জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। সেই পরিবারগুলো একমাত্র সম্পদ এক ফসলি বোরো ধান হারিয়ে আর জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন মাছ না পেয়ে তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা জীবনের আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অসময়ে জীবন বাঁচার একমাত্র সম্পদ বোরো ধান, হাওড়ের মাছ ও গৃহপালিত পশু বিক্রি করে দেয়ায় কৃষক ও জেলে পরিবারগুলোতে হাহাকার বিরাজ করছে। সেই শোক কাটতে না কাটতেই এখন হাওড় পাড়ের অসহায় মানুষগুলো একের পর এক দুর্যোগপূর্ণ বাস্তবতার কারণে ছেলেমেয়েদের শিক্ষাজীবন নিয়ে আছেন দুশ্চিন্তায়।

হাওড় পাড়ের কৃষক পরিবারের ছেলেমেয়েদের শিক্ষাজীবন এখন হুমকির মুখে পড়েছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বিতরণ করলেও শিক্ষাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসপত্রের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। আর পরিবারের বর্তমান অসহায়ত্বের চিত্র দেখে অনেক শিক্ষার্থী চোখে-মুখে যেনো অন্ধকার দেখছে। অনেকেই নিজের জীবনের কথা না ভেবে পরিবারের কথা মাথায় রেখে ছেড়ে দিচ্ছে শিক্ষাজীবন। যোগ দিচ্ছে বিভিন্ন কাজে না হয় চলে যাচ্ছে অন্যত্র জীবিকার তাগিদে।

সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলায় প্রাথমিক স্কুল ২৫৯৫টি, মাধ্যমিক স্কুল ১৭৩টি, মাদরাসা ৭১টি ও ২৪টি কলেজ রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা দেড় লাখেরও অধিক। এর মধ্যে জেলার বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ এই ৫ উপজেলার নিয়ে বিস্তৃত হাওড় পাড়ে শিক্ষার্থী রয়েছে অর্ধলক্ষাধিক। জেলায় হাওড় পাড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে ১০ হাজার শিক্ষার্থী। তাদের খরচ ও পরিবারের চাহিদা কিভাবে মিটাবে তা নিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়তই সময় পার করছেন অভিভাবকরা। এসব শিক্ষার্থীর পরিবার নির্ভরশীল ছিল বোরো ধান আর চাষের মাছের ওপর।

সূত্র আরো জানায়, গত এপ্রিল মাসের অকাল বন্যায় হাকালুকি হাওড়ের তলানো ধান পচে বিষক্রিয়ায় পানিতে অক্সিজেন কমে যায়। এতে প্রচুর মাছ মারা যায়। মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, হাকালুকি হাওড়ে আনুমানিক ৩০ মেট্রিক টন মাছ মারা গেছে এবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগে।

সরেজমিনে গেলে কথা হয় কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওড় পাড়ের ভুকশিমইল ইউনিয়নের বরদল এলাকার বাসিন্দা নিপুল আলী জানান, তার পরিবারের ৬জন সদস্য। মাছ ধরেই উপার্জন হয় পরিবারের খরচ। ছোট মেয়েকে প্রায় ২ মাস যাবৎ স্কুলে পাঠেতে পারছেন না, সামনে জে এস সি পরীক্ষা। সব মিলিয়ে দিক হারিয়ে বসেছেন তিনি। এই বরদল গ্রামেই অন্তত ৩০০ কার্ডধারী মৎস্যজীবী আছেন। মাছের আকাল হওয়ায় অধিকাংশ মৎস্যজীবীর ঘরেই চলছে অভাব-অনটন।

মৎস্যজীবি পরিবারের সন্তান বাবুল দাস এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। বাবুল জানায়, ‘বাবা গেছইন মাছ ধরতে। কিন্তু মাছ ধরি পেটই দিতা পাররা না, এখন পড়ার খরছ কিলা দিবা। পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল। কেমনে পড়তাম। টাকা কই পাইতাম।’ অভাবের সংসারে পড়াশুনা বন্ধের উপক্রম তার।

স্থানীয়রা মনে করেন, স্থানীয় কৃষক ও জেলে পরিবারগুলোকে এবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই সব পরিবারে এখন হাহাকার চলছে। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে হাওড় পাড়ের শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ঝরে পড়বে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার না দাঁড়ালে আগামীতে বোরো ধান চাষাবাদ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন তারা। বোরো ধান উৎপাদনে অন্যতম সমৃদ্ধ হাকালুকি হাওড়ের কৃষকরা বোরো ধান উৎপাদন বন্ধ হলে ফলে শূন্য হয়ে যাবে হাওড়।

হাওড় পাড়ের অভিভাবকেরা জানান, সরকার যদি হাওড় পাড়ের সন্তানদের এবার লেখাপড়া করার সুযোগ-সুবিধা না দেন তাহলে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ, এবার তাদের একমাত্র সম্পদ বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। নিজেরা কি খেয়ে বাঁচবেন তা নিয়েই দুশ্চিন্তা তাদের। জীবন বাঁচলে তবেই না পড়াশুনো হবে বলে মন্তব্য করেন অভিভাবকরা।

মৌলভীবাজার জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সৈয়দ মো. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, আগামী ফসল না ওঠা পর্যন্ত হাওড় পাড়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওই সব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সব শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ইতিমধ্যেই আবেদন পাঠানো হয়েছে।

বড়লেখা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, এবার হাওড় সম্পূর্ণ পানিতে ডুবে যাওয়ায় ‍দিশেহারা কৃষকেরা। এখন হাওড় পাড়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। ত্রাণ চাহিদা অনুযায়ী আরো বাড়ানো প্রয়োজন। তা না হলে টাকার অভাবে শিক্ষার্থীরাও লেখাপড়া ছেড়ে বিভিন্ন কাজে যোগ দেবে, না হয় শহরে চলে যাবে জীবন বাঁচানোর তাগিদে। এতে করে ঝরে পড়বে হাজারো শিক্ষার্থী।

 

(আজকের সিলেট/১৩ সেপ্টেম্বর/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন