২৮ অক্টোবর ২০১৭


সিলেটে হারিয়ে গেছে পালের নৌকা

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিনিধি : পাল তোলা ওই নায়ের মাঝি/ভাটিয়ালি গায়/ঘোমটা পরা গাঁয়ের বধূ /শ্বশুরবাড়ি যায়। ও মাঝি ভাই ও মাঝি ভাই/কোন সে গাঁয়ে যাও/চলন বিলে মামার বাড়ি/আমায় নিয়ে যাও। গাঁয়ের বধূর এমন আকুতি হারিয়ে গেছে। নদী-বিলে নেই আর সেই মাঝি ভাইয়ের পালতোলা নৌকা। আছে শুধু সোনাঝরা দিনের স্মৃতি নিয়ে ছড়া-কবিতা। এছাড়া -ও মাঝি, নাও ছাইরা দে, ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, গানটি এখনো গ্রাম বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়।

আধুনিক সভ্যতার যুগে যান্ত্রিক যানবাহনের ভারে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক পালতোলা নৌকা হারিয়ে গিয়েছে। হাতেগোনা দু’য়েকটা চোখে পড়লেও তাদের নৌকায় আগের মতো আর মানুষ ওঠেন না। নদ-নদী, খাল-বিল পরিবেষ্টিত সিলেট অঞ্চলে এক সময় পাল তোলা নৌকার ব্যাপক কদর থাকলে এখন আর নেই। যান্ত্রিক সভ্যতা প্রসারে পানিতেও লেগেছে পরির্বতনের হাওয়া। শুনশান নদী বা হাওরগুলোতে ভটভট আওয়াজ করে প্রচন্ড ঢেউ তুলে এখন সিলেট অঞ্চলের শতকরা ৮০ ভাগই চলাচল করছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। ইঞ্জিনচালিত নৌকার বিকট আওয়াজে নদীর দু’পারের বাসিন্দারা শিকার হচ্ছেন শব্দদূষণের। অন্যদিকে ইঞ্জিনচালিত নৌকার সৃষ্ট ঢেউয়ের আঘাতে নদীর দু’পারের ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে।

কয়েক বছর আগেও সিলেট অঞ্চলের নদ-নদী, খাল-বিলে চলত নানা রকমের পালতোলা নৌকা। নৌকাগুলোর নামও ছিল বেশ চমৎকার। যেমন- কোষা, ডিঙি, পানশি, ময়ূরপঙ্খী, সাম্পান, ছিপ, বজরা, বলাম, কাথালি, পাতাম ইত্যাদি। এসব নৌকার কোনোটি যাত্রী পারাপারে কোনোটি মালামাল বহনের আবার কোনোটি জেলেদের মাছ শিকারের কাজে ব্যবহৃত হতো। বিভিন্ন ধরনের নৌকার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল পালতোলা নৌকার।

যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়ায় বর্তমানে পালতোলা নৌকার স্থান দখল করে নিয়েছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। এর ফলে এখন আর নদ-নদীর বুকে ধীরে ধীরে বহমান পালতোলা নৌকা মাঝি-মাল্লার দাঁড়টানা ও ঢেউয়ের তালে তালে ভাটিয়ালি ও সারিগান এসব চিরচেনা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। মানুষের দৃষ্টি আর্কষণের জন্য রং বেরঙ্গের কাপড় জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা হতো রঙিন পাল। তবে নৌকার পাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন বাতাস প্রবাহের ধরন নৌপথ ও নদী কাঠামো অন্যতম।

পাল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, নৌকার মর্যাদা প্রকাশে পাল সহায়ক ভূমিকা রাখতো। বর্তমানে যান্ত্রিক সভ্যতায় পৃষ্ঠতায় পাল তোলা নৌকা চালিয়ে সংসার না চলায় পেশাদার মাঝিরা নৌকা চালানোর পেশা ছেড়ে দিয়ে নানা পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। অনাহারে, অর্ধাহারে বেঁচে আছেন এসব মাঝিরা। তবে এখনো বালাগঞ্জ ওসমানীনগর কোনো কোনো এলাকায় অনেক মাঝি নৌকা আর বৈঠা নিয়ে জীবনসংগ্রাম করে যেতে দেখা যায়।

বালাগঞ্জের ও ওসমানীনগরের হাওর এলাকার একাধিক পালের নৌকার মাঝিরা বলেন, ‘এই নাও বাওয়া ছাড়া আমাগো আর অন্য কোন কাম নাই। তার লাইগা বছরে যে কয় মাস নদীতে পানি থাকে সে কয়মাস নাও চালাই। বাকি মাসগুলো কাম ছাড়া থাহন লাগে। এখনো নাও চালাইয়া খুব কষ্টে চলি। আগের মতো মানুষ পাওয়া যায় না। মানুষ ইঞ্জিন নৌকায় যায়। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার সঙ্গে টিকতে পারছি না আমরা পালতোলা নৌকার মাঝিরা।’ তাদের ভাষায় অতীত ঐতিহ্যের পাল তোলা নৌকা নতুন প্রজন্ম হয়তো একদিন দেখবে জাদুঘর কিংবা ছবিতে।

 

(আজকের সিলেট/২৮ অক্টোবর/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন