২ নভেম্বর ২০১৭


বিলুপ্ত হলেও ‘বোল’ পাল্টেনি ছাত্রলীগে

শেয়ার করুন

দেবব্রত রায় দিপন : কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে একাধিকবার। পরবর্তীতে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে আবারো গঠন করা হয় নতুন কমিটি। তবুও চারিত্রিক উন্নয়নের পরিবর্তন ঘটে না দলীয় নেতাদের। এভাবেই পরিবর্তনহীন সংস্কৃতির ছোঁয়ায় অকালেই প্রাণ যায় দলীয় কর্মীদের। ক্ষমতার পালা বদলের পর থেকেই সিলেটের ছাত্ররাজনীতির এমনতর রূপ বরাবরই স্পষ্ট হয়ে উঠে। অভিযোগের এ সংস্কৃতি চালু রয়েছে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের উপর।

ক্ষমতার স্বাদ পেলেই তাদের তা-বযজ্ঞে ভয়ে আতঙ্কে থাকে নগরবাসী। শুধুমাত্র হীন স্বার্থে ব্যবহারের কারণেই ছাত্রসংগঠনগুলো প্রতিদিনই আরো বেশি মারমুখী চেহারায় আবির্ভূত হচ্ছে। আর ক্ষমতার স্বাদ না পেলেও ভয়ংকর শিবির চক্রের হাতে জাসদ ছাত্রলীগের ৩ নেতার নৃশংস হত্যাকা-ে এখনো গা শিউরে উঠেন অনেকেই। খুনের এই ধারাবহিকতা কিছুতেই যেনো থামানো যাচ্ছে না।

সিলেটে ক্রমেই বাড়ছে নিজ সংগঠনের হাতে দলীয় নেতাকর্মী খুন। বিশেষ করে চলতি বছরে নিজ দলের হাতে খুন হয় ছাত্রলীগের ৩ কর্মী। তারপর থেকেই শুরু হয় নতুন করে উৎকণ্ঠা। খুনের অভিযোগে ছাত্রলীগের জেলা কমিটি বাতিল করা হয়েছে যথারীতি। তবুও পিছু ছাড়েনি শঙ্কা। অজানা আতংকে বুক কাঁপছে অভিভাবকদের। তাদের বক্তব্য- এর আগেও একই অপরাধে বিগত কমিটিগুলো বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু দমে থাকেনি খুনের রাজনীতি। নেতাদের গ্রুপিং কোন্দলে সৃষ্টি হয় গ্রুপ। গ্রুপ থেকে একাধিক গ্রুপ।

গ্রুপের দ্ধন্দ্বে রূপ নেয় আরো উপ-গ্রুপের। পর্যায়ক্রমে গ্রুপিং কোন্দলে অনিবার্য হয়ে উঠে ভয়াবহ সংঘাত। যার মাশুল হিসেবে প্রাণ গুনতে হয় মেধাবী শিক্ষার্থীদের।

খুনের অভিযোগে গত ১৮ অক্টোবর বাতিল করা হয় জেলা ছাত্রলীগের কমিটি। বিষয়টি তদন্তে গঠন করা হয়েছে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। পরে গত ২৩ অক্টোবর থেকে কেন্দ্রের নির্দেশে পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয় সিভি। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত পদপ্রত্যাশীদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দুই শতাধিক।

বিষয়টি অনেকটা আতংকেরও বটে। আরো প্রশ্ন পুনর্বার কেন্দ্র থেকে কমিটি আসলেই কি থেমে যাবে সংঘাত? সিলেটে ছাত্র রাজনীতির বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে গত এক সপ্তাহে কথা হয় নগরীর ১১ টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রায় সাড়ে তিনশ শিক্ষার্থীর সাথে। কথা বলে পাওয়া গেছে নতুন তথ্য। সাথে সুর মিলিয়েছেন অনেক অভিভাবকও। কেউ কেউ এ বিষয়ে ঘৃণায় কথা বলাও এড়িয়ে গেছেন। পরিবর্তনের হালে পানি লাগাতে অনেকেই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন বিষয়টি।

মাত্র ৬ বছরের মাথায় ৩ বার কমিটি বাতিল হয়েছে ছাত্রলীগের। ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এমন বিরল ঘটনা ঘটলেও এ নিয়ে মাথাব্যাথা নেই কারো। এ অবস্থায় নোংড়া পরিবেশে যুক্ত হচ্ছে না মেধাবী তরুণরা। দলীয় ছাত্ররাজনীতির সার্বিক পরিস্থিতি যেখানে উন্নতি হওয়ার কথা, সেখানে বারবারই একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বারবার। পুরো বিষয়টির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক নানা তথ্য।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, জেলায় দলীয় সর্বোচ্চ পদ পেতে শুরু থেকেই ওৎ পেতে থাকেন দলীয় কর্মীরা। নেতৃত্বের এই আকাক্সক্ষা থেকেই দলীয় অভিভাবক সংগঠনের নেতাদের সাথে শুরু থেকেই তাদের ভাব জমে উঠে। পরবর্তীতে শো-ডাউনসহ তাদের সভা সমিতিতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। অভিভাবক সংগঠনের ঐ নেতার আশির্বাদপুষ্ট হয়েই নির্ধারিত ছাত্র নেতাদের বলয় তৈরী হতে থাকে ছাত্ররাজনীতিতে। একসময় নিজের অবস্থান জানান দিতে ঐ ছাত্রনেতারা বিভিন্নভাবে অস্ত্র মহড়ায় নিজেদের উপস্থিতি জানান দেন। আর তখন থেকেই শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। সবার দৃষ্টিতে রাতারাতি আবির্ভাব ঘটে অস্ত্রমহড়া কিংবা কর্মী খুন করা ঐ ছাত্রনেতার প্রতি।

অভিভাবক সংগঠনের নেতাদের কাছে তখন কদরও বেড়ে যায় দ্রুত। জেলার দলীয় সর্বোচ্চ পদে তখন অনেকটাই নিশ্চিতভাবেই অভিষেক ঘটে মহড়া দেওয়া দাগী ছাত্রনেতাদের। বিগত দিনে এভাবেই খুনী ও দাগী অপরাধীদের পুরুস্কৃত করার মাধ্যমে সিলেটের রাজপথ একাধিকবার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। শুধু এখানেই শেষ নয়, পদ পেতে ঢালতে হয়েছে কাড়ি কাড়ি টাকা। স্থানীয় অভিভাবক সংগঠনের নেতা থেকে কেন্দ্রীয় নেতা এবং সবশেষ ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের ভাগ প্রদান করেই নিশ্চিত করতে হয় লোভনীয় পদের।

সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এমবিএর ছাত্র ইমন বিশ্বাসের মতে, “সরকারি কর্মচারীদের মতো যদি ছাত্রনেতাদের পদ পেতেও নগদ গুনতে হয়, তবে অবশ্যই সেই ছাত্রনেতার মাধ্যমে ছাত্রদের কোন কল্যাণ সাধিত হবে না।”

ইমনের যুক্তিতে সুর মিলিয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনিকা বলেন, “শুরু থেকেই টাকার মাধ্যমে পদপ্রাপ্ত নেতার প্রত্যাশাই থাকবে- সরকারের সময়কালীন যেকোন ভাবেই নিজের টাকাগুলো রাতারাতি তুলে ফেলে নিজেকে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট করা। ফলে ক্যাম্পাসের পরিবর্তে ঐসব ছাত্রনেতারা শুরু থেকেই টেন্ডার, দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অরাজক কাজে নিজেদের জড়িয়ে রাখে।”

লিডিং ইউনিভার্সিটির বিবিএর ছাত্র জালাল ছাত্ররাজনীতি নিয়ে কথা বলতে নারাজ। অবশ্য, খুনের বদলে ছাত্ররাজনীতিতে সুবাতাস প্রবাহিত হোক-এমন প্রত্যাশা রয়েছে তার।

মদন মোহন কলেজের সুলতানা মনে করেন, ছাত্ররাজনীতি হবে ছাত্রদের অধিকার আদায়ে। সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত, ভর্তি পরীক্ষায় বৈষম্য, বেতনবৃদ্ধি, ক্ষেত্র বিশেষ শিক্ষকদের স্বেচ্চাচারিতা ইত্যাদি বিষয়ে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে ছাত্রদের।

তিনি বলেন, এই কলেজে ভর্তির ৩ বছর অতিবাহিত হলেও এ বিষয়ে ছাত্র সংগঠনের কোনও আন্দোলন চোখে পড়েনি।

সভাপতি ‘তেলিহাওর’ গ্রুপের হলে সাধারণ সম্পাদক ‘টিলাগড়’ গ্রুপের। অথবা টিলাগড় গ্রুপের সভাপতি হলে ‘তেলিহাওর’ গ্রুপের হন সাধারণ সম্পাদক। গত প্রায় দেড় দশক ধরে এভাবেই চলছে সিলেট জেলা ছাত্রলীগ।

সমীরন পুকায়স্থ নামের একজন রাজনীতি সচেতন অভিভাবক বলেন, বিষয়টি শোনার সাথে সাথে একরাশ ঘৃণা এসে বুকে ভর করে। ছাত্রাবস্থাতে আমরাও রাজনীতি করেছি।

তিনি বলেন, ছাত্র রাজনীতি শুধু ছাত্রদের সমস্যায় নয়, সাধারণ মানুষেরও অনেক দুর্ভোগের সমাধান ঘটিয়েছে। তখন ছাত্রদের সবাই সমীহ করতো। আফসোস করে তিনি বলেন, আজ ছাত্রনেতা নাম শুনলেই কি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর সব কিছুতেই যেনো একটা তা-বচিত্র ভেসে ওঠে। এর মধ্যে সিলেটে রয়েছে ছাত্রলীগের চার গ্রুপ। এমনটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে এমসি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র সুমন আহমদের প্রতিক্রিয়া আসে ভিন্নভাবে।

খেদোক্তি প্রকাশ করে সুমন বলেন, “এর জন্য শুধু ছাত্রলীগকে দায়ী করা যুক্তিযুক্ত নয়। অভিভাবক সংগঠনের নেতা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শুনেছি বিগত কমিটি ১৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে রফা-দফা করেছেন। টাকার রফাদফার মাধমে মূলত ঐ নেতারাই পদপ্রাপ্ত ছাত্রনেতার চরিত্র হননের সুযোগ নিয়েছেন। এভাবেই শুরুর দিকের দুর্নীতির সংক্রামক ক্রমেই ধ্বংশের দিকে ফেলে দেয়।”

তার কথায় সায় দেয় একই কলেজের বাংলার ছাত্রী সানজিদা আক্তার। অনেকটা বিষাদের সূরে সানজিদা বলেন, মূল নেতাদের চরিত্র ঠিক হলে ছাত্ররাজনীতিও হবে পরিচ্ছন্ন।

শাবিপ্রবি’র ইতিহাস বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র অনিকের মতে, কখনো চাঁদাবাজি কিংবা অপহরণ মামলায় কোনও ছাত্রনেতাকে আটক করা হলে, সাথে সাথেই তাদের রাজনৈতিক গডফাদাররা স্থানীয় থানায় ফোন করে নিজেদের জিম্মায় অপরাধীদের বের করে নেয়। এভাবে খারাপ কাজে তাদের উৎসাহ যুগিয়েই আজ রাজনীতির বারোটা বাজানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাবির আরেক ছাত্র জানান, আসলে ছাত্ররাজনীতে করতে হলে সেই সম্পর্কে ছাত্রদের সম্যক ধারণা থাকা দরকার। বর্তমান প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ছাত্রদের জন্য নেই সহায়ক কর্মসূচি, সেমিনার, প্রশিক্ষণ কিংবা শিক্ষা শিবির। রাজনৈতিকভাবে জ্ঞানহীন থাকলে সেই মুর্খদের কাছ থেকে ভালো আশা করাটাই পাগলামি মাত্র।

জেলার বারবার কমিটি বিলুপ্ত এবং পুনর্গঠন বিষয়ে এক সময়ের তুখোর ছাত্রনেতা, পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ ও ছাত্রলীগের সাবেক জেলা সেক্রেটারি, বর্তমানে মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, “এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ, ছাত্ররাজনীতি হবে ক্যাম্পাস নির্ভর। লেজুড়বৃত্তিতে আটকা পড়লে তার ফলাফল দাঁড়াবে ভয়াবহ। কিন্তু রাজনীতি ক্যাম্পাস নির্ভর থাকলে, ছাত্রদের আচরণও শিষ্টাচার ক্যাম্পাসেই ফোটে ওঠে। ফলে, আচরণগত বৈশিষ্টের কারণেই ছাত্ররাজনীতি হয়ে উঠবে মেধা নির্ভর।”

তিনি বলেন, “এখন ছাত্ররাজনীতি পাড়া-মহল্লা ও চায়ের দোকানে। সাথে যুক্ত থাকে কিছু ছিটকে ছিনতাইকারী। তবে, ক্যাম্পাস নির্ভর হলে ছাত্ররাজনীতিতে অযোগ্যদের অনুপ্রবেশ ঘটতো না।”

তিনি দুঃখ করে বলেন, “যে রাজনীতির দীক্ষা দিয়ে আজন্ম থেকে লড়ে যাচ্ছি, সেই দলের ছাত্রসংগঠনের বর্তমান বেহাল দৃশ্যে হৃদয়ে ক্ষরণ সৃষ্টি হয়।”

তিনি একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি না ঘটাতে কোন রকম স্বজনপ্রীতির আশ্রয়ে যুক্ত না থাকার জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

 

(আজকের সিলেট/২ নভেম্বর/ডি/এসসি/ঘ.)

শেয়ার করুন