১২ নভেম্বর ২০১৭


তত্ত্বীয় জ্ঞান, শূন্য সাংবাদিকতা!

শেয়ার করুন

সাইদুর রহমান : বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতাদের তত্ত্বীয় জ্ঞান বা তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত গণমাধ্যমের সংবাদদাতাদের নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা করেন ভিসি সাংবাদিকতা। বলা হচ্ছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতারা ক্লাস করেন না বা কম ক্লাস করেন। ফলে ক্লাসের কেতাবি/তত্ত্বীয় জ্ঞানও তাদের স্পর্শ করতে ব্যর্থ।’ অনেকেই আবার বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতাদের গালমন্দও করছেন। তারা মেধাহীন। নৈতিকতা বলে তাদের মধ্যে কিছুই নেই। অনেকেই অনেক কথা বা মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতাদের নিয়ে।

যারা ইতোপূর্বে বা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ছিলেন বা আছেন, আমরা কেউ আপনাদের মন্তব্যে গোস্বা হচ্ছি না। গোস্বা করার মতো কিছুই করিনি আমরা। আমরা ক্লাস ফাঁকি দিয়েছি, ভিসির সামনে বসে তেল মেরেছি। দিনের পর দিন আমরা এই ঘৃণিত কাজটি করে এসেছি। আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা কোনো ধরনের উপদেশ না দিয়ে সরল মনে তা সমর্থন দিয়ে গেছেন। হঠাৎ এত দিন পর আমাদের খারাপ কাজের বিষয়ে মুখ খুলেছেন শ্রদ্ধার পাত্ররা। বিলম্বে হলেও মহান পেশার মহান ব্যক্তিদের ধন্যবাদ।

আমার ছয় বছরের (২০০৬-১১) বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিদের সবাই যে ভালো বা খারাপ তা ঠিক নয়। সব পেশায় খারাপ বা ভালো মানুষের অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। শিক্ষকদের মাঝেও যেমন আছে, তেমনি আমাদের মাঝেও। একজন শিক্ষক খারাপ হলে কি বলব শিক্ষকরা খারাপ, তেমনি একজন বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা খারাপ হলে কি বলব সবাই খারাপ, নিশ্চয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদদাতারা ভিসি সাংবাদিকতা করেন- এক বাক্যে এই কথাটি বলা কতটুকু সমীচীন তা ভেবে দেখার বিষয়।

গুণীজনদের একটু মনে করিয়ে দিতে চাই, আপনাদের নিশ্চয় ২০০৭ সালের ঘটনাবহুল আগস্ট মাসের কথা মনে আছে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতারা ঝুঁকি নিয়ে আপনাদের পক্ষে কলম ধরেছিলেন। সম্মানিত শিক্ষকদের গ্রেপ্তারের পর বড় প্রতিবাদ আমাদের কলম থেকে এসেছিল। ২০০২ সালে শামসুন্নাহার হলের ঘটনায় আমাদের ভূমিকা নিশ্চয় অস্বীকার করবেন না। তৎকালীন ভিসির বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন কারা? আমরাই। ২০০৯ সাল থেকে বিগত নয় বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবীদের বাদ দিয়ে কম মেধাবীদের নিয়োগের বিরুদ্ধে আপনারা কথা না বললেও আমাদের কলম কথা বলেছে। ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভুয়া ছাত্র শনাক্ত অভিযান শুরু করেছিলাম আমরাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন কলম হাতে অবিরাম লিখে গেছি আমরাই। সফলও হয়েছি। ছাত্ররাজনীতির অসঙ্গতি তুলে ধরেছি আমরাই। আপনাদের আবাসন সংকট, ক্লাস রুম সংকট, গবেষণায় সামান্য বরাদ্দ- এসব নিয়ে লিখে আপনাদের অসংখ্য বাহবাহ পেয়েছি আমরা। মাঝে শিক্ষকদের যৌন নির্যাতন, অযোগ্যদের নিয়োগ, নিজেদের মধ্যে গন্ডগোল, নম্বরপত্রে ঘষামাজা, ক্লাস ফাঁকি, অসুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা, রাজনৈতিক মঞ্চে বক্তৃতাবাজির খবর লিখে বিরাগভাজন হয়েছি আমরা। এখনো হচ্ছি।

এবার আসি ক্লাস ফাঁকি বা ক্লাসের কেতাবি/তত্ত্বীয় জ্ঞান স্পর্শ না করা প্রসঙ্গে। আমরা সত্যি কি ক্লাস ফাঁকি দেই? আমাদের কি কোনো তত্ত্বীয় জ্ঞান নেই, আমরা এতই অধম, কিছুই শিখলাম না? ধরলাম সবই সত্যি, তাহলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতাদের অনেকেই আপনাদের সহকর্মী হলেন কীভাবে? একটু বলি, আপনারা স্মরণ করলে মনে পড়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শামীম মাহমুদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন শেখ আদনান ফাহাদ ও রাকিব আহমদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইব্রাহিম বিন হারুন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মদ জাকারিয়া, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহাবুল হক সাবু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারও বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ছিলেন। বিদেশি জীবন ত্যাগ করে নোয়াখালীতে সায়েন্স অ্যান্ড কমার্স স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ড. আফতাব উদ্দিন মানিক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নির্বাহী পরিচালক ও স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মির্জা তারিকুল কাদেরও সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ছিলেন। আপনাদের ভাষায়, জানি না ওনারা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তত্ত্বীয় জ্ঞান ছাড়া কীভাবে শিক্ষক হলেন।

আর একটু বলি, বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতাদের মধ্য থেকে সচিব হয়েছেন শফিক আল মেহেদী, কবি ও সাহিত্যিক হাসান হাফিজ, বর্তমানে যুগ্ম সচিব মশিউর রহমান, হারুন অর রশিদ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক ইলিয়াস খান, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায়, সম-পদমর্যাদার নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মামুনুর রশিদ, আশরাফুল আলম খোকন, ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের জনসংযোগ শাখার উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম পান্না, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল কবীর ভুইয়া, জেলা খাদ্য কর্মকর্তা কাজী সাইফুদ্দীন অভি, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান, নির্বাচন কর্মকর্তা বেলাল হোসেন, বিসিএস ক্যাডার শিক্ষা আসাদুজ্জামান সাগর, ব্যাংকার বিপ্লব, গবেষক হয়েছেন নিটোল।

স্কলারশিপ নিয়ে আপনাদের মতো আমরাও আমেরিকাতে পড়াশোনা করছি। কে জানেন সে-জাহেদুর রহমান আরমান। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সে আজ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। আরো বলি, স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকাতে আরো আছেন শাহাজান শুভ, জামালউদ্দিন জামি, দাউদ মোহাম্মদ ইসা, আরিফুল ইসলাম, দিদারুল ইসলাম মানিক, খায়রুল, অস্ট্রিয়ায় দোদল, ফ্রান্সে মোবারক। লন্ডনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কর্মরত আছেন মাহাবুবুর রহমান ও জামার্নিতে রিয়াজউদ্দিন রিয়াজ। পিআইবির মহাপরিচালকও হয়েছি আমরা। তিনি ড. আব্দুল হাই সিদ্দিক।

সাংবাদিকতার কথা যদি বলি তবে শেষ করতে পারব না। তবু বলে রাখি এনটিভির খায়রুল আনোয়ার মুকুল, মাছরাঙা টিভির রেজোয়ানুল হক রাজা, একাত্তরের সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, বাংলা ভিশনের মোস্তফা ফিরোজ দিপু, এশিয়ান টিভির মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, ডেইলি স্টারের রেজাউল করিম লোটাস, বাংলা নিউজের এডিটর ইন চিফ আলমগীর হোসেন, প্রথম আলোর শরীফুজ্জামান পিন্টু- এই রকম অসংখ্য বড় ভাই আজ আমাদের গর্ব-অহংকার। ওনারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ছিলেন। আরো অনেকই আছেন বিভিন্ন পেশায়। নানা ক্ষেত্রে ওনারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত।

আর আমরা যারা একেবারে অধম তারা পড়ে আছি সাংবাদিকতায়। গালমন্দ আর তিরস্কার এখন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের পাঁচটি বছরে ক্লাস ফাঁকি কম দিয়েছি। ক্লাস কম করার কারণে পরীক্ষা দিতে বাধার সম্মুখীন হওয়ার কথা, তাও হয়নি। ক্লাস বেশি করেছি বলে মাস্টার্সের ভাইভায় সর্বনিম্ন নম্বরও পেয়েছি। এরপরও জানি না কেন আমরা অধম, কেন ক্লাস কম করেছি, কেন তত্ত্বীয় জ্ঞান স্পর্শ করেনি।

তবে এসব কথা আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার আগে আমার বন্ধু রিয়াদুল করিমের একটি ফেসবুক পোস্টের কথা মনে পড়ে গেল। রিয়াদ লিখেছে- ‘শিক্ষকেরা একটু মারামারি করেছে, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা নিউজ করার কী আছে? মারামারি হবে, প্রশ্ন ফাঁস হবে- এগুলো তোমরা লেখবা কেন? সাংবাদিকতার এথিক্স জানো? কেমনে জানবা ক্লাস তো করো না! তোমরা সাংবাদিকতা জানলে এসব লিখতা না বরং প্রশাসনকে আগে জানাতা। আফসোস! তোমরা মোটেও শিক্ষা নাওনি!’

অনেক লিখেছি আর কিছুই লিখব না, কেননা আমি তো ক্লাস কম করেছি। আমার তো ক্লাসের কেতাবি/ তত্ত্বীয় জ্ঞান স্পর্শ করেনি। আমি তো সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা।

 

(লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ইত্তেফাকের সাংবাদিক।)

শেয়ার করুন