২৭ নভেম্বর ২০১৭


দিরাই-শাল্লায় বীজ সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ

শেয়ার করুন

দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লায় ফসলহারা কৃষকদের কৃষি সহায়তা পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ধান বীজ ও সার বিতরণে নানা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও নগদ টাকা হাতিয়ে নেয়ার লিখিত এবং অলিখিত বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ২১ নভেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবরে শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউপি’র প্রতাপপুর গ্রামের ৬০জন কৃষক স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। তাছাড়া দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকটও একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

গত তিন/চার দিন সরেজমিনে স্থানীয় কৃষকদের সাথে আলাপ কালে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে এসব অনিয়ম ও নগদ টাকা নেয়া হয়েছে বলে হাওর পাড়ের কৃষকরা অভিযোগ করেন। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় টাকার বিনিময়ে একই পরিবারে একাধিক কার্ড, মৃত ব্যক্তির নামে এবং একই দম্পতির নামে আলাদা আলাদা কৃষি কার্ড অন্তর্ভূক্তির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবার সরকারের কৃষি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অন্যদিকে বোরো বীজ বপনের সময় অনেকটা পেরিয়ে গেলেও উপজেলা কৃষি অফিসের তালিকা প্রস্তুতের কাজে মন্থরগতি, বীজ ও সার বিতরণে বিলম্বের কারণে সরকারের কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান হাওরপারের কৃষকরা।

অভিযোগগুলি আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

দিরাই ও শাল্লা উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, সরকার এবছর দিরাই উপজেলায় ১টি পৌরসভা ও ৯টি ্ইউনিয়নে মোট ৩৬ হাজার ২ শ ৯১ জন ও শাল্লা উপজেলার ২৪হাজার ৬শ’ ১৫জন কৃষককে কৃষি পুনর্বাসন হিসেবে প্রত্যেককে ৫কেজি ধানবীজ, ৩০ কেজি সার ও নগদ ১হাজার টাকা প্রদান করা হবে। সংশিষ্ট ইউনিয়নের কৃষকের নিকট উপকরন পৌছাতে সরকার মাথাপিছু ১০৫ টাকা পরিবহন খরচ দিচ্ছে। কিন্তু বিতরন কাজে নিয়োজিত জনপ্রতিনিধি ও কৃষি অফিসার অধিকাংশ ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরকে উপজেলা সদর থেকে বীজ সার নিতে বাধ্য করা হয়েছে। কৃষি সহায়তা কার্ড কৃষকের হাতে থাকার পরও তালিকায় নাম না থাকায় উপজেলার বহু কৃষক বিফল মনোরথে বাড়ি ফিরে যান।

লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, উপজেলা কৃষি দপ্তর হতে কৃষি কার্ড দেয়ার পরও তালিকায় তাদের নাম নেই। কৃষক মুখলেছ মিয়া ও মোঃ ইসলাম উদ্দিন বলেন, অন্যান্য বছর এসময় আমাদের বীজ তলায় ধানের চারা ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি লম্বা হয়ে যেতো। এবং অগ্রহায়ন মাসের শেষদিকে আমরা বোরো ধানের চারা লাগানোর কাজ শুরু করতাম। এবার সরকারী বীজ নিয়ে মাঘ মাসে ধান লাগাইতে পারবো কিনা সন্দেহ আছে।

তারা আরো বলেন, গেল অকাল বন্যায় আমরা কৃষির সর্বস্ব হারাইছি, এবার না জানি আর কিতা হারাইমু। সরকারি অফিস থ্যাইক্যা যেভাবে যে পরিমাণে বীজ দিতাছে ইতা আমরার কোনো কামে লাগত না। তাছাড়া এ বীজ নিতে অখন পর্যন্ত ২/৩ বার আইয়া আমরার উল্টা আরো ৩/৪শ’ টেকা খরচ করন লাগতাছে। ক্ষেতের কামের সময়ের কাম করতাম পারতাছিনা।

কৃষক হরিধন দাশ ও কবিন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, কয়েকদিন আইলাম আগের কার্ড লইয়া মেম্বার চেয়ারম্যানের কাছে। এখন বীজ ও সার আনতে গিয়া দেখি তালিকাতে আমরার নাম নাই। তাছাড়াও কৃষি সহায়তা নিতে আসা কৃষাণী শোভা আচার্য্য, কৃষক সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসসহ অনেক কৃষক-কৃষাণীকে সারা দিন অপেক্ষার পর খালি হাতে ফিরে যেতে দেখা যায়।

কৃষাণী শোভা আচার্য্য আরো বলেন, আমি ৫ কপি ছবিসহ ভোটার আইডি ও কৃষি কার্ডের ফটোকপির সাথে নগদ ১শ’ টাকা না দেয়ায় তার নাম তালিকায় নেই।

তিনি আরো বলেন, যারা নগদ টাকা দিয়েছে তাদের নাম ওই তালিকায় রাখা হয়েছে। উপজেলার বহু কৃষক সরকারের কৃষি সহায়তা পাচ্ছেন না এমন অভিযোগ নিত্যদিনই। অভিযোগ রয়েছে দিরাই উপজেলার পশ্চিম এলাকার ইউনিয়নের কৃষকদের নিকট থেকে জন প্রতি নগদ ১৫০-২০০/= টাকা করে অগ্রিম নেয়া হয়েছে। কোন কোন এলাকায় এর চেয়ে বেশি ও নেয়া হয়েছে । ৫-৬ কপি ছবিও ব্যাংক হিসাবের কথা বলে এসব টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউপির দায়িত্ব প্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রথিশ দাশ নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষকদের নিকট থেকে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে এলাকার কৃষকরা জানান।

এ ব্যাপারে দিরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিরুল বাহরাইন বলেন, দিরাই উপজেলায় ১টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়নে মোট ৩৬ হাজার ২ শ ৯১ জন কৃষককে কৃষি সহায়তা দেয়া হচ্ছে। কোন কর্মকর্তা যদি কোন কৃষকের নিকট অগ্রিম টাকা নিয়ে থাকে প্রমানিত হলে তার বিরোদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সকল চেয়ারম্যানদের মতামতের ভিত্তিেিত সার বীজ বিতরন কাজ চলছে।

রফিনগর ইউপি চেয়ারম্যান রেজুয়ান হোসেন কান বলেন, আমার ইউনিয়নে কৃষকরে নিকট থেকে কেউ টাকা নিয়ে থাকলে তা আমি জানি না।

এব্যাপারে বাহাড়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান বিধান চন্দ্র চৌধুরী বলেন, যারা বাকি রয়েছেন তাদের লিস্টে অন্তর্ভূক্তি করার কাজ চলছে। আটগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম আজাদ বলেন কেউ বাদ পড়ার কথা নয়। তালিকা তৈরি করতে কিছু ভুল হয়েছে বলে তিনি জানান।

তিনি আরো বলেন, বীজ বিতরণ করতে আরো দু’সপ্তাহ সময় লাগবে। শাল্লা ইউপি চেয়ারম্যান জামান চৌধুরী বলেন, আমাদের তৈরিকৃত তালিকা ও কৃষি অফিসের তালিকায় গড়মিল দেখা গেছে। তাছাড়া আমরা প্রথমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এ কৃষি সহায়তা প্রতিটি ইউনিয়নে বিতরণ করবো। কিন্তু উপজেলা কৃষি বিভাগ এ সিদ্ধান্ত পাল্টে উপজেলা সদরে ধীর গতিতে এ বীজ ও সার বিতরণ করছে। ফলে কৃষকদের এ ভোগান্তি হচ্ছে।

এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত শাল্লা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্বপন কুমার সাহার মুঠোফোনে কথা বলতে চাইলে তিনি এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

দিরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাঈন উদ্দিন ইকবাল সার বীজ বিতরন ও তালিকা তৈরীতে অনিয়মের একাধিক লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে জানান, দিরাই উপজেলায় সার বীজ বিতরন প্রায় শেষ। লিখিত অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

কৃষি সহায়তা সঠিক সময়ে না পাওয়ায় হাওর পারের কৃষকদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কৃষকরা জানান বীজ বপন মৌসুমের দুই সপ্তাহ পরে বীজ নিয়ে তাদের কোন কাজে আসবে না।

(আজকের সিলেট/২৭ নভেম্বর/ডি/এসসি/ঘ.)

শেয়ার করুন