৮ ডিসেম্বর ২০১৭


বিলুপ্তির পথে মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের স্মৃতি চিহ্ন

শেয়ার করুন

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে সকল বীর সৈনিক মাতৃভূমি রক্ষায় অসামান্য নৈপূন্য প্রদর্শন করেন বুকের রক্ত জড়িয়ে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেন তাদের মধ্যে একজন শহীদ সিরাজুল ইসলাম বীরবিক্রম।

তাহিরপুর উপজেলার যুদ্ধ-কালীন সাব সেক্টর টেকেরঘাট শহীদ সিরাজুল ইসলামের সমাধিস্থলটি আজ অরক্ষিত। মুছে যেতে বসেছে তার একমাত্র স্মৃতি চিহ্নটুকুও। সম্প্রতি তাহিরপুর টেকেরঘাট চুনাপাথর লেককে শহীদ সিরাজ লেকে’র দাবী জানিয়ে আসলেও কেউ বাস্তবে তার সমাধি স্থলটি ঘুরে দেখেননি।

ছাত্রনেতা সিরাজুল ইসলাম ৭ মার্চে বঙ্গুবন্ধুর ভাষণের পর দেশ মাতৃকার টানে বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা থানার ছিলানী গ্রাম হতে কয়েকজন যুবককে সাথে নিয়ে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। ভারত মেঘালয় রাজ্যের বালাট ক্যাম্পে পৌঁছলে সিরাজুল ইসলামকে আসাম রাজ্যের ইকুয়ানে পাঠানো হয় এবং সেখানে তিনি গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে মেজর মীর শওকত আলীর অধীনে যোগ দেন যুদ্ধকালীন ৫নং সাবসেক্টর টেকেরঘাটে। তার দক্ষতার কারণে তিনি একটি কোম্পানীর সহকারী কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন।

রেল যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার পর হানাদার বাহিনীররা তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহুকুমার গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার দিয়েই পাক হানাদের রসদ সিলেট পৌঁছানো হত তাই এই নদী বন্দরকে মুক্ত করার জন্য মিত্রবাহিনীর মেজর বাট ও জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে ৩৬ জন চৌকুস মুক্তিযোদ্ধাাদের নিয়ে গঠন করা হয় একটি এডভান্স পাটি আর এ পার্টিও নেতৃত্ব দেন সাহসী যোদ্ধা সিরাজুল ইসলামকে।

১৯৭১ সালের ৮ আগষ্ট এডভান্স পার্টি সুর্যাস্তের পরপরই শুধু মাত্র ত্রি-নট থ্রি রাইফেল আর গ্রেনেড কমান্ডার সিরাজের নেতৃত্বে ২৫ মাইল উত্তর থেকে এ অভিযান শুরু করে দুটি নৌকায় করে সাচনা পৌঁছে পাক হানাদার বাহিনীর সুরক্ষিত ব্যাংকারে গেরিলা আক্রমন করে। অতর্কতি এ হানায় ব্যাংকারে অবস্থানরত পাক বাহিনীদের মৃত্যু হয় এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পুর্ন ধ্বংস হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম আনন্দে লাফিয়ে উঠে জয়বাংলা শ্লোগান দিতে থাকেন এমন সময় পাক বাহিনীর একটি বুলেট এসে চোখে এসে বিদ্ধ হলে সাথে সাথে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষন পরই তার মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর পর শহীদ সিরাজুল ইসলামকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় টেকেরঘাট সাব সেক্টরে সমাহিত করা হয় । তার পিতা-মাতা সন্তান শোকে কাতর হয়ে এক সময় পরপারে পাড়ি জমান। তার অসমান্য অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার শহীদ সিরাজুল ইসলামকে বীরবিক্রম উপাধিতে ভূষিত করেন।

কিশোরগঞ্জের ছোট একটি গ্রাম ছিলানী থেকে দেশের জন্য প্রাণোৎস্বর্গ কারী মহান দেশপ্রেমিক সিরাজুল ইসলামের ফিরে যাওয়া হলোনা তার ছোট গ্রামের প্রতীক্ষারত মা বাবা ভাই-বোনের কাছে।

শহীদ সিরাজুল ইসলাম মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন পূর্বে ৩০ জুলাই তার বাবাকে লিখেছিলেন শেষ চিঠি- ‘বাবা দোয়া করবেন নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়, মায়ের প্রতি খেয়াল রাখবেন, আমার অনুপস্থিতিতে মাকে কষ্ট দিবেন না বাবা। মৃত্যুর মুখে থেকে যুদ্ধে করছি কখন জানি মৃত্যু হয় জানি না। মৃত্যুর জন্য তবে সব সময়ই প্রস্তুত রয়েছি। কারণ দেশ স্বাধীন না হলে জীবনের কোনো মূল্যই থাকবে না। তাই যুদ্ধকে পাথেও হিসাবে নিলাম আমার রক্তের বিনিময়ে যদি দেশ স্বাধীন হয় কখন দেখবেন লাখ লাখ সন্তানেরা এক পুত্র হারা বাবাকে ডাকবে। সে ডাকে অপেক্ষাই থাকবেন বাবা। আমার কিছু হয়ে গেলে আপনার দুই মেয়েকে পুরুষের মতই শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন।’ আজো তার দু’বোন ভাইয়ের শেষ চিঠিকে বুকে চেপে অশ্রু জড়ায়। আজো এ চিঠি সাব সেক্টরের সহযোদ্ধা রৌজ আলীর নিকট সংরক্ষিত রয়েছে।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা রৌজ আলী বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি মহোদয়ের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন সিরাজ ভাই দেশের জন্য তার অসমান্য ত্যাগ জাতি চিরদিন মনে রাখুক সেটা আমি চাই, কিন্তু দু.খ জনক হলেও সত্য যে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি ধরে রাখতে কোটি টাকা ব্যয়ে স্মৃতি সৌধ নির্মিত হয়েছে অথচ কয়েক হাজার টাকা খরচ করে একজন দেশপ্রেমিকের কবর সংরক্ষণে এগিয়ে আসছে না। সিরাজ ভাইয়ের কবরখানা সংরক্ষণের জন্য বার বার বিভিন্ন মহলে আবেদন করার পরেও কেউ দু’পা এগিয়ে তার সমাধিস্থলটির অবস্থা দেখতে পর্যন্ত আসেন না যা খুবই দু:খজনক।

(আজকের সিলেট/৮ ডিসেম্বর/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন