১৩ জানুয়ারি ২০২২


হারিছ চৌধুরীর মুত্যু নিয়ে ধুম্রজাল

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপোর্ট : গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তিনি ছিলেন দুর্দন্ড প্রভাবশালী নেতা। হাওয়া ভবন ঘণিষ্ট এই নেতা আলোচনায় থাকতেন সবসময়। দল ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আর তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠার পর হঠাৎ করে হাওয়ার পর মতো মিলিয়ে যান তিনি। এরপর থেকে ছিলেন আড়ালে। এবার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফের আলোচনায় উঠে এসেছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী।

একুশ আগস্ট গ্রেণেড হামলা ও জিয়া চ্যারিটাবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হারিছ চৌধুরী যুক্তরাজ্যে পালিয়ে রয়েছেন- এতোদিন এই তথ্যই জানা গিয়েছিলো। তবে মঙ্গলবার জানা গেলো, তিনি মারা গেছেন। তাও তিন মাস আগে। মঙ্গলবার রাতে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর জানান তার চাচাতো ভাই সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও কানাইঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আশিক উদ্দিন চৌধুরী।

তবে হারিছ চৌধুরী কোথায় মারা গেছেন এ নিয়ে ধু¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। আশিক চৌধুরীর ভাষ্যমতে, গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন হারিছ। সেখানেই তার স্ত্রী পুত্র কন্যারা থাকেন।

তবে সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবুল কাহের চৌধুরী শামীম জানান, ঢাকায় মারা গেছেন হারিছ। ঢাকায়ই দাফন করা হয়েছে তাকে।

হারিছ চৌধুরীর স্ত্রী জোসনা আরা চৌধুরী, ছেলে নায়েম শাফি চৌধুরী ও মেয়ে সামিরা তানজিন চৌধুরী বর্তমানে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে বিএনপির অন্য কোনো নেতাও কথা বলতে রাজী হননি। ফলে হারিছ চৌধুরীর মৃত্যু ও দাফনের স্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আবুল কাহের চৌধুরী শামীম বলেন, তিনি দুই তিনমাস আগে ঢাকায় মারা গেছেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়েছে।

হারিছ চৌধুরীর পরিবারের কাছ থেকেই এমন তথ্য জেনেছেন দাবি করে শামীম বলেন, ঢাকার কোন জায়গায় মারা গেছেন তা আমি জানি না। তাছাড়া এসব ব্যাপারে কথা বলাটাও ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে আবুল কাহেরের এমন বক্তব্যকে নাকচ করে দিয়ে হারিছের ভাই আশিক চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, তিনি যুক্তরাজ্যেই মারা গেছেন। ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর আর দেশে আসেননি। তার পরিবারের সব সদস্যরাই সেখানে থাকে।

যদিও বিএনপির সিলেটের আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমিও শুনেছি তিনি ঢাকায় মারা গেছেন। একারণেই হয়তো এতোদিন তার পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। দলের পক্ষ থেকেও কোনো বিবৃতি দেয়া হয়নি। হারিছ চৌধুরী গোপনে দেশেই অবস্থানের তথ্য শুনেছেন বলেও জানিছেন তিনি।

মৃত্যুর খবর এতোদিন গোপন রাখা প্রসঙ্গে বুধবার আশিক উদ্দিন চৌধুরী বলেন, গোপন করা হয়নি। আত্মীয়স্বজন সকলেই জানে। দলের মধ্যে যারা খোঁজখবর নিয়েছেন তাদেরও জানানো হয়েছে। এখন কেউ উনার খোঁজ রাখেন না বলে তার মৃত্যুর খবরও জানতে পারেনি।

তিনি বলেন, ভাইয়ের কথা মনে পড়ায় আমি ফেসবুকে মঙ্গলবার তার ছবি ফেসবুকে দিয়েছিলাম। এরপর অনেকে খোঁজখবর নিচ্ছেন। মিডিয়াও ফোন দিয়ে খোঁজ নিচ্ছে।

মঙ্গলবার আশিক চৌধুরীর ফেসুবক স্ট্যাটাসের মাধ্যমেই হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর বিষয়টি জানাজানি হয়।

মঙ্গলবার আশিক চৌধুরী ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন- ‘ভাই বড় ধন, রক্তের বাঁধন’। নিজের ছবির সাথে হারিছ চৌধুরীর একটি ছবি যুক্ত করে তিনি এই স্ট্যাটাস দেন। এরপর স্ট্যাটাসের নিচে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন লিখে কমেন্ট করতে থাকেন। অনেকে হারিছ চৌধুরীকে নিয়ে আফসোসও করেন।

আশিক চৌধুরী জানান, গত বছরের আগস্ট মাসের মাঝামাছি হারিছ চৌধুরী লন্ডনে করোনা আক্রান্ত হন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাসায় ফিরেন। কয়েকদিন পর তার করোনা রিপোর্ট নেগেটিভও আসে। করোনার দখল সাময়িক কাটিয়ে ওঠলেও তার ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়। ফুসফুসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পরে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থান মারা যান হারিছ চৌধুরী।

হারিছ চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি সিলেটের কানাইঘাটের দিঘিরপাড় পূর্ব ইউনিয়নের দর্পনগর গ্রামে। তবে পরিবার সকলে ইংল্যান্ডে থকেন। বাড়িতে কেউ থাকেন না। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৬৮ বছর।

চারদলীয় জোট সরকারের এই ক্ষমতাশালী নেতার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। ২০০৭ সালে দেশে জরুরী অবস্থা জারির সপ্তাহখানেক পর ঢাকা থেকে স্ত্রীকে নিয়ে সিলেটে গ্রামের বাড়িতে আসেনর হারিছ। ওই রাতেই যৌথবাহিনী তার বাড়িতে অভিযানযান চালায়। তবে তাকে পায়নি।

হারিছ চৌধুরীর ঘনিষ্ট কয়েকটি সূত্রে জানা যায়, ওই অভিযানের পর কয়েক দিন সিলেটের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থেকে ২০০৭ সালের ২৯ জানুয়ারি জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান হারিছ। এরপর তিনি ওঠেন নানার বাড়ি ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ জেলার বদরপুরে।

এরপর পাকিস্তান হয়ে ইরানে তার ভাই আবদুল মুকিত চৌধুরীর কাছে পৌঁছান এমন খবরও চাউর হয়। ইরান কয়েক বছর থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে পরিবারের কাছে যান। সেখান থেকে ভারতে যাতায়াত করতেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য দেখভাল করতেন বলে তার ঘনিষ্ট একাধিক সূত্র বিভিন্ন সময় নিশ্চিত করে।

২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাসহ একাধিক মামলার অভিযুক্ত আসামি ছিলেন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রভাবশালী নেতা সিলেটের হারিছ চৌধুরী। প্রায় ১৪ বছর ধরে তিনি বিদেশে গা ঢাকা দিয়ে আছেন বলে জানা যায়। মামলার চার্জশিটেও অভিযুক্ত আসামি হারিছ চৌধুরীকে লাপাত্তা দেখানো হয়।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালে যাবজ্জীবন সাজা হয় হারিছ চৌধুরীর। একইবছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটাবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হারিছ চৌধুরীর ৭ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা হয়। এছাড়া সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় হারিছ চৌধুরী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ ২৮ জনের জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এই মামলা এখন বিচারাধীন।

শেয়ার করুন