১০ ডিসেম্বর ২০১৭


আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় সিলেটের বেতশিল্প

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : শীতলপাটির পর এবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্তির অপেক্ষায় এখন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প। সিলেটের বেতশিল্পীদের নিজ হাতের শৈল্পিক কারুকাজে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী দেশের বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। হাল ফ্যাশনের অনুসঙ্গ হয়ে উঠছে বেতের তৈরি ফার্ণিচার। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে এবং বিত্তবান পরিবারে শোভা পাচ্ছে বেতের তৈরি নামিদামি আসবাবপত্র।

২শ বছর আগের প্রাচীন ঐতিহ্যের বেতশিল্প দেশে শোভা পেলেও দু’যুগ আগে থেকে বেতের তৈরি সামগ্রী ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সরকারী দপ্তর ও বাসা-বাড়িতে এখন সিলেটের বেতের ফার্নিচারের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। অপূর্ব নির্মাণ শৈলীর কারণে দিনদিন বেতের তৈরি পণ্যের চাহিদা বেড়েই চলছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের উপাদান সংশ্লিষ্ট দেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই ও সুনির্দিষ্ট করে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরার কাজ করে ইউনেস্কো। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির স্বীকৃতি লাভের মধ্য দিয়ে দেশ ওই উপাদানের আঁতুড়ঘর হিসেবে বিশ্ব দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, মর্যাদা লাভ করে। এ সংক্রান্ত সনদে স্বাক্ষর করা সব দেশ প্রতি বছর নিজেদের যে-কোনো একটি উপাদানের স্বীকৃতি চেয়ে ইউনেস্কোতে আবেদন করতে পারে। এ বছর ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করে বাংলাদেশ। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের শীতলপাটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করে।

শীতলপাটির মতো সিলেটের বেতশিল্প এখন দেশ-বিদেশের মানুষের প্রিয়। বেতশিল্প কী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে পারে না?

সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘শীতলপাটির মতো বেতশিল্পও প্রাচীন ঐতিহ্য। বেতের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী এখন বিদেশেও জনপ্রিয়। শীতলপাটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করার আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে গেলাম।’

বেতশিল্পের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বেতশিল্প তালিকায় আছে কি না দেখতে হবে। বেতশিল্প স্বীকৃতি পাওয়া প্রয়োজন। আমরা দেখব এ বিষয়ে কিছু করা যায় কি না। আমরা নকশি কাঁথায়ও স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছি। এরআগে ঢাকার জামদানি, বাউল গানে, মঙ্গল শোভাযাত্রায় স্বীকৃতি পেয়েছি। এ অর্জন বাংলাদেশের মানুষের। আর তা বাস্তবায়নে সার্বক্ষণিক কাজ করেছেন দেশের সফল প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা।’

বেতশিল্পের স্বীকৃতির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশেষজ্ঞ কমিটি রয়েছে, তাঁরা তা নিয়ে গবেষণা করবেন। পরে প্রস্তাব প্রেরণ করা হবে। আমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি করব না। দেশের স্বার্থে, উন্নয়নের স্বার্থে আমিও চাই ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাক।’

বিরোধীদলীয় হুইপ সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘শীতলপাটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করায় আমাদের দেশের এক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি হয়েছে।

তিনি বলেন, উন্নত অনেক দেশ ঘুরেছি এবং দেখেছি সিলেটের বেতশিল্প কত জনপ্রিয়। বেতশিল্প আমাদের অতীত ইতিহাস। আজ তা বিশ্বময় জনপ্রিয়। তাই বেতশিল্পে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি আমাদের প্রাপ্য। এজন্য আমার চেষ্টা চালিয়ে যাব।’

সিলেট বন বিভাগ সূত্র জানায়, সিলেটে এখন প্রচুর পরিমাণে বেত ও মুর্তা বাগান করেছে সরকার। এরমধ্যে কোম্পানীগঞ্জের রাণীখাই বিট, হিলকরি বিট, সালুটিক বিট, গোয়াইঘাটের লক্ষ্মীপুর বিট এবং খাদিমপাড়া জাতীয় উদ্যানে মুর্তা ও বেত বাগান রয়েছে।

এ ব্যাপারে বন বিভাগের সিলেট রেঞ্জ কর্মকর্তা দেলোয়ার রহমান বলেন, ‘বন বিভাগ প্রচুর পরিমাণে মুর্তা ও বেত বাগান করেছে। এ বাগানগুলো প্রতিবছরই বিক্রি করা হয়। এ থেকে বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আদায় হয়।

তিনি বলেন, সিলেটের শীতলপাটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ায় আমরা আনন্দিত। তবে বেতশিল্প আরো বেশি জনপ্রিয়। আমরা আগামীতে বেতশিল্পে আরো বেশি সুনাম বয়ে আনব বলে বিশ্বাস করি।’

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীবের অফিস কক্ষে গেলে দেখা যায় তাঁর পুরো কক্ষই বেতের আসবাবপত্র দিয়ে সজ্জিত। এক দেয়ালে লাগানো রয়েছে বেতের তৈরি ফ্রেমে জাতির পিতার ছবি অপর দেয়ালে শোভা পাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র।

কথা হলে এনামুল হাবীব বলেন, বেতের তৈরি সামগ্রী অনেক ভালো। দেখতে সুন্দর, আভিজাত্য আছে। এছাড়া বেতশিল্প আমাদের ঐতিহ্য। আমরা বেতের তৈরি আসবাবপত্র ব্যবহার করে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তিনিও আশা প্রকাশ করে বলেন, বেতশিল্প একদিন বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে বলে আমার বিশ্বাস।’

সিলেটের প্রাচীন বেতশিল্প এলাকা ঘাসিটুলা নিয়ে গল্পও প্রচলিত আছে। গল্পটা ঘাসিটুলার মেয়েদের অন্য এলাকায় বিয়ে দেওয়া হতো না। আবার ছেলেদেরও অন্য এলাকার মেয়ে বিয়ে করানো হতো না, কারণই ছিল ঐতিহ্যের বেতশিল্প। এখানকার বেতশিল্পীদের মনে একটা সংশয় কাজ করত। মেয়েকে বাইরের এলাকায় বিয়ে দিলে, সে যদি স্বামীর বাড়ির এলাকার লোকজনকে বেতের শৈল্পিক কাজ শিখিয়ে দেয়। আবার ছেলের জন্য অন্য এলাকার মেয়ে বিয়ে করিয়ে আনা হলে, যদি ওই মেয়েটি তার বাবার বাড়ির এলাকার লোকজনকে বেতের কাজ শিখিয়ে দেয়! তা হলে তো সিলেটের একমাত্র বেতশিল্পের এলাকা বৃহত্তর ঘাসিটুলার কদর আর থাকবে না। গল্পটা আজো আছে। কিন্তু গল্পের নিয়মটি আর নেই। ঘাসিটুলার বেতশিল্পের সেই খ্যাতি আজ বিলীন। প্রাচীন এই শিল্পকে এখন বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই করছেন ওই এলাকার অসংখ্য বেতশিল্পী। এলাকার বেশিরভাগ লোক এখনো বেতশিল্পের কাজ করে চালাচ্ছেন জীবন। পাশাপাশি ধরে রেখেছেন ২শ বছর আগের প্রাচীন ঐতিহ্য।

ঘাসিটুলা ঘুরে জানা গেল, এখানে একসময় পুরো এলাকার মানুষই এ শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। একসময় ঘাসিটুলার পাঁচ শতাধিক পরিবারের লোকজন বেতশিল্পের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। সময়ের চাহিদায় আজ পেশা বদলে যাচ্ছে অনেকের। কেউ বেতের কাজ বাদ দিয়ে টমটম (ইজিবাইক) চালাচ্ছেন, কেউ সবজি বিক্রি করছেন। এখন অন্য এলাকার মেয়ে বউ হয়ে আসছে এ এলাকায়, এখানকার মেয়েকেও বাইরে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

কয়েকজন বেতশিল্পী জানান, এখানে বেতের বাজার নামের বাজার আছে। মূলত এই বাজারে দীর্ঘ দুইশ’ বছর ধরে সপ্তাহে দু’বার বেতের পসরা নিয়ে বসা হয়। ওই এলাকার বেতশিল্পীরা দূর-দূরান্ত থেকে আগত বেত বিক্রেতাদের কাছ থেকে বেত কিনেন। তাই বাজারটির তকমাই লেগে গেছে বেতের বাজার হিসেবে। সিলেটের হরিপুর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, শায়েস্তগঞ্জ থেকে বেত ব্যবসায়ীরা বেত বিক্রি করতে বেতের বাজারে আসেন।

ঘাসিটুলার বেতশিল্পীরা এই বাজার থেকে বেত কিনেন। চারটা বেতে এক গন্ডা। আর ১৯ গন্ডায় এক মোড়া (বান্ডেল)। এই বাজারে প্রতি সোম ও শুক্রবার ২০০ থেকে ৩০০ মোড়া বেত বেচাকেনা হয়। বর্তমানে বেতের দাম চড়া। কারণ উৎপাদন এলাকাগুলোয় বনজঙ্গল, টিলা কাটা পড়ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো বেতের গাছ ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে।

একসময় ৪০০ টাকায় এক মোড়া বেত পাওয়া যেত, এখন সেই বেত এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিজের টাকায়ই কাঁচামাল কিনতে হয় বেতশিল্পীদের।

কয়েকটি কারখানা ঘুরে দেখা গেল, বিভিন্ন জাতের সোফা বানানো হয়েছে। নবাব সোফা, হাইবেক সোফা,কার্পেট সোফা, রকি সোফা, বেন্টো সোফা ও ডিমার সেট। আরো আছে ফুলের টব, টোল, মোড়া, বেবি ঘোড়া চেয়ার, দোলনা।

এখানে তারা শোরুমের অর্ডার অনুযায়ী কাজ করে জিনিস বিক্রি করেন। একেকটি সোফা সেট তারা বিক্রি করেন পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা দামে। মোড়া ৩০০ টাকা, বেবি চেয়ার এক হাজার ২০০, দোলনা এক হাজার ৪০০, বুক সেলফ দুই হাজার, বক্স খাট সাত হাজার, ফুলের টব ৪০০, টোল এক হাজার ৫০০ টাকা হালি। শোরুম মালিকেরা তা দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেন।

ঘাসিটুলায় তৈরি বেতের পণ্য সিলেটের বিভিন্ন শোরুমে বিক্রি হচ্ছে। জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, দরগা গেট ও নবাবরোডে আছে বেতের জিনিসপত্র। সিলেটে ১৫-১৬টি বেতের পণ্যের শোরুম আছে। দেশের অনেক জায়গা থেকে ক্রেতারা এসে এসব শোরুম থেকে বেতের জিনিস কিনেন। কেউ কেউ ক্যাটালগ দেখে অর্ডার করে যান, বেতশিল্পীকে দিয়ে শোরুম মালিকেরা তা তৈরি করে নেন। এসব শোরুমে বেতের তৈরি সোফা ১ লাখ ২ লাখ টাকার উপরেও বিক্রি হচ্ছে।

সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী বলেন, ‘আমার গর্বিত আমাদের শীতলপাটি আজ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, আমাদের আরেক ঐহিত্য হচ্ছে বেতশিল্প। ওই শিল্পকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছাতে আমি জাতীয় সংসদে কথা বলব। কারণ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সিলেটের বেতশিল্প প্রসংসিত।’

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘শীতলপাটিকে স্বীকৃতি দেওয়ায় ইউনেস্কোকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। তবে আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য বেতশিল্প-যে শিল্প দেশে বিদেশে পরিচিত। সেই শিল্পকেও স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। আর এই স্বীকৃতির জন্য আমরা সবাই এক ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’

সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘দু’শ বছর পূর্ব থেকে চলে আসছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি বলেন, সিলেটের বেতের তৈরি আসবাবপত্র আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করেছে। ভবিষ্যতে বেতশিল্পেও আমরা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করব বলে বিশ্বাস করি।’

মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, ‘আমাদের সংগঠন আইডিয়া শীতলপাটিকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আবেদন করে। আমরা অনন্ত আনন্দিত শীতলপাটি স্বীকৃতি লাভ করায়। পরবর্তীসময়ে সুযোগ আসলে অবশ্যই আমরা বেতশিল্পের স্বীকৃতির জন্য আবেদন করব। কারণ এটি আমাদের ঐতিহ্য। বেতশিল্পও ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাক এটি সিলেটের মানুষ হিসেবে নয়; একজন বাঙালি হিসেবে আমাদের প্রাণের দাবি।’

সূত্র মতে, বেত বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য বনজ সম্পদ। অনেকে বসতভিটার আশপাশেও বেত লাগায়। আসবাবপত্র তৈরি ও অন্যান্য কুটির শিল্পে বেত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলা থেকে বেত রপ্তানি হয়েছে। বেত ফল খাওয়া যায়। বিশ্বে ১৩টি গণের প্রায় ৬শ প্রজাতির বেত রয়েছে। বাংলাদেশে আছে বেতের মাত্র ২টি গণ। অঙ্গজ ও বীজ উভয় ধরনে বেতের বংশবিস্তার ঘটানো যায়। বীজের শাঁস ফেলে দিয়ে বীজতলার বীজ বপন করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চারা গজায়। এসব চারা ০.৭৫-১ মিটার উঁচু হলে স্থানান্তর করতে হয়। ২-৩ বছরে বেত বড় ঝাড় হয়ে ওঠে, ৭-৮ বছরে তা কাটা যায়। চাষে বেশি যত্ন লাগে না। লাগানোর পর কিছুদিন প্রয়োজনবোধে সেচ ও সার দেওয়া যেতে পারে।

বেতশিল্প বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যময় কুটির শিল্প। গৃহস্থালিতে বেতের ব্যবহার বহুবিধ। গৃহ নির্মাণে যেমন বেতের প্রয়োজন, তেমনি শৌখিন সজ্জাতেও বেতের কদর রয়েছে। দেশের কোনো কোনো এলাকায় মহিলারা বেতের কাজে পুরুষদের চেয়ে বেশি দক্ষ। অনেক এলাকাতেই নারী-পুরুষ সবার জন্য বেতের আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী তৈরি রোজগারের একটি ভাল উপায়। ভিন্ন ভিন্ন কাজে ভিন্ন ধরনের বেত ব্যবহূত হয়। বেতশিল্পে সাধারণত জালি ও গোল্লা বেত ব্যবহার করা হয়। প্রধানত বুনন ও বাঁধানোর কাজে বেত ব্যবহৃত হয়। নকশার ধরন বুঝে সরু ও মোটা বেতের বিভিন্ন ধরনের অংশ তুলে নিতে হয়।

জালি বেত দিয়ে চেয়ার, টেবিল, দোলনা, বাস্কেট, মহিলাদের ব্যাগ ও বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী তৈরি হয়। গোল্লা বেত ব্যবহার হয় নিত্য ব্যবহার্য আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী তৈরির কাঠামোতে। কাজের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে গোল্লা বেতকে লম্বালম্বিভাবে কয়েক টুকরায় কাটতে হয়।

বিসিকই প্রথম কারুশিল্পের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবন করার লক্ষ্যে কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই কর্মসূচির আওতায় বিসিক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কারুপলী খুঁজে বের করেছে এবং কারুশিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ, বিপণন ব্যবস্থা, উৎপাদন উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, যথাযথ প্রযুক্তি এবং পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করছে।

বিসিকের সূত্রমতে, ২৯টি নির্বাচিত কারুপণ্যের সর্বমোট ৪,২২৬টি কারুপল্লীর মধ্যে বাঁশ ও বেতের জিনিসের কারুপল্লীর সংখ্যা ১,১৫৪টি। এটি কারুপণ্যের সর্ববৃহৎ উপখাত। ২০০০ সালে এতে প্রায় ১,৩৫,০০০ জন লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

সারা বিশ্বে, বিশেষত এশিয়া ও ইউরোপে বেতের তৈরি সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ বেতের তৈরি বিভিন্ন ধরনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সামগ্রী রাশিয়া, জার্মানি, সিঙ্গাপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করে থাকে। জার্মানি, কানাডা, জাপান ও অন্যান্য দেশে অনুষ্ঠিত বেশ কতগুলি আন্তর্জাতিক কারুশিল্প মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বেতশিল্পে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে।

১৯৯৯-২০০০ সালে বাংলাদেশ বেত ও বাঁশজাত পণ্য রপ্তানি করে ২৫ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা অর্জন করেছে। কাঠ ও বাঁশের পরই বেত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনজ সম্পদ। তবে এর উৎপাদন ক্রমাগত কমে আসছে। বাংলাদেশ ১৯৮৫-৮৬ সালে ৩৯,৩৮,০০০ ফুট এবং ১৯৯৩-৯৪ সালে ২৯,৩৮,০০০ ফুট বেত উৎপাদন করেছে। সম্প্রতি বনবিভাগ প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম বনে বেত চাষ শুরু করেছে।

 

(আজকের সিলেট/১০ ডিসেম্বর/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন