২৪ ডিসেম্বর ২০১৭


গায়েব হওয়া ৩ গাড়ি নিয়ে মন্ত্রনালয়রে তদন্ত শুরু

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিসিকের গায়েব হওয়া ৩ গাড়ি নিয় তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রানালয় তিন সদস্যের তদন্ত্র কমিটি।

রোববার সকালে তিন সদস্যের তদন্ত্র কমিটি সিসিকের মেয়র সহ কর্মকতা-কর্মচারীদের জবানবন্ধী নেন। এর পর দুপুরে সিসিকের পাকিং এ রাখা উদ্ধারকৃত গাড়ীর যন্ক্রাংশ দেখেন।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রালয়ের পরিচালক মতিউর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত্র কমিটি গুরুত্ব সহকারে কাজ করছেন বলে জানান পরিচালক মতিউর রহমান। তদন্ত্র কমিটির সাথে ছিলেন সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবিব, প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান।

প্রসঙ্গত, তিনটি গাড়ি গায়েব হওয়ার খবরে সিলেট সিটি করপোরেশন অভ্যন্তরে চলে তোলপাড়। কনজারভেন্সি শাখা ও পরিবহন শাখার দোষারোপের খেলা রীতিমত বেকায়দায় ফেলে সংশ্লিষ্টদের। অকেজো ও নষ্ট হয়ে যাওয়া গাড়ি তিনটির অস্তিত্বই নেই বলছে পরিবহন শাখা। আর কনজারভেন্সি শাখা বলে গাড়ি নয়, আছে শুধু যন্ত্রাংশ।

আর এই যন্ত্রাংশগুলো আবর্জনার সঙ্গেই চলে যায় ডাম্পিং গ্রাউন্ডে। এ ঘটনা জানাজানি হলে সিটি করপোরেশনে শুরু হয় তোলপাড়। খবর পৌঁছে মেয়রের কাছে। ফাইল তলব করেন মেয়র। সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) আবুল ফজল খোকন ফাইল দেখিয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করেন মেয়রকে। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। গঠন করে দেন তদন্ত কমিটি।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ১৯৭৬ ইংরেজি সনে তৎকালীন পৌরসভার নিজস্ব তহবিল হতে ক্রয় করা হয় একটি পিকআপ (যার নম্বর সিলেট-ঘ-০২-০০৪৮), একটি অ্যাম্বুলেন্স (যার নং সিলেট-ব-৬১৪৮) ও একটি মিনি ট্রাক (যার নং সিলেট-ট-৫৪১০)। তিনটি গাড়ি ৩৩ বছরের অধিক পুরাতন হওয়ায় ২০০৬ সালে এই গাড়িগুলো বিকল ঘোষণা করে সিটি করপোরেশন। অযতœ আর অবহেলায় গাড়ি তিনটির ইঞ্জিন, চ্যাসিসসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এরপর দীর্ঘ সময় গাড়ি তিনটির ফাইল অজানা কারণে আর এগুইনি।

অবশেষে ২০১৩ সালে সিটি করপোরেশন একটি কন্ডেম কমিটি গঠন করে। বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শককে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর একটি প্রতিবেদন দাখিল করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এসসিসি/প্রকৌ:/পরি-৫/১১-১৩/১১-১৩/৫৬৮, তারিখ-১৯ ডিসেম্বর ২০১৩ ইং অনুযায়ী সিলেট সিটি করপোরেশনের উল্লেখিত তিনটি গাড়ির নথিপত্র সরেজমিন পরীক্ষান্তে দেখা যায়, গাড়ি তিনটির অবকাঠামো ভেঙ্গে গেছে। ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, স্টিয়ারিং সিস্টেম, ব্রেক সিস্টেম বিকল হয়ে গেছে। এছাড়া গাড়িগুলোর ইলেক্ট্রনিক সিস্টেম সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, যা মেরামতের অনুপযোগী। কন্ডেম কমিটি তাদের প্রতিবেদনে আরও জানায়, গাড়িগুলো মেরামত করতে যে টাকা ব্যয় হবে তা অলাভজনক। যার কারণে গাড়িগুলো কন্ডেম করা যেতে পারে বলে মত দেন।

চলতি বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে অস্তিত্বহীন এই তিনটি গাড়ির লাপাত্তা হওয়া নিয়ে সিসিকে শুরু হয় তোলপাড়। এগুলো রাখা ছিলো নগরীর তোপখানার পীর হবিবুর রহমান পাঠাগারস্থ করপোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয়ে-প্রায় পরিত্যক্ত একটি জায়গায়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ২৭ তারিখ থেকে সেগুলো আর ওখানে দেখা যায়নি। শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। গত ২৪ অক্টোবর সিটি করপোরেশনের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. জাবেরুল ইসলাম কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। মেয়র কিংবা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কিভাবে তিনি জিডি দায়ের করলেন এ নিয়ে সিসিক কর্মকর্তাদের মধ্যে শুরু হয় কথা-বার্তা। কার ইশারায় জাবেরুল জিডি করলেন বিষয়টি একরকম দৃশ্যমান হয়ে যায় সিসিকের কর্মকর্তাদের কাছে।

জিডিতে জাবেরুল উল্লেখ করেন গাড়ি যথাস্থানে দেখতে পাওয়া যায়নি। এগুলো সরকারি সম্পদ। তাই এই সম্পদ ‘চুরি’র দায়ে ভবিষ্যতের জন্য সাধারণ ডায়েরি করা হয়। জিডি করা হয় ‘চুরি’ যাওয়ার প্রায় ১ মাস পর ২৪ অক্টোবর। আর সময়ক্ষেপণ করে জিডি করার ঘটনার পেছনে রহস্যের গন্ধ খুঁজে পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘কাগজে-কলমে’ অস্থিত্বহীন এই গাড়িগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো অবগত। এগুলো গাড়ির অংশবিশেষ মাত্র। দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনার স্তূপে মিশে এগুলো আবর্জনার স্তূপকেই বড় করছিল। সিটি করপোরেশনের মেয়রের নির্দেশে অস্থায়ি কার্যালয় প্রাঙ্গন পরিস্কার করাতেই বিপত্তি বাধে। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা আবর্জনার সঙ্গে ওই গাড়ির যন্ত্রাংশও নিয়ে ফেলেন নগরীর পারাইরচকের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে। পরদিন অস্থায়ি কার্যালয়ের সামন পরিষ্কার হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দামি অনেকগুলো গাড়ি নিয়ে আসা হয়েছে সিটি করপোরেশনের কাজের জন্য। মূলতঃ নতুন এই গাড়িগুলোর স্থান সংকুলানের জন্যই প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন মেয়র। এটা সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর অজানা নয়। কিন্তু তার পরও সিটি মেয়র কিংবা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া জিডি করার বিষয়টি অন্য বার্তা দিচ্ছে পরিচ্ছনতা শাখার সঙ্গে সম্পৃক্তদের মাঝে। তখন,পরিচ্ছন্নতা শাখার প্রধান কর্মকর্তা হানিফুর রহমান বলেছিলেন, বিষয়টি বিব্রতকর। গাড়ির যন্ত্রাংশগুলো আবর্জনার সঙ্গেই চলে যায় ডাম্পিং গ্রাউন্ডে।

গাড়ি গায়েব প্রসঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেছিলেন , গাড়ি তিনটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয় (পীর হবিবুর রহমান পাঠাগার) এর সামনে ফেলে রাখা হয়েছিল। গাড়িগুলোর বডির অংশ বিশেষ ছাড়া আর কোন কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমার নির্দেশেই অস্থায়ি কার্যালয় পরিষ্কার করা হয়। আর জিডিতে যে গাড়িগুলোর কথা বলা হয়েছে সেগুলো যন্ত্রাংশমাত্র।

সিলেট সিটি করপোরেশনের উধাও হওয়া তিন গাড়ি নিয়ে পরে মুখ খুলেন সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। নগর ভবনে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মেয়র জানান, ওই গাড়িগুলোর কিছু অংশ বিশেষ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল সিসিকের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে।

নতুন গাড়ি আসায় সেগুলো সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের। তারা সেগুলো যথাযথ স্থানে না রেখে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নিয়ে রেখেছিল। এ ব্যাপারে কারও কোনো গাফিলতি ছিল কি-না সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। তিনি জানান, গাড়ি উধাও হয়নি। এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।

সিসিকের তিনটি গাড়ি উধাও এবং চুরি হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সংবাদ সম্মেলনে মেয়র উল্লেখ করেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে থেকে গায়েব হওয়া তিনটি গাড়ি চুরি হয়নি।

গায়েব হওয়া গাড়িগুলোর কিছু দৃশ্যমান অংশবিশেষ ছাড়া আর কোনো অস্তিত্ব নেই উল্লেখ করে মেয়র বলেন, এ গাড়িগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিকল ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আবর্জনাস্তূপকে বড় করছিল। পরিবহন শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গাড়িগুলোর অংশবিশেষ নির্ধারিত স্থানে তাদের দায়িত্বে না রাখায় পরিচ্ছন্নতা শাখার লোকজন আবর্জনা মনে করে ডাম্পিং স্টেশনে ফেলে আসে, যা পরবর্তী সময়ে ডাম্পিং স্টেশনে রক্ষিত রাখা হয়।

 

(আজকের সিলেট/২৪ ডিসেম্বর/ডি/কেআর/ঘ.)

শেয়ার করুন