আজ শুক্রবার, ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ফুটপাতের পণ্য!

  • আপডেট টাইম : January 6, 2018 12:09 PM

দেবব্রত রায় দিপন (অতিথি প্রতিবেদক) : মেলা আন্তর্জাতিক কিন্তু সকল পণ্যই ফুটপাতের। মেলায় বিদেশী স্টল নেই একটিও। শুরু থেকেই আয়োজক প্রতিষ্টানের পক্ষ থেকে মেলায় বিদেশী স্টল থাকার কথা জানান দিলেও মাঠে বিদেশী স্টল অনুপস্থিত। মেলার মাঠ সরেজমিন পরিদর্শন শেষে এমন চিত্রই চোখে পড়েছে গতকাল।

গত ২২ ডিসেম্বর সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের আয়োজনে সিলেটে শুরু হয় ৪র্থ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। নগরীর শাহী ইদগাহস্থ খেলার মাঠে এ আয়োজন নিয়ে শুরু থেকেই বেঁকে বসেন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। খেলার মাঠে মেলা বন্ধের দাবিতে মানব বন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ সহ যে কোনও মূল্যে মেলা বন্ধে সে সময় গ্রহণ করা হয় কঠোর কর্মসূচী।

অবশেষে সকল প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও আদালতের স্থিতাবস্থা পিছনে ফেলে যথারীতি একই মাঠে আবারো শুরু হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা।

মেলার মাঠ পরির্শনকালে কথা হয় মেলায় আগত একাধিক দর্শনার্থীদের সাথে। মেলার মান নিয়ে অনেকেই এই প্রতিবেদকের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আয়োজকদের প্রতি স্টল মালিকদেরও রয়েছে ব্যাপক অভিযোগ।

মেলায় বিক্রিত সকল পণ্যকে ফুটপাতের সাথে তুলনা করে মীরাবাজারের ফয়সল আহমদ নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, “এই সব জিনিস আমাদের জিন্দাবাজারের ফুটে ফুটে পাওয়া যায়, ২০ টাকা দিয়ে মেলায় প্রবেশ করে একই জিনিস বেশী দামে কেনার বিলাসিতা আমার নেই। যেটি মনে হয়েছে- এখানে মেলা আয়োজন মুল কথা নয়, প্রবেশ ফি’র নামে জুয়া বাণিজ্যটাই এখানে মুখ্য”। একই অভিযোগ মহিলা দর্শনার্থী সামিয়া বেগমের। স্বামী-সন্তান সহ গতকাল মেলায় এসেই প্রতিবেদকের চোখে পড়েন।

মেলায় কি কিনলেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্নে জানতে চান- কেনার কি আছে ? তিনি বলেন, কোনও বিদেশী স্টল/ প্যাভেলিয়ন না রেখেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা নামকরণ- একেবারেই প্রতারণার সামিল। মেলায় পাকিস্থানি প্যাভেলিয়ন রয়েছে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, “আপনি নিজে যখন মাঠে এসেছেন নিজের চোখেই একবার প্যাভেলিয়ন ঘুরে আসুন”।

মহিলা দর্শনার্থির কথা শেষ না হতেই কথায় শামিল হন আরো এক দর্শনার্থী।

জুবের আহমদ (৩০) নামের সরকারি চাকুরিজীবী এ দর্শনার্থী জানান, মিডিয়া সেন্টার থেকে সকাল থেকে রাত অবধি মাইকে বিদেশী স্টলের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গোটা মেলার মাঠ ঘুরেও বিদেশী কোনও স্টলের অস্থিত্ব খোঁজে পাওয়া যায়নি। মেলায় প্রতিটি রাইডিং এর জন্য টিকেট ফি ৩০টাকা করা আদায় করা হচ্ছে।

তাছাড়া, মেলায় প্রবেশ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা করে। প্রবেশ ফি’র উপর রয়েছে প্রাইভেট কার সহ আকর্ষণীয় পুরুস্কার। প্রতি ১০ দিন অন্তর অন্তর এই প্রবেশফি’র টিকেটের উপর ড্র অনুষ্টিত হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। সব কিছু মিলিয়ে সকল উদ্যোগ ক্রেতাবিমুখ মাঠকে লাভজনক করার কৌশল বলে অনেক দর্শনার্থীই মনে করেন। মেলায় গতবারের চেয়েও অনেকগুণ বৃদ্ধিতে স্টল ভাড়া নিয়ে অনেক স্টল মালিকরাই এখন বিপাকে। মেলায় প্রতিদিনের বিক্রি এবং খরচের অংক হিসেব করে অনেকেই রয়েছেন গভীর দুর্শ্চিন্তায়।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো রপ্তানী বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের প্রচার প্রসার, বিদেশী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বিদেশী পণ্যের সাথে দেশীয় পণ্যের গুণগত মান যাচাই, এসএমই উদ্যোক্তা ও আত্মনির্ভরশীল মহিলা উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণনের সুযোগ সৃষ্টি ইত্যাদি। কিন্তু সেদিকে কোন লক্ষ্য না রেখে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার শুধুমাত্র অর্থ প্রাপ্তির লক্ষ্যে নিম্নমানের এসব মেলা আয়োজন করে যাচ্ছে।

মেলার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয় বরাবরের মতো আলোচিত মেলাবাজ মঈন খান বাবলুর মালিকানাধীন প্রতিষ্টান। কোনও রকম দরপত্র আহবান না করেই একই ব্যক্তিকে বারবার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়োগে চূড়ান্ত করার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ অনেকের কাছে।

মেলায় সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বারের দায়িত্বে রয়েছে ২০টি বিশেষ স্টল। যেগুলোতে স্থানীয় চেম্বারের সদস্য সহযোগি প্রতিষ্টান সহ নারী উদ্যোক্তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ পেয়ে থাকে। নারী উদ্যোক্তা জোনের কথা বলা হলেও স্টল প্রতি ভাড়াবৃদ্ধির অজুহাতে চড়াদামে সেগুলিও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্টানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ৩ জন নারী উদ্যোক্তা সেখান থেকে অতিরিক্ত ভাড়া প্রদানের মাধ্যমে স্টলগুলি বুঝে নেন।

এদিকে ‘নন স্টপ বাবলু’র মেলা আয়োজন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক ব্যবসায়ি। তাদের মতে, বাবলুর মেলা মানেই ১ মাস থেকে ৩ মাস পর্যন্ত গড়ায়। তাছাড়া, বছরজুড়েই চলে ‘নন স্টপ বাবলু’র মেলা আয়োজন। সবকিছু মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় মঈন খান বাবলুর প্রতিষ্ঠান আবারো মনোনীত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ।

নগরীতে খেলা বিনোদনের জন্য বিশাল মাঠ না থাকায় সিলেটের ক্রীড়াঙ্গণ অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়ে। এরই প্রেক্ষিতে একসময় সদর উপজেলা মাঠটিকে বেছে নেওয়া হয়। তারপর থেকেই মাঠটিকে খেলার উপযোগী করে তুলতে নেওয়া হয় কার্যকর পদক্ষেপ। শুরু হয় ঠিলা কেটে মাঠের উপযোগী সমতল পরিবেশ সৃষ্টি করা।

এরই ধারাবাহিকতায় মাঠটিকে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর থেকেই শাহীঈদগাহস্থ খেলার মাঠ শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম হিসেবেই পরিচিতি পাচ্ছে। তবে অবস্থা এখন আর সে পর্যায়ে নেই। অব্যাহত ভাবে মেলাবাজদের হাতে পড়ে খেলার মাঠটি এখন মেলা মাঠেই পরিচিতি পাচ্ছে সমধিক। আবার অনেকের কাছেই মাঠটি ‘গরুর হাট’ বলেও পরিচিত।

এলাকাবাসি জানান, ‘বাণিজ্য মেলা একটি নির্ধারিত মাসে ঘোষণা করা হলেও আয়োজন শুরু হয় প্রায় দেড় মাস আগ থেকেই। তারপর নির্ধারিত মাস থেকে মেলা শুরু হলেও চলে যায় তা দুই মাসে। তারপর জিনিসপত্র ডেকোরেশন সবকিছু ঘুচিয়ে নিতে আরো ১ মাস চলে যায়। মোট কথা, এভাবেই ১ মাসের মেলা ৩ মাসে বিস্তার লাভ করে। আর কোরবানীর পশুর হাটের সময় আরও হাট চালুর আগে প্রায় মাসখানেক।

হাটের পর আরও প্রায় একমাস নোংরা থাকে মাঠটি। এভাবে ‘মেলা’ আর ‘হাটে’ চলে যায় প্রায় ৭ মাস। তারা আক্ষেপ করে বলেন- এসব মেলা আয়োজনের সাথে আমাদের এলাকার অনেক মুরব্বীরা জড়িত। তারা যদি মেলা আয়োজনে বাঁধা দিতেন। তবে আমরা খেলাধূলা থেকে বঞ্চিত হতাম না। এটি দু:খজনক।

(আজকের সিলেট/৬ জানুয়ারি/ডি/কেআর/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ