আজ শনিবার, ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

মেলা নিয়ে এই কেমন খেলা?

  • আপডেট টাইম : January 12, 2018 6:05 AM

সৈয়দ বাপ্পী (অতিথি প্রতিবেদক) : নগরীর শাহী ঈদগাহ শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম মূলত জেলা প্রশাসনের নামীয় রেকর্ডীয় ভূমি। এই ভূমি নিয়ে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। কিন্তু সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ চৌধুরী। তিনি বিগত ৪ বছর থেকে তথাকথিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা এবং পশুর হাট হিসেবে ভাড়া দিয়ে আসছেন। অথচ জেলা প্রশাসন কোন ব্যবস্থা না নিয়ে একটি বেআইনী কার্যক্রমকে কেনো উৎসাহিত করছেন তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। খেলার মাঠ শুধু খেলা করার জন্য ব্যবহার করতে হবে। এই ভূমিটি বিগত জরিপে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসকের নামে এক নম্বর খতিয়ানে রের্কডভূক্ত হয়।

অথচ সরকারের এই ভূমি অবৈধভাবে ব্যবহার করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই ভূমিতে অতীতে ১৭ লাখ টাকার বিনিময়ে সদর উপজেলা পরিষদ পশুর হাটের জন্য ভাড়া দিয়েছিলো। এখন মেলার জন্য তারা ভাড়া দিয়েছেন। খেলার মাঠকে মেলার স্থান হিসেবে ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে একটি রিট আবেদন করেছেন নগরীর শাহী ঈদগাহর বাসিন্দা নাজির আহমেদ চৌধুরীর ছেলে মনজু জামান চৌধুরী। পরে আদালত মাঠটিকে স্থানীয় শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ হিসেবে রাখার জন্যও নির্দেশনা প্রদান করেন।

গত ১৪ ডিসেম্বর তিনি একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। কিন্তু কোন কারণে, আইনের প্রতি সম্মান না দেখিয়ে রিটের কোনো জবাব ছাড়াই জেলা প্রশাসন তাদের কার্যক্রম চলতে দিচ্ছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক শহিদুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, সিলেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা এটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন। তবে এই রিটের ভিত্তিতে আমরা সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সদর উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সিলেট পুলিশ কমিশনারকে বলে দিয়েছি বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।

তিনি আরো জানান, বাণিজ্য মেলা বিষয়ে আমাদের কোনো অনুমতি নেই, আমাদের কোনো নিষেধও নেই। তবু জেলা প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না! কেনইবা এখনও এর কোন জবাব দিচ্ছেন না।

একটি সূত্র জানিয়েছে, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের কাছ থেকে ২ কোটি টাকার বিনিময়ে সরকারের খাস জমিতে সিলেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ২০১৭ আয়োজন করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ড্রাস্ট্রির সদস্য এবং মেলার সমন্বয়কারী এম এ মঈন খান বাবলু। আর তিনি এই মাঠ নিজেদের দাবী করে তাদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। এই সদর উপজেলা মাঠ নামে খোলা জায়গায় বিভিন্ন এলাকার এবং স্থানীয় শিশু-কিশোর খেলাধুলা করতো। এই মাঠ নিয়ে একটি মামলাও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সৈয়দ আমিনুর রহমান।

আয়োজকরা জানান, তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের অনুমতি নিয়েই মেলা করেছেন। আইন অনুযায়ী খেলার মাঠে খেলা ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহার কিংবা ভাড়া দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এই আইন লঙ্ঘন করেই খেলার মাঠ (বর্তমানে নির্মাণাধীন শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম) মেলা জন্য ভাড়া দিয়েছেন সদর উপজেলা প্রশাসন।

খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, খেলার মাঠ অন্য কোনোভাবে ব্যবহার বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না। এই আইন লঙ্ঘনে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় সাজার বিধান রয়েছে।

এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আইন উপদেষ্ঠা ও সাবেক ভিপি-জিপি জজকোর্ট এবং সিলেট জজ কোর্টের এ্যাডভোকেট এএইচ ইরশাদুল হক কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রুল জারী করা হয় তবে তাদের উচিৎ হাইকোর্টকে সম্মান জানানো এটা স্থগিতাদেশের সমতুল্য। হাইকোর্টের রুল জারী মানেই শোকজ। যদি কোন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই রুল জারী করা হয় তবে তাদের উচিৎ হবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে সুরাহা করার পর তাদের কার্যক্রম শুরু করা।

কত টাকার বিনিময়ে এই খেলার মাঠ ইজারা দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ বলেন, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসিন আহমদ ও মেলার সমন্বয়কারী এমএমঈন খান বাবলু তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অনুমতি নিয়ে এই মেলা করছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতও চান সিলেটে একটি মেলা হোক। আমরা মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছি। এই মাঠ বাবৎ যা টাকা আমরা পেয়েছি তা চেক মাধ্যমে। তবে কত টাকার বিনিময়ে তা ভাড়া দিয়েছেন তা তিনি বলতে অপারগতা জানিয়েছেন।

এই মাঠ সদর উপজেলার মাঠ কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই মাঠ ডিসি খতিয়ানের, সদর উপজেলার মাঠ বলেই চলছে। দীর্ঘদিন থেকেই এই মাঠ নিয়ে একটি মামলা চলছে, আর এই মামলা পরিচালনা করছে সদর উপজেলা অফিস। এই খেলার মাঠ সদর উপজেলা মাঠ জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে কোন লিখিত দেননি।

রিট আবেদনকারী শাহী ঈদগাহর বাসিন্দা মনজু জামান চৌধুরী জানান, গত ১৪ ডিসেম্বর একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেন। দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তারা আইনে প্রতি অসম্মান জানিয়ে জবাব না দিয়ে তারা মেলা চালিয়ে যাচ্ছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসিন আহমদ জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের অনুমতি নিয়েই আমরা এই মেলা করছি। মেলা বাবৎ সদর উপজেলা অফিসকে ৫ লাখ টাকা আর একটি মাদ্রাসায় ২ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।

সিলেট সদর উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিরাজাম মুনিরা জানান, নগরীর শাহী ঈদগাহ শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম এই খেলার মাঠ সদর উপজেলা পরিষদের জমি না। এটা উপজেলা পরিষদ ভাড়া দিবে কিভাবে? এটা সরকারের খাস জমি।

(আজকের সিলেট/১২ জানুয়ারি/ডি/এসটি/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ