১৮ নভেম্বর ২০২২


রিজার্ভে খেলাপি ঋণের প্রভাব

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : খেলাপিদের ঋণের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টর ও রিজার্ভসহ সব ধরনের আর্থিক খাত। পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। এতে সাধারণ আমানতকারীরা হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত। লাভ পাচ্ছেন কম। অপরদিকে ভালো ব্যবসায়ীরাও ঋণ পেতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন। তাদের ওপর চাপছে বেশি সুদ। এমনকি ব্যাংকের ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডরাও প্রাপ্ত লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে এমন অবস্থা আর চলতে দেয়া যায় না। প্রভাবশালীরা ঋণ নিয়ে খেলাপি করাটাকে সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে। তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। ঋণ খেলাপিরা পাচার করছে দেশের অর্থ। রিজার্ভে চাপ পড়ার এটিও একটি কারণ বলে মন্তব্য করেন তারা। এই ঋণ খেলাপিদের জন্য সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা বলছেন, বারবার ছাড় দেওয়া এবং কোনো শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে এটি বেড়েই চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, খেলাপি ঋণের বিষয়ে তাদের একটি রেগুলার টিম এবং অনুসন্ধানী টিম কাজ করে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেন আর না বাড়ে সেই চেষ্টাও চলছে।

তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। ২০০৯ সালেও এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এখন সেটি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। গত জুন মাস শেষেও খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এরপর জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে খেলাপি বেড়েছে ৯ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ সম্পর্কে বলেছিল, ‘বাংলাদেশে খেলাপি আড়াল করে রাখা আছে। খেলাপি ঋণের বিষয়ে যে তথ্য প্রকাশ করা হয়, প্রকৃতভাবে সেটি অনেক বেশি। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ হতে পারে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা।’

আইএমএফ তিন বছর আগে এই বক্তব্য দিয়েছিল। ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, এখন হিসাব করলে প্রকৃত খেলাপি আরও বেশি হবে।

অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর পর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আর এক টাকাও খেলাপি ঋণ বাড়বে না।’ তার ওই ঘোষণার আগে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা।

গত ৩০ জুনের পর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ হয়েছে, অগ্রণী ব্যাংকের ১৭ থেকে বেড়ে ১৯ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের ১৭ থেকে বেড়ে ১৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং বিডিবিএলের ৩৬ থেকে বেড়ে ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সোনালী ব্যাংকের খেলাপির হার আগের সমানই ১৮ শতাংশ এবং বেসিক ব্যাংকের ৫৯ শতাংশ রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাস শেষে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় সাড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যেটি তিন মাস আগেও ছিল ৫৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, ‘আমি প্রথমেই বলবো কেউ ঋণ নিয়ে যদি সত্যিই লোকসানে থাকে, তাহলে তাকে মাপ করে দিক সরকার। কিন্তু যারা ঋণ নিয়ে খেলাপি করাটাকে সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে, ঋণ নিয়ে অর্থ পাচার করছে তাদের ঋণ আদায় করার পাশাপাশি শাস্তি দেওয়া উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকগুলোকে মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়াতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরকে আরও শক্ত করতে হবে।’

‘বিদেশে টাকা পাচারকারীদের মধ্যে একটা শ্রেণি এই ঋণ খেলাপিরা। এরা এদিক দিয়ে ঋণ খেলাপি করে একটা অপরাধ করছে। আবার অন্যদিক দিয়ে টাকা পাচার করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রায়ও চাপ ফেলছে’।

এই ঋণ খেলাপিদের কারণে সাধারণ মানুষরাও বিপদে পড়ছে উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এখানে ডিপোজিটারদের রাখা আমানতে কোনো সমস্যা না হলেও ব্যাংকগুলো এই খেলাপি পোষাতে কিন্তু ডিপোজিটারদের লাভ কম দেবে। কেননা ওই ব্যাংক তো অনিশ্চয়তার ওই ঋণগুলোতে এক ধরনের লোকসান দিচ্ছে। এদিকে যারা শেয়ার হোল্ডার তারাও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।’

‘এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকও দায় এড়াতে পারে না। তাদের আরও আগেই কোমড় শক্ত করে দাঁড়ানো উচিত ছিল। এই ঋণ খেলাপিদের জন্য সাধারণ মানুষ, ব্যাংকিং সেক্টর, জাতীয় অর্থনীতি, রিজার্ভ সব খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’-যোগ করেন আবু আহমেদ।

তিনি সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের উদাহরণ দিয়ে বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের জন্য রাষ্ট্র থেকে টাকা দিয়ে ব্যাংকটাকে আবার সচল করতে হয়েছে।

যারা ঋণ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের প্রয়োজনে মাফ করে দেওয়ার কথা বলে আবু আহমেদ বলেন, ‘আমার মনে হয় যারা আসলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সংখ্যা খুব কম। এ বিষয়ে তদন্ত চালানো দরকার। যারা ঋণ খেলাপি করাকে সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এসব কারণে ব্যাংকের ওপরও সাধারণ মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। যে ব্যাংকগুলো ঋণ খেলাপির কারণে বিপর্যস্ত সেগুলোতে মানুষ ডিপোজিট করতে চায় না। এতে ব্যাংকিং সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ব্যাংক লসে পরিণত হয়। মানুষ ডিপোজিট করতে গেলে শক্ত ব্যাংক খুঁজে। তখন এই খেলাপি ঋণ করা ব্যাংকগুলোতে ডিপোজিট করতে চাইবে না। তখন এই ব্যাংকগুলো ব্যবসা করতে পারবে না।’

তিনি বলেন, ‘এটি ব্যাংকের মূলধনেও প্রভাব ফেলে। খেলাপি ঋণের কারণে প্রবিশনিং করতে পারবে না। তখন ব্যাংকের মালিকরা বিভিন্ন মিটিং করে ভাতা হিসেবে ব্যাংক থেকে টাকা নেয়। মুনাফা বণ্টন করতে পারে না।’

পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এই খেলাপি ঋণের কারণে সাধারণ মানুষের আমানতের টাকাটা খারাপভাবে বিনিয়োগ হয়। এই টাকাটা হয় পাচার করেছে বা অন্য কিছু করেছে তাহলে এই টাকাটা দেশের কোনো উপকারে আসলো না। কোনো ভালো ব্যাবসায়ী যদি টাকাটা ঋণ পেত তাহলে দেশের উৎপাদন বাড়তো। তিনি আরও বলেন, এখানে সাধারণ ব্যবসায়ীকে ঋণ দিতে গেলে ওই খেলাপি ঘাটতি পূরণের জন্য তার কাছে সুদ বেশি চাইবে। এতে ভালো ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হল। তাকে এটি পোষাতে গেলে পণ্যের দাম বেশি দামে বিক্রি করতে হবে। এতে সাধারণ মানুষ বেশি দামে পণ্য কিনল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হলো সাধারণ মানুষ।’

‘যদি ব্যাংকিং সেক্টরের কথা বলি তাহলে দেখবেন ক্ষদ্র বিনিযোগকারীরা সাধারণ মানুষ, যারা শেয়ার কিনেছে তাদের শেয়ারের দাম কমে যাচ্ছে। এখানে ব্যাংকিং সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রবিশন করতে গিয়ে ব্যাংকগুলো ঘাটতিতে পড়ে। মূলধনে ঘাটতিতে পড়ে।’-যোগ করেন আহসান এইচ মনসুর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জিএম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘খেলাপি ঋণের বিষয়ে বর্তমান পরিচালনা পর্যদ খুবই শক্ত অবস্থানে আছে। এর প্রতিফলন সামনে দেখা যাবে বলে আশা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঋণ খেলাপির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি রেগুলার টিম এবং একটি অনুসন্ধানী টিম কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি এই বিষয়ে নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও আমাদের অনুসন্ধানী দলের তদন্তেরভিত্তিতে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।’

‘বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে গভীরভাবে কাজ করে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ যেন আর না বাড়ে সেজন্যও কাজ করে যাচ্ছে।’-যোগ করেন আবুল কালাম আজাদ।

শেয়ার করুন