৩০ নভেম্বর ২০২২


রিজার্ভ আসলে কত?

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে এখন দেশজুড়ে আলোচনা। আলোচনা-সমালোচনার মাত্রা এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ বিষয়ে অফিসিয়াল পরিসংখ্যান দেওয়া হলেও মানুষের জল্পনা-কল্পনার যেন শেষ নেই। সবার একটাই প্রশ্ন, দেশের প্রকৃত রিজার্ভ ঠিক কত?

রিজার্ভ নিয়ে বিভ্রান্তির ঢালপালা বিস্তার করেছেন খোদ সরকারের দায়িত্বরতরা। একেকজন দিচ্ছেন একেকরকম তথ্য ও বক্তব্য দিচ্ছেন। সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টারা দিচ্ছেন এক রকম তথ্য। বাংলাদেশ ব্যাংক দিচ্ছে আরেকরকম তথ্য। আর আলোচনায় শরীক হয়েছে আইএমএফও।

গত ২৬ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, দেশের রিজার্ভ নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। আইএমএফের ঋণসহ দেশে রির্জাভ আছে ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা দিয়ে চলবে ৬ মাস।

দুই দিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘গণমাধ্যম মাঝে-মধ্যে উল্টাপাল্টা বলেন, আমাদের রিজার্ভ নাই। আমি তাজ্জব হই। আগে আমাদের তিন থেকে চার বিলিয়ন রিজার্ভ হলে আপনারা খুশি থাকতেন। আর এখন ৩৪ থেকে ৩৭ বিলিয়ন রিজার্ভ, তারপরও আপনারা বলেন রিজার্ভ নাই। এগুলো পাগলের প্রলাপ না হয় তো কী।’

ক’দিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে যা থাকে, সেটিই হচ্ছে নেট বা প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ। গভর্নরের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী দেশের প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে রিজার্ভের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে ৩৪ বিলিয়নের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ সম্প্রতি বলেন, আমাদের রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার এবং এতে ইডিএফসহ আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে।’

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আগামী ৬ মাসেও রিজার্ভ বাড়ার সম্ভাবনা নেই। আমাদের হাতে টাকা নেই। সামনে কি হবে জানি না।

আর সর্বশেষ গতকাল দেশের ব্যাংকগুলোর বর্তমান হালচাল নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, বলেছেন, ব্যাংকের অবস্থা কোথায় খারাপ লিখিত দিয়ে যান, আমরা খতিয়ে দেখবো।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একেকজনের একেকরকম তথ্য বিভ্রান্তির ঢালপালা ছড়িয়েছে। মানুষের মাঝে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আর এমন নানা তথ্যে শঙ্কা সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক নয় কি? খোদ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মানুষ টাকা তুলে ঘরে রাখছে। এতে ঘরে ঘরে চুরি বাড়ারও শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে, ‘আইএমএফের সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের সংজ্ঞা বিবেচনায় বাংলাদেশের মোট (গ্রস) রিজার্ভ এখন প্রায় সাড়ে ২৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু গ্রস রিজার্ভ বা মোট রিজার্ভ আসলে কী? আইএমএফের ব্যালেন্স অফ পেমেন্টস এবং ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম-৬) অনুযায়ী এটি হলো রিজার্ভ সম্পদের পরিমাণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আস্থার সঙ্গে এটা অনুসরণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো তা গ্রহণ করেনি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডলার সঙ্কট আর রিজার্ভ কমে যাওয়ায় শঙ্কা বাড়ছে অর্থনীতিতে। এখন যে রিজার্ভ আছে তা কোনোভাবেই পর্যাপ্ত বলা যাবে না। এখনো সময় আছে। চেষ্টা করলে সঙ্কট সমাধান হবে। রিজার্ভ সঙ্কট বা অন্তরায়গুলো ধরে ধরে কাজ করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য সবধরণের অর্থ পাচার ঠেকাতে হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য ড. দেবপ্রিয় ভট্টচার্য সম্প্রতি বলেন, রিজার্ভের পরিমাণ যা বলা হচ্ছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য বিপদ সঙ্কেত। রিজার্ভ কমে যাওয়ায় প্রয়োজন বা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আমদানি প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে। আরো পড়বে। একইসঙ্গে এটি টাকার বিনিময় মূল্যকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে ২০২১ সালের অগাস্ট মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিলো প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এই অবস্থা থেকে ক্রমান্বয়ে কমে এখন রিজার্ভ কত দাঁড়িয়েছে তা আসলে কেউই নির্দিষ্ট করে বলছেন না। বরং মন্ত্রী, উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আসছে বিভ্রান্তিকর তথ্য। এই বিভ্রান্তি অবসানে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। নইলে ব্যাংকিং সেক্টর পড়বে আস্থার সংকটে। এতে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশংকা অমুলক নয়।

শেয়ার করুন