২৩ জানুয়ারি ২০২৩


বই ছাড়াই চলছে মাধ্যমিকের ক্লাস!

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : নতুন শিক্ষাবর্ষের ২১ দিন পার হয়ে গেলেও সিলেট বিভাগে মাধ্যমিকে এখনো শতভাগ বই বিতরণ সম্ভব হয়নি। সিলেট বিভাগে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত মাধ্যমিক স্কুল (ইংরেজী ও বাংলা ভার্সন), দাখিল মাদ্রাসা, কারিগরি বোর্ড ও ইবতেদ্বায়ি ১ম থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত ১২ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ১ কোটি ৫৮ লক্ষাধিক কপি বইয়ের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত (১৭ জানুয়ারী) সরবরাহ হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার কপি বই। যা চাহিদার ৮০ শতাংশ বলে জানিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অফিস। তাদের হিসেবে এখনো বাকী ৩১ লাখ ৮০ হাজার কপি বই। তবে বাস্তবে মাধ্যমিকে বই সরবরাহ ৭০ শতাংশের বেশী হবেনা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। ফলে বই ছাড়াই শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীকে।

এদিকে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) দাবী এখনো ২ কোটি বই ছাপানো বাকী রয়েছে। তবে এনসিটিবি’র এই তথ্যকে ভুয়া বলে দাবী করেছে মুদ্রণ শিল্প সমিতি। তারা জানিয়েছে এখনো ৮ কোটি বই বাকী রয়েছে।

সিলেট বিভাগীয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) অফিস সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিনই বিভিন্ন উপজেলায় বই আসছে। চলতি মাসের মধ্যে শতভাগ বই স্কুল-মাদ্রাসায় পৌঁছে যাবে। ইতোমধ্যে মাধ্যমিক স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার ৮০ ভাগের উপর বই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো হয়ে গেছে। পুরাতন কারিকুলামে প্রায় শতভাগ বই চলে এসেছে। নতুন কারিকুলামের ক্ষেত্রে বই আসতে দেরি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে সিলেট বিভাগের একমাত্র সিলেট জেলায় ৯০ ভাগের উপরে বই পৌঁছানো হলেও অন্যান্য জেলায় ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ বই পৌঁছেছে। কোন কোন জেলায় বই প্রাপ্তির সংখ্যা ৬০ ভাগের মধ্যেও রয়ে গেছে।

সিলেট জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলায় মাধ্যমিক স্কুল, দাখিল মাদ্রাসা, ইবতেদ্বায়ি (১ম থেকে ৫ম) ও কারিগরি শিক্ষা মিলে ৫৯ লাখ ৫৮ হাজার ১৪৪ কপি বইয়ের চাহিদা রয়েছে। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার (১৯ জানুয়ারী) পর্যন্ত ৫৪ লাখ ২৫ হাজার ৭৫৩ কপি অর্থাৎ ৯১ শতাংশ বই পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে জেলায় ইবতেদ্বায়ি ১ম থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত শতভাগ বই বিতরণ করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে মাধ্যমিক স্কুল, দাখিল মাদ্রাসা, ইবতেদ্বায়ি (১ম থেকে ৫ম) ও কারিগরি শিক্ষা মিলে ৩১ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৮ কপি বইয়ের চাহিদা রয়েছে। এখন গত বৃহস্পতিবার (১৯ জানুয়ারী) পর্যন্ত প্রাপ্তি ১৭ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭১ কপি। এক্ষেত্রে একমাত্র ইবতেদ্বায়ি (১ম থেকে ৫ম) শতভাগ বই বিতরণ করা হয়েছে। যদিও জেলা শিক্ষা অফিস জানিয়েছে প্রতিদিনই উপজেলায় বই আসছে। রোববার পর্যন্ত বইয়ের প্রাপ্তি ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সপ্তাহে একবার বইয়ের প্রাপ্তির হিসাব নেয়া তাই দৈনিক প্রাপ্তির তথ্য জেলা অফিসের কাছে নেই।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্র আরো জানিয়েছে, মাধ্যমিক স্কুলে ২২ লাখ ৪৩ হাজার ১৬৬ কপি বইয়ের বিপরীতে গত মঙ্গলবার (১৭ জানুয়ারী) পর্যন্ত পৌঁছেছে ১১ লাখ ৯৬ হাজার ১৫৫ কপি। ইবতেদ্বায়ি ১ম থেকে ৫ম শ্রেণীতে ৩ লাখ ৯ হাজার ১৪২ কপি বইয়ের পুরো সংখ্যা অর্থাৎ শতভাগ পৌঁছানো হয়েছে। মাদ্রাসা ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬২০ কপি বইয়ের চাহিদার বিপরীতে প্রাপ্তি ২ লাখ ৯০ হাজার ৫৭৪ কপি। তবে রোববার পর্যন্ত উপজেলার হিসেবে প্রাপ্তির সংখ্যা ৮০ শতাংশ হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

হবিগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মাধ্যমিক স্কুল, দাখিল মাদ্রাসা, ইবতেদ্বায়ি (১ম থেকে ৫ম) ও কারিগরি শিক্ষা মিলে ৩১ লাখ ২ হাজার ৬৭৯ কপি বইয়ের বিপরীতে ১৯ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রাপ্তি ২৫ লাখ ২ হাজার ৬৪৯ কপি। যা চাহিদার ৮১ শতাংশ। তবে একমাত্র ইবতেদ্বায়ি (১ম থেকে ৫ম) শতভাগ বই বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মাধ্যমিক স্কুল, দাখিল মাদ্রাসা, ইবতেদ্বায়ি (১ম থেকে ৫ম) ও কারিগরি শিক্ষা মিলে ৩৬ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬২ কপি বইয়ের চাহিদা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৯ জানুয়ারী) পর্যন্ত ২০ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪২ কপি অর্থাৎ চাহিদার ৫৭ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। যদিও রোববার পর্যন্ত সেই সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধির কথা রয়েছে। কারণ প্রতিদিনই বিভিন্ন উপজেলায় বই আসা অব্যাহত রয়েছে।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্র আরো জানিয়েছে, মাধ্যমিক স্তরে ২৬ লাখ ৭০ হাজার ১৩২ কপির চাহিদার বিপরীতে প্রাপ্তি ১৩ লাখ ২২ হাজার ২৭৭ কপি অর্থাৎ ৫০ শতাংশ। দাখিল স্তরে ৫ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ কপি বইয়ের চাহিদার বিপরীতে প্রাপ্তি ৪ লাখ ১ হাজার ৮৮৫ কপি অর্থাৎ ৬৯ শতাংশ। ইবতেদ্বায়ি (১ম থেকে ৫ম) স্তরে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২০০ কপি অর্থাৎ শতভাগ বই সরবরাহ করা হয়েছে। ইংরেজী ভার্সন স্কুলে ২ হাজার ৮৮০ কপি অর্থাৎ শতভাগ বই পৌঁছানো হয়েছে। এসএসসি ভোকেশনালের ক্ষেত্রে ৪৮ হাজার ৯৮০ কপির চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ৩ হাজার ৮২০ কপি যা চাহিদার মাত্র ৮ শতাংশ। দাখিল ভোকেশনালে ৭০০ কপি চাহিদার শতভাগ সরবরাহ করা হয়েছে। কারিগরি ট্রেড স্তরে ১২ হাজার ২০ কপি বইয়ের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৬ হাজার ৬৮০ কপি যা চাহিদার ৫৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখনো দুই কোটির বেশি বই মুদ্রণই শেষ হয়নি। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের বই সোয়া দুই কোটি এবং প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ১ লাখ ১০ হাজার। সে কারণে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় বই ছাড়াই ক্লাস শুরু হয়েছে। তবে মুদ্রণশিল্প সমিতির দাবি, এখনো ৮ কোটি বই পৌঁছায়নি শিক্ষার্থীদের হাতে।

তবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম বলেছেন, ‘অধিকাংশ পাঠ্যবই চলে গেছে। সামান্য কিছু বই যায়নি। সেগুলোর মুদ্রণকাজ চলছে। জানুয়ারির মধ্যেই সব বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে।’

জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি সংকট তৈরি হয়েছে নতুন শিক্ষাক্রমের বই নিয়ে। প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বইয়ের কারিকুলাম পরিবর্তন হওয়ায় পুরোনো বই পড়ানো যাচ্ছে না বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বইয়ের জন্য এক ধরনের হাহাকার তৈরি হয়েছে। কবে নাগাদ সব বই পাওয়া যাবে তা কেউ বলতে পারছে না। এই সুযোগে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিক্রির মহোৎসবে মেতে উঠেছেন। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থান থেকে এরই মধ্যে বিনামূল্যের বই বিক্রি ও পাচারের অভিযোগ এসেছে।

যদিও এনসিটিবিরই আরেকটি সূত্র জানায়, গত ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাথমিকে ৮ কোটি ৫০ লাখ আর মাধ্যমিকে ২১ কোটির ২০ লাখ বই সরবরাহ করা হয়েছে। গত তিনদিনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের আরও ৪০ লাখ বই চলে গেছে। সেই হিসাবে এখনো দুই কোটির বেশি বই পৌঁছানো বাকি রয়েছে। এবার সরকার সারাদেশে প্রায় ৩৩ কোটি ৯০ লাখ বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিতরণ করবে।

মুদ্রণ সংশ্লিষ্টরা জানান, পাঠ্যবই সরবরাহে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এজন্য বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা অতিরিক্ত এক থেকে দুই মাস সময় চেয়েছে। এর মূল কারণ কাগজ সংকট। সবচেয়ে বেশি বই আটকে আছে এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বারোতোপা, অগ্রণী, ভয়েজার, দশদিশা, এসআর, প্রমাসহ অন্তত ২৪ প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে।

মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘২১ জানুয়ারি পর্যন্ত মাধ্যমিকের পাঁচ কোটি ও প্রাথমিকের তিন কোটি বই বাকি রয়েছে। তার মধ্যে মোটাদাগে বারোতোপা প্রিন্টিং প্রেসে এক কোটি, অগ্রণী প্রেসে দুই কোটি বই এখানো বাকি রয়েছে। এছাড়াও ছোট-বড় অনেক প্রেস এখনো বই পাঠাতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘আগামী মার্চেও এসব পাঠানো সম্ভব হবে না। কাগজ সংকটের নামে পরিদর্শন ছাড়াই নিম্নমানের ছয় কোটির অধিক বই ছাড়পত্র দিয়ে উপজেলায় পাঠানো হয়েছে। এনসিটিবি বই পাঠানোর যে হিসাব দিচ্ছে তা ঠিক নয়। অনেক উপজেলায় বই না পাঠিয়ে কাগজ-কলমে সেখানে পাঠিয়েছে বলে হিসাব দেখানো হচ্ছে।’

এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘এখনো যারা বই দিতে পারেনি তাদের এ মাসের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে। এর বাইরে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে না। এরপরও যারা দেরি করে বই দেবে, তাদের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সিলেট বিভাগীয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অফিস (মাউশি) এর আঞ্চলিক উপপরিচালক জাহাঙ্গীর কবীর আহাম্মদ দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, মাধ্যমিক স্তরের বই প্রতিদিনই আসছে। তাই প্রাপ্তির সংখ্যাটা প্রতিদিনই পরিবর্তিত হচ্ছে। আমাদের কাছে তথ্য আছে অধিকাংশ জেলায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বই চলে এসেছে। ইতোমধ্যে ইবতেদ্বায়ি (১ম থেকে ৫ম) স্তরে সব জেলায় শতভাগ বই সরবরাহ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পুরাতন কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তেমন সমস্যা নেই। তবে নতুন কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের বই নিয়ে সঙ্কটটা বেশী। এই সমস্যা শুধু সিলেট নয়, সারাদেশেই বিদ্যমান রয়েছে। জানুয়ারী মাসের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরে শতভাগ বই পৌঁছে যাবে বলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছেন। আশা করছি চলতি মাসেই বইয়ের সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

শেয়ার করুন