আজ মঙ্গলবার, ২৬শে মে, ২০২০ ইং

“অপারেশন আতিয়া মহল” আতঙ্কের দিনগুলি

  • আপডেট টাইম : March 24, 2018 12:44 PM

নিজস্ব প্রতিবেদক : আতিয়া মহলে জঙ্গি বিরোধী অভিযানের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০১৭ সালের ২৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গিবিরোধী অভিযান চলে। পাঁচ ও চারতলা দুটি ভবন নিয়ে আতিয়া মহল। পাঁচতলা ভবনের নিচতলার চতুর্থ ফ্ল্যাটে আস্তানা গেড়েছিল জঙ্গিরা।

গোয়েন্দা সূত্রে খবর পেয়ে ২৪ মার্চ গভীর রাতে (২৩ মার্চ দিবাগত রাত) আতিয়া মহল ঘিরে ফেলে পুলিশ। পরে অভিযানে যোগ দেয় বিশেষায়িত বাহিনী সোয়াট দলের সদস্যরা। তবে ভবনের ভেতর চূড়ান্ত অভিযান চালায় সেনা কমান্ডোরা। অভিযান চলাকালে দুই দফা বোমা বিস্ফোরণে র‌্যাব, পুলিশের কর্মকর্তাসহ নিহত হন সাতজন। অভিযান শেষে আতিয়া মহল থেকে চার জঙ্গির লাশ উদ্ধার করা হয়।

আতিয়া মহলের মালিক উস্তার আলী। তিনি সিলেট আমদানি-রফতানি অফিসে ক্লার্ক হিসেবে যোগ দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে যান। বছর পাঁচেক আগে নিজের স্ত্রীর নামে আতিয়া মহল নির্মাণ করেন উস্তার আলী।

জঙ্গি আস্তানা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই চলতি বছরের ২৪ মার্চ (২৩ মার্চ দিবাগত রাত ৩টার দিকে) আতিয়া মহল ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জঙ্গিদের ফ্ল্যাটের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। শুরু হয় বাংলাদেশে এ যাবতকালে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা রুদ্ধশ্বাস জঙ্গিবিরোধী অভিযান।

অভিযান শুরুর দিন (২৪ মার্চ) সকাল ৭টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি টের পায় আতিয়া মহলের নিচ তলার ফ্ল্যাটে থাকা জঙ্গিরা বিস্ফোরণ ঘটায়। সকালে পুলিশের সাথে যোগ দেয় র‌্যাব, ডিবি, এসবি, পিবিআইয়ের সদস্যরা। আতিয়া মহলের চারতলা ভবনের ফ্ল্যাটে থাকা সকল বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু পাঁচ তলা ভবনটির নিচ তলায় জঙ্গি আস্তানা থাকায় ওই ভবনের বাকি ২৯টি ফ্ল্যাটে থাকা বাসিন্দাদের সরিয়ে আনা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

ভবনের ভেতরে থাকা জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে অভিযান শুরুর দিনই পুলিশ একাধিকবার হ্যান্ড মাইকে আহবান জানায়। সেদিন বেলা ১টার পর জঙ্গিদের ফ্ল্যাট থেকে নারী ও পুরুষ কণ্ঠে উচ্চস্বরে বলা হয়, ‘তোমরা (পুলিশ) শয়তানের পথে আছো, আমরা আল্লাহর পথে। দেরি কেন, দ্রুত সোয়াট পাঠাও। আমাদের সময় কম।’

সেদিন বিকেলে ঢাকা থেকে আতিয়া মহলে অভিযান চালাতে আসেন সোয়াট দলের সদস্যরা। ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন তারা। সেদিন রাত ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো ইউনিটের একটি দল ঘটনাস্থলে আসে। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ফিরে যায় তারা।

২৫ মার্চ ২০১৭ সকাল ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর শতাধিক প্যারাকমান্ডো আসেন শিববাড়িতে। ১৭ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনোয়ারুল মোমেনের নেতৃত্বে কমান্ডোদের ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ শুরু হয় সোয়া ৯টায়। অভিযানের শুরুতেই পাঁচতলা ভবনে ২৯টি ফ্ল্যাটে আটকা পড়া ৭৮ বাসিন্দাকে উদ্ধার করা হয়। তন্মধ্যে ৩০ জন পুরুষ, ২৭ জন মহিলা আর ২১টি শিশু ছিল।

সেদিন বেলা ২টার দিকে জঙ্গিদের ফ্ল্যাট ঘিরে শুরু হয় কমান্ডোদের অভিযান। আতিয়া মহলের আশপাশ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় সাংবাদিক, উৎসুক জনতাসহ সবাইকে। অভিযানের শুরু থেকেই দফায় দফায় গুলি আর বিস্ফোরণের প্রচ- শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো শিববাড়ি এলাকা।

সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অভিযানের বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন সেনা সদর দপ্তরের গোয়েন্দা পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান। তাঁর ব্রিফিং শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আতিয়া মহলের প্রায় আড়াই শ’ গজ দূরে দুই দফা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলেই নিহত হন চারজন। হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যান আরও দুজন। গুরুতর আহত হওয়া র‌্যাব সদর দপ্তরের ইন্টিলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল আবুল কালাম আজাদও পরে হাসপাতালে মারা যান। বিস্ফোরণে অন্তত ৪০ জন আহত হন।

দুই দফার এ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা মানুষের মধ্যে আতঙ্ককে আরো বাড়িয়ে দেয়। সিলেট ছাড়িয়ে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম আতিয়া মহলে জঙ্গিবিরোধী অভিযানকে ফলাও করে প্রচার করতে থাকে।

সেদিন মধ্যরাতেই আতিয়া মহলের আশপাশের প্রায় দুই তিন বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

২৬ মার্চ ২০১৭ সকাল ৯টা ৫৭ মিনিট থেকে শুরু হয় বিস্ফোরণ আর গুলির টানা শব্দ। সেদিন বেশ কয়েকবার আতিয়া মহলে কমান্ডোর বুলেট প্রুফ আর্মারড ভেহিক্যাল ঢুকতে-বেরোতে দেখা যায়। বিকেলে সেনা সদর দপ্তরের গোয়েন্দা পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান জানান, আতিয়া মহলে দুই জঙ্গি নিহত হয়েছে। ভেতরে আরো এক বা একাধিক জীবিত জঙ্গি থাকতে পারে। জঙ্গিরা ভবনের ভেতর বিস্ফোরক ছড়িয়ে রাখায় অভিযানে সময় লাগছে।

২৭ মার্চ ২০১৭ সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ফের শুরু হয় গোলাগুলি। এদিন কয়েকবার আতিয়া মহল থেকে গুলি-বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে। দুপুর নাগাদ ভবন থেকে ধোয়াও উড়তে দেখা যায়। সন্ধ্যায় প্রেস ব্রিফিংয়ে ফখরুল আহসান জানান, সেনা কমান্ডোদের অভিযানে চার জঙ্গি নিহত হয়েছে। তন্মধ্যে পুরুষ তিন জন, মহিলা একজন। ভেতরে আর জীবিত জঙ্গি নেই।

২৮ মার্চ ২০১৭ আতিয়া মহল পুলিশের কাছে বুঝিয়ে দেয় সেনাবাহিনী। নিহত চার জঙ্গির লাশও পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া সেদিন উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আতিয়া মহলের ভেতরে বিভিন্ন বিস্ফোরক সনাক্ত করে সেনা কমান্ডোরা।

সেদিন সন্ধ্যায় প্রেস ব্রিফিংয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান বলেন, অ‘ভিযান সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। এ অভিযান মাইলফলক হয়ে থাকবে।’

(আজকের সিলেট/২৪ মার্চ/ডি/এসসি/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ