আজ শুক্রবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

সিসিক নির্বাচন : আরিফ কি মান্নান আর মনিরের পথে?

  • আপডেট টাইম : April 16, 2018 6:00 AM

বিশেষ প্রতিবেদক : তারা দুজনেই বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। একজন হলেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অধ্যাপক এমএ মান্নান। অন্যজন খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুজ্জামান মনি। একজনের ভোটের ব্যবধান ছিল এক লাখ, অন্যজনের ৬০ হাজার। আওয়ামী লীগের জাঁদরেল প্রার্থীদের এমন বিশাল ব্যবধানে হারিয়েই বিএনপির এ দুই প্রার্থী নগরভবনের চাবি পেয়েছিলেন। গাজীপুরের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এমএ মান্নান।

আর মনিরুজ্জামান মনি আওয়ামী লীগের দখল থেকে কেড়ে নেন খুলনা সিটি করপোরেশনের কর্তৃত্ব। মেয়র পদে থাকাকালীন সময়ে তারা দুজনেই জেল খেটেছেন নাশকতা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন অভিযোগে। তবুও তাদের দুজনের কারো উপরই এবার আস্থা রাখতে পারেনি দল। দুই সিটি করপোরেশনেই নতুন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। দুই ক্ষেত্রেই তৃণমূলের মতামত গুরুত্ব পাওয়ায়ই এমনটি ঘটেছে বলে দলটির বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

প্রার্থী নির্বাচনে তৃণমূলের মতামতের গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়টি দলের মধ্যে চাঙ্গাভাব এনে দেবে বলেই মনে করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীদের অনেকেই। তবে বিষয়টি কারো কারো কপালে চিন্তার রেখাও এঁকে দিয়েছে।

‘হেভিওয়েট’ তকমা থাকলেই দলের মনোনয়ন পাওয়া যে নিশ্চিত নয় সেটারই ইঙ্গিত দিয়েছে গাজীপুর ও খুলনায় প্রার্থী নির্বাচনে। এ দুই সিটিতে বর্তমান মেয়রদের বাদ দিয়ে নতুন প্রার্থী বেছে নেয়ার বিষয়টি রেড সিগন্যাল হয়ে দেখা দিয়েছে সিলেটের মেয়র বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরীর জন্যও। গাজীপুর ও খুলনার মেয়রদের মতো একই গল্প রয়েছে আরিফেরও।

২০১৩ সালের ১৫ই জুন অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ও সে সময়কার মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। পৌরসভা আমলের পর সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রতিষ্ঠা থেকেই নগরভবনের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা বদরউদ্দিন আহমদ কামরান।

কিন্তু গেল নির্বাচনে আরিফের কাছে তিনি হার মানেন ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে। নির্বাচনে আরিফ ভোট পেয়েছিলেন ১ লাখ ৭ হাজার ৩৩০টি। আর কামরান পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ১৭৩টি ভোট। গাজীপুর ও খুলনার মেয়রের সঙ্গে আরিফের গল্পে আরো একটি মিল আছে। তিনিও মেয়র থাকাকালীন সময়ে জেল খেটেছেন হত্যা-বোমাবাজির অভিযোগে।

‘তৃণমূলের মতামত’ আরিফুল হক চৌধুরীর জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। সিলেটের বিএনপি সংশ্লিষ্ট অনেকেরই অভিযোগ, আরিফুল হক তৃণমূল থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। ‘সরকারঘেঁষা’ বলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি দলকে খুশি রাখতে আরিফ দলের কর্মসূচি থেকে নিজেকে যথাসম্ভব ‘বাঁচিয়ে’ রাখেন বলেও কারও কারও অভিযোগ। তবে কি মেয়র আরিফ কি মান্নান আর মনিরের পরিনতির দিকে এগুচ্ছেন? এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে।

এমন পরিস্থিতিতে ইদানীং একটু গা-ঝাড়া দিয়ে আরিফুল হক তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করছেন। আগে দলীয় কর্মসূচিতে এতটা সক্রিয় না থাকলেও এখন তাকে সামনের কাতারেই দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সিলেটে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশেও আরিফুল হকের সক্রিয় অংশগ্রহণ অনেকেরই নজর কেড়েছে। তবে খুলনা ও গাজীপুরে প্রার্থী বদল ঠিকই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে-আরিফ কি পারবেন দলের সমর্থন ধরে রাখতে?

আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে আছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও সিটি কর্পোরেশনের ৪নং ওয়ার্ডের তিনবারের কাউন্সিলর প্যানেল মেয়র (১) রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। খুলনা ও গাজীপুরে প্রার্থী বদলকে তারা দুজনেই গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ হিসেবেই দেখছেন। সিলেটের ক্ষেত্রেও এমনটি হলে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই বলেই তাদের বক্তব্য।

সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, তৃণমূল থেকে নতুন মুখের দাবি উঠেছে। তৃণমূলের এ চাওয়ার বিষয়টি কেন্দ্রও অবগত রয়েছে। গাজীপুর ও খুলনার মতো সিলেটেও তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হলে এখানেও নতুন মুখই আসার কথা। জানালেন, তৃণমূলের চাওয়াকে মূল্য দিতে তিনিও মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

সিসিকের টানা তিনবারের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র (১) রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, দলের তৃণমূল নেতাকর্মী সহ সাধারণ জনগন চান যে আমি যেন মেয়র পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করি। আমিও দল এবং জনগনের জন্য আমার সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করছি। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তবে অবশ্যই ধানের শীষ প্রতিক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিব এবং বিজয় ঘরে আসবে ইনশাআল্লাহ।

তবে সকল অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমি তৃণমূলেরই নেতা। তৃণমূলের সমর্থনেই আমি আজ এ পর্যন্ত এসেছি। মাঠের নেতাকর্মীরা সব সময়ই আমার পাশে। আমিও সব সময়ই তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আরিফ আশাবাদী এবারো তিনিই দলের মনোনয়ন পাবেন।

আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমি কারো সঙ্গে কখনো আপস করিনি। এ কারণে অন্যদের মতো বড় ব্যবসাও বাগাতে পারিনি, সিআইপিও হতে পারিনি।

গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশনের আগের নির্বাচনের খতিয়ান এখানে টেনে আনা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ২০১৩ সালের ৬ই জুলাই দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশনে প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান এক লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লা খানকে। এমএ মান্নান ভোট পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৪৪টি। অপরদিকে আজমতউল্লা খান পেয়েছিলেন ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৭ ভোট।

একই বছরের ১৫ই জুন অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ও সে সময়কার মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেককে পরাজিত করেছিলেন ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে। মনিরুজ্জামান মনি পেয়েছিলেন ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৩ ভোট। আর তালুকদার আব্দুল খালেক পেয়েছিলেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৪২২ ভোট।

(আজকের সিলেট/১৬ এপ্রিল/ডি/কেআর/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ