আজ শুক্রবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং

ছাত্রলীগে অস্থির সিলেটের শিক্ষাঙ্গন

  • আপডেট টাইম : July 23, 2017 6:05 AM

নিজস্ব প্রতিবেদক : ছাত্রলীগ নামধারী কতিপয় নেতাকর্মীর উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অস্থির সিলেটের শিক্ষাঙ্গন। গ্রুপিং রাজনীতির কারণে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে ঘটছে সংঘাত। আর এই সংঘাত থেকে ঘটছে প্রাণহানির মতো ঘটনাও। তাছাড়া প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নগরীসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়াও দিচ্ছেন নেতাকর্মীরা।

সর্বশেষ গত সপ্তাহে নিজেদের অন্তঃদ্বন্দ্বের বলি হলেন বিয়ানীবাজারের ছাত্রলীগ কর্মী খালেদ আহমদ লিটু (২৫)। প্রথম দিকে তাকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করলেও পরে অস্বীকার করছে সিলেট জেলা ছাত্রলীগ। যদিও এনিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার ঝড় উঠেছে।

গত সোমবার (১৭ জুলাই) কলেজ ক্যাম্পাসে আধিপত্য নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের উপজেলা সভাপতি আবুল কাশেম পল্লব ও জেলা ছাত্রলীগের আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক পাভেল সমর্থিত গ্রুপের নেতাকর্মীদের মাঝে সংঘর্ষের পর শ্রেণিকক্ষে বসে সভা করছিলেন পাভেল গ্রুপের নেতাকর্মীরা। এ সময় কলেজের জানালা দিয়ে গুলি ছোঁড়া হলে ওই গ্রুপের কর্মী লিটু মারা যায় বলে তার গ্রুপের লোকজনের অভিযোগ।

যদিও লিটু ছাত্রলীগের কেউ নন দাবি করে তাকে বহিরাগত ‘সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করেছে সিলেট জেলা ছাত্রলীগ।

এক ব্যাপারে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রায়হান চৌধুরী প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘যে ছেলে ছাত্র নয় সে ছাত্রলীগ হলো কিভাবে? তার দাবি- নিহত লিটু নিজেই অস্ত্র নিয়ে কলেজে যায়। এছাড়া কলেজ প্রশাসনের উদৃতি দিয়েও লিটুতে সন্ত্রাসী বলে উল্লেখ করেন ছাত্রলীগের এই নেতা।

তিনি আরও জানান, বছরখানের পূর্বে বিয়ানীবাজার কলেজে ছাত্রলীগের সবধরণের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বলা হয়েছিল, ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে কেউ কুকর্ম করলে তার দায়ভার আমরা নেব না। সুতরাং লিটু হত্যা তাদের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে হয়েছে, এর দায় ছাত্রলীগ নেবে না বলেও দাবি তার।

তবে জেলা ছাত্রলীগের এমন মন্তব্যের পর নেতৃবৃন্দকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করে তাদের বক্তব্যের বিরোধীতা করেছেন জেলা ছাত্রলীগের আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক পাভেল। তিনি নিহত লিটুকে নিজের গ্রুপের একজন কর্মী দাবি করে বলেন, লিটু ছাত্রলীগের কর্মী, সে ‘সন্ত্রাসী’ নয়। তার হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবিও জানান তিনি।

এর আগে গত ১২ জুলাই রাতে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের ক্যান্টিনে ‘ফাও’ খাওয়া নিয়ে ছাত্রলীগের সঞ্জয় ও টিটু গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার জেরে উভয় গ্রুপের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

পরদিন সকালে টিটুর নেতৃত্বে কলেজ ছাত্রাবাসে ব্যাপক তাণ্ডব চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা ছাত্রাবাসের ৩৯টি কক্ষ ভাঙচুর করে। এরপর থেকে ছাত্রাবাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ওইদিন নগরীর কুমারগাঁও বাস স্টেশনে এক ছাত্রকে মারধরের সময় ছাত্রলীগের ৮ নেতাকর্মীকে পাকড়াও করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয় জনতা।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন বলেন, ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সবসময়ই জিরো টলারেন্স অবস্থানে রয়েছে। সন্ত্রাসীদের কোন দল নেই। ছাত্রলীগের কেউ অন্যায় করে পাড় পাবে না। সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাস ভাঙচুরের ঘটনার পরেই অপরাধীদের ধরতে পুলিশকে আহ্বান জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।’

তিনি আরও জানান, বিয়ানীবাজারে নিহত ব্যক্তি ছাত্রলীগের কর্মী নয়, তিনি একজন মোবাইল মেকানিক। আর এই ঘটনায় বহিরাগতরাই জড়িত বলে দাবি করেন তিনি। যদিও ওই ঘটনার পরদিন সিলেটের একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি নিহত লিটুকে ছাত্রলীগ কর্মী উল্লেখ করে ওই ঘটনায় দোষীদের গ্রেফতার করতে প্রশাসনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রায়হান চৌধুরী আরও জানান, ছাত্রলীগের নামে যারা উচ্ছৃঙ্খলতা চালাচ্ছে-তাদের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে।

তিনি জানান, ছাত্রলীগের নামে কিছু ‘সুযোগ সন্ধানী লোক’ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এসব অপকর্ম চালাচ্ছে।

তিনি জানান, যারা এসব অপকর্মের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে। তিনি জানান, এরই মধ্যে সংগঠনের সব ইউনিটকে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলতায় না জড়াতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, এর আগে বিভিন্ন সময়ে সমালোচিত হয়েছিল সিলেট ছাত্রলীগ। গত এপ্রিলে মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলম তুষার আহত হওয়ার জের ধরে ওইদিন সন্ধ্যায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান চৌধুরী মিজানের বাসায় হামলা-ভাঙচুর চালায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা।

এছাড়া, গত বছর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও মদন মোহন কলেজে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে নিজ দলের কর্মী খুনের ঘটনাও ঘটেছিল। এছাড়া জিন্দাবাজারে ব্যবসায়ী হত্যার ঘটনায় জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি সুলায়মান চৌধুরীর সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টিও বেশ আলোচনায় আসে। যার ফলশ্রুতিতে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল।

২০১৩ সালে সিপিবি-বাসদের সমাবেশে হামলার পর জেলা ছাত্রলীগের কমিটি স্থগিত করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। বহিষ্কার করা হয় তৎকালীন জেলা ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপুসহ বেশ কয়েকজনকে।

২০১৬ সালে টিলাগড়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে সংঘর্ষের পর জেলা সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ ও সেক্রেটারি রায়হান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটির কার্যক্রম ফের স্থগিত করা হয়। তবে চলতি বছরের শুরুতেই কেন্দ্র থেকে কমিটির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

 

 

(আজকের সিলেট/২৩ জুলাই/ডি/এসসি/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ