আজ শনিবার, ৭ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

সিলেটে শুরু হয়েছে ‘ফুরির বাড়ি ইফতারি’

  • আপডেট টাইম : May 28, 2018 2:40 PM

নিজস্ব প্রতিবেদক : ‘অত দাম কিতার লাগী বা। ফুরির বাড়ি ইফতারি না দিলে ওইত নায়, দাম হইলেও কিনতাম হুইব। আগেতো ঘরের বেটিনতে বাড়িত বানাইয়া দিলাইতা অকনোর বেটিনটে ইতা বানাইন না এর লাগী বাজার তনে অত দাম দি কিইনা ফুরির বাড়ি ইফতারি দেওয়া লাগে।’ (এত দাম কেন। মেয়ের শ্বশুর বাড়ি ইফতারি না দিলে নয়, তাই দাম হলেও কিনতে হবে। আগে ঘরের মেয়েরা এই ইফতারি বানিয়ে দিত, এখন বানায় না একারণে বাজার থেকে এত দামে কেনা লাগে)।

নগরীর বাজার এলাকায় সিলেট অঞ্চলের নিয়ম অনুযায়ী ফুরির বাড়ি (মেয়ের শ্বশুর বাড়ি) নিয়ে যাওয়ার জন্য ইফতারি কিনতে আসা এক বৃদ্ধ পিতা এভাবেই সিলেটের আঞ্চলিক বাসায় বিক্রেতার সাথে কথাগুলো বলছিলেন।

অতিথি আপ্যায়নে সিলেটের মানুষের রয়েছে দারুণ সুখ্যাতি। তেমনি অতিথি হিসেবে কারও বাড়িতে যাবার সময় নানা প্রকার মৌসুমী ফল-ফলারি, মিষ্টি-মিঠাই বা পছন্দমত যে কোন জিনিস সঙ্গে করে নেয়ার রেওয়াজও এখানে অনেক পুরনো। বিশেষ করে সিলেটের আপন ঐতিহ্য- রমজান মাসে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ইফতারি নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ। সিলেটি ভাষায় এটাকে ‘ফুরির বাড়ি ইফতারি’ বলা হয়।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সিলেট অঞ্চল থেকে ফুরির বাড়ির ইফতারি দেয়ার রেওয়াজে পরিবর্তন এসেছে। আগে দিনে রমজান মাস এলে বাড়িতে বানানো ইফতারি থালা সাজিয়ে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যেতেন তার অভিভাবকরা। কিন্তু আগের মতো বাড়িতে বানানো ইফতারি আর মেয়ের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় না। এখন সে স্থান দখল করেছে হাট-বাজারে বানানো নানা রং চংয়ের ইফতারি।

প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, সিলেট অঞ্চলে নতুন জামাই বাড়িতে তিন দফায় ইফতারি দেয়া হয়। প্রথম দফায় প্রথম রমজানে দিতে হয়। ওই দিন শুধু ঘরে তৈরি করা পিঠা-পায়েসসহ ফল-ফলারি নিয়ে যাওয়া হয়।

ইফতারি আইটেমের মধ্যে রয়েছে- হান্দেশ, ছই পিঠা, চিতল পিঠা, রুটি পিঠা, ভাপা পিঠা, ঢুপি পিঠা, খুদি পিঠা, ঝুরি পিঠা, পানি পিঠা, চুংগা পিঠা, তালের পিঠা, পাড়া পিঠা, নুনের ডোবা, নুনগরা এবং নারিকেল সমেত তৈরি পবসহ আরো নানা ধরনের পিঠা। এছাড়াও খেজুর, আপেল, আম তো থাকেই।

ইফতার সামগ্রীর মধ্যে মিষ্টি, জিলাপী, নিমকী, খাজা, আমির্তি, বাখরখানি ছাড়াও মৌসুমী ও দেশি-বিদেশি ফল, চানা, পিঁয়াজু, পোলাও, চপ, বেগুনী ও শাকের তৈরি বিভিন্ন ধরনের বড়া ইত্যাদি দিয়ে সাজানো খাঞ্চা (বড় থাল) নেয়া হয়।

আবার কোথাও মেয়ের জামাই, মেয়ের শ্বশুর- শাশুড়ীর জন্য আলাদা করে থালা সাজিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। এখন বাজারের তৈরি ইফতারি সাজিয়ে নেয়া হয়। রোজার শেষ দিকে আবারও যান কনের দাদা-নানা, বাবা-চাচা, ভাই অথবা নিকট আত্মীয় যে কেউ। এ সময় মেয়ের শ্বশুর বাড়ির সকলকে ঈদে বেড়াতে যাওয়ার দাওয়াত দেয়া হয়। মেয়ের বাড়ি থেকে যে ইফতারি নিয়ে যাওয়া হয় তা বাড়ির এবং পাড়া-পড়শীর ঘরে ঘরে বিলি করা হয়।

আর মেয়ের বাড়ি থেকে যে ইফতারি নিয়ে যাওয়া হয় সেই ইফতারি মেয়ের জামাইর ইফতারের পূর্বেই বাড়ির এবং পাড়া-পড়শির প্রত্যেকের ঘরে ঘরে বিলি করা হয়। ইফতারের পরে মেজবানের ভুরিভোজের জন্য আগেভাগেই জবাই করা হয় ঘরে পোষা বড় মোরগ বা মুরগি। থাকে সালাদ, দইসহ বিভিন্ন আইটেম।

এদিকে বিয়েতে যিনি ‘উকিল পিতা’ হন, তার পক্ষ থেকেও ইফতারি দেওয়ার ব্যাপক প্রচলন সিলেটে দেখা যায়। অনেকে ইফতারি দেওয়ার পূর্বে কৌশলে খবর নেন অন্য বেয়াইর (মেয়ের প্রকৃত পিতা) বাড়ি থেকে কোনো ধরনের বা কি পরিমাণ ইফতারি এসেছে।

(আজকের সিলেট/২৮ মে/ডি/এসটি/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ