আজ রবিবার, ৮ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

নগরীতে সংকুচিত হচ্ছে খেলার মাঠ, প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছে শিশুরা

  • আপডেট টাইম : August 1, 2018 6:00 AM

অতিথি প্রতিবেদক : সিলেটে শিশুদের নির্মল আনন্দের জন্য খেলার মাঠ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বাইরে খেলার সুযোগ না থাকায় তাদের শৈশব কম্পিউটার, ট্যাব আর টেলিভিশনের মধ্যে বন্দী হয়ে পড়ছে। যেসময় একজন কিশোরের মাঠে খোলা আকাশ দেখার কথা, সেই সময়টা সে পার করছে বারান্দার গ্রীলের ভেতরে একা একা। চিকিৎসকদের মতে, এজন্য শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তার বিকাশ। একই সাথে বিপদগামী হয়ে উঠছে শিশুর সুন্দর আগামী।

সিলেটে সরকারি আলিয়া মাদরাসার মাঠ, ওসমানী মেডিকেল কলেজ মাঠ, এমসি কলেজ মাঠ ছাড়াও একসময় প্রতিটি পাড়া মহল্লা এবং স্কুল কলেজে খেলার মাঠ ছিলো। স্কুল কলেজে শ্রেণী কার্যক্রম শেষে শিশু কিশোররা খেলায় মেতে উঠতো। তারপর কাদামাটি মাখা শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরতো। আর পাড়া মহল্লার মাঠগুলোতে প্রতিদিন বিকেল মানেই ছিলো খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকা। নিয়মিত খেলাধুলা ছাড়াও মাসে মাসে হতো টুর্ণামেন্টের আয়োজন। মাইক বাজিয়ে, নানা রঙের পতাকা দিয়ে মাঠ সাজানো হতো। পুরস্কার হিসেবে টেবিল সাজিয়ে রাখা হতো সিল, মেডেল আর ট্রফি দিয়ে। খেলাপ্রিয় মানুষ মাঠের বাইরে এমনকি রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেলা দেখতেন।

নগর সভ্যতায় সেই সোনালী দিন কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। বিশেষ করে লামাবাজার মসজিদ মাঠ, কুয়ারপাড়, লালাদিঘীর পাড়, শেখঘাট কলোনী, মজুমদারী, কালাপাথর, সাপ্লাই, পিচের মুখ, মূক বধির স্কুল, চারাদিঘীর পাড় ও শাহী ঈদগাহ মাঠ ছিলো সবার পরিচিত। এই মাঠগুলোতে ছোট-বড় সবাই খেলতো। শুক্রবার হলে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তো। কিন্তু খেলাধুলার সেই মাঠগুলো আজ নিশ্চিহ্ন। যেগুলো আছে সেগুলোতে খেলাধুলার চর্চা হয়না। অধিকাংশ খেলার মাঠে গড়ে উঠেছে স্থাপনা।

কোনটি আবার দখল হয়ে গেছে। খেলার মাঠ না থাকায় অনেক বাসা বাড়ির ঝুঁকিপূর্ণ ছাদই শিশু কিশোরদের এখন একমাত্র আশ্রয়। তারপর সব হারিয়ে শহরের মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে সরকারি মাঠ আলিয়া মাদরাসা সংলগ্ন মাঠ। একসময় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কলরবে দিনভর মুখর থাকত এই মাঠটি। বিশেষ করে বিকেল হলেই স্কুল মাদরাসার শিশু-কিশোরদের ছোটাছুটি থাকত। জমতো ফুটবল আর ক্রিকেটের অনুশীলন। প্রতিদিন বহু শিশু-কিশোর খেলাধুলায় মেতে উঠত সেখানে।

কিন্তু বছরের অধিকাংশ সময় এই একটিমাত্র মাঠও নানা আয়োজনের জালে বন্দী থেকে যায়। বর্তমানে মাঠের অনেক কোণে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু অস্থায়ী টং দোকান। প্লাস্টিকের বোতল পলিথিন বর্জ্যে অনেক সময় মাঠ ভরে যায়। অনেকে এই মাঠকে গাড়ির পার্কিং হিসেবেও ব্যবহার করছেন। পাড়া মহল্লায় ব্যক্তিমালিকানাধীন খালি যে জায়গাগুলোকে মাঠ হিসেবে ব্যবহার করা হতো সেগুলোতে এখন ওঠেছে সারি সারি দালান।

একইসাথে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে অনেক জায়গা ভরাট হয়ে গেছে। মাঠ, জলাশয়, হাওর ভরাট করেও গড়ে তোলা হচ্ছে দালান কোঠা। তারপর বাইরের মাঠ, খোলা প্রাঙ্গন হারিয়ে শিশুরা একটু সময় বাসার ছাদের উপর নিরিবিলি সময় কাটাবে তারও কোনো ফুসরত নেই। বাসা বাড়ির এক চিলতে ছাদটুকুও চলে গেছে মোবাইল টাওয়ারের দখলে।

এতে মানুষ আর্থিকভাবে লাভবান হলেও শিশুরা হারাচ্ছেন সুস্থ পরিবেশে জীবন-যাপনের অধিকার। একসময় মাঠ ছাড়াও নগরীর প্রতিটি এলাকায়, বাসা বাড়িতে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে অপরিকল্পিতভাবে দালান-কোঠা নির্মাণ ও বিভিন্নভাবে দখলের ফলে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সেসব খোলা জায়গা। মাঠ না থাকার ফলে শিশু-কিশোররা ট্যাব, মোবাইল আর টেলিভিশন নির্ভর হয়ে পড়ছে।

ফলে, তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দূরন্তপনার শৈশব, অবারিত মাঠে ছুটাছুটির স্মৃতি। অথচ সিটি কর্পোরেশনের সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ থাকার কথা। কিন্তু নগর বাস্তবতায় সেগুলো এখন কল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। যে কয়টি স্কুল কিংবা কলেজে মাঠ আছে সেগুলোতে নিয়মিত খেলাধুলার চর্চা নেই। বছরে একবার বার্ষিক খেলাধুলার নিয়মেই তারা বন্দী। মুক্ত আকাশের নিচে নির্মল আনন্দের পরিবেশ না থাকায় যান্ত্রিকভাবে বড় হয়ে উঠছে তারা।

নগর সভ্যতায় খেলার মাঠ হারিয়ে যাওয়ায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। শিশু-কিশোররা বন্দী হয়ে পড়ছে চার দেয়ালের সীমানায়। বাইরে খেলার সুযোগ না থাকায় ঘরের তালাবদ্ধ গ্রীলের ভেতরই তারা বড় হচ্ছে, আর ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে তাদের পৃথিবী। সুজনের সাবেক সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরীর সাথে এ প্রসঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, এক সময় সব এলাকার বাসাবাড়িতে সুপরিসর প্রাঙ্গন ছিলো। এখন প্রাঙ্গন দূরের কথা- লাশ বাড়ি থেকে বের করার মতো জায়গাও মিলেনা অনেক বাসা বাড়িতে। এই অবস্থায় শিশুর খেলাধুলা করা কল্পনাও করা যায়না।

অন্যদিকে, অপরিকল্পিত নগরায়নতো আছেই। যোগাযোগ করা হলে ডা. তায়েব আহমদ জানান, খেলাধুলা না করলে শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সে এক সময় ঘরের ভেতর বন্দী থেকে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। খেলাধুলা না করায় অনেক সময় তারা সামাজিকতাও হারিয়ে ফেলে। জড়িয়ে পড়ে অপরাধ কর্মকান্ডে। কথা হলে ডা. মুমিনুল হক জানান, শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা খুবই জরুরী। খেলাধুলা না করায় শিশুরা বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে। তারা এখন সারাক্ষণ ডুবে থাকে কম্পিউটার. ট্যাব, মোবাইল আর ল্যাপটবের মধ্যে। এতে ঘরে ঘরে শিশুরা জটিল সমস্যায় ভুগছে।

সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার কোষাধ্যক্ষ ও লন্ডন টাইগার্স এর কো-অর্ডিনেটর মো. সিরাজ উদ্দিন জানান, শিশুদের মাঠ সমাজের সুশীলরাই কেড়ে নিয়েছেন। বিশ্বকাপ খেলা সবাই দেখছেন। ছোট বড় সবার মধ্যে উন্মাদনা চলছে। এটি সুস্থ সংস্কৃতির অংশ। খেলাধুলাকে ভালোবাসে বলেই এই উন্মাদনা। মাঠ থাকলে প্রতিটি পাড়া মহল্লায় খেলা হতো। খেলাধুলা করলে তারা অপসংস্কৃতি, অপরাজনীতি থেকে বিরত থাকতো। তাদের মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতো।

(আজকের সিলেট/১ আগষ্ট/ডি/কেআর/ঘ.)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ