আজ বৃহস্পতিবার, ১৩ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং

সুনামগঞ্জ-১ : দলীয় মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে যারা

  • আপডেট টাইম : অক্টোবর ১৮, ২০১৮ ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, বিএনপি-আওয়ামী লীগ ও শরীক দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থকরা নিজ-নিজ পছন্দের প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনী মাঠ পদ চারণায় মুখরিত করে রেখেছে। হাওর বেষ্ঠিত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা-তাহিরপুর ও মধ্যনগর) নির্বাচনী আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি’র আট জন প্রার্থীর নাম তৃণমূল নেতাকর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের মুখে মুখে সরব আলোচনা চলছে।

তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বেশী প্রচারণায় বর্তমান এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন রয়েছেন টপ অব-দ্যা এইটে। প্রয়াত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলহাজ্জ্ব আব্দুস সামাদ আজাদ’র ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি ও সাচনাবাজার ইউনিয়নের দুইবারের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীম, সাবেক এমপি সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক এড: রনজিত সরকারের নাম নেতাকর্মীদের মুখে-মুখে শুনা যাচ্ছে।

অপর দিকে এই আসনে বিএনপির যে চার জনের নাম দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের মুখে সবচেয়ে বেশী আলোচনা শুনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে দুই তরুণ নেতা নতুন মুখ তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো: আনিসুল হক, তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান কামরুল, সাবেক এমপি নজির হোসেন ও ড্যাবের কেন্দ্রীয় নেতা ডা: রফিক চৌধুরীকে নিয়ে নির্বাচনী মাঠে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষণ।

বিএনপি ও আ’লীগের এই আট জন আলোচিত মনোনয়ন প্রত্যাশী ছাড়াও সম্ভাব্য অন্যান্য প্রার্থীরা সনাতন ধর্মের শারদীয় দুর্গোৎসবে বিভিন্ন ভাবে শুভেচ্ছা বিনিময়ে নির্বাচনী মাঠ সরব করে রেখেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই আসনটি পুনরায় ধরে রাখতে বর্তমান এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে হাওরের গ্রামে গ্রামে ঘুরে এলাকার স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা-মন্দির, রাস্তা-ঘাট, কলেজ ও বিদ্যালয়ের হোষ্টেল নির্মান, বিদ্যুতায়নসহ উন্নয়ন কাজ করে সভা, সমাবেশ, গণসংযোগ চালিয়ে শেখ হাসিনার উন্নয়ন বার্তা মানুষের মাঝে পৌঁছে দিচ্ছেন। তিনি এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ও গণসংযোগে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও বসেনেই। এমপি রতন কে টপকে মনোনয়ন পেতে ৬ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী এক মে কাজ করছেন।

এ আসনের দু’বারের এমপি রতনের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে দলের কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী নির্বাচনী মাঠে সভা করেছেন। দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করে এমপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিশোধাগার করেছেন বলে জানা গেছে। সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল গত জাতীয় নির্বাচনে আ’লীগ প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী (ফুটবল মার্কা) হিসেবে নির্বাচন করে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়ে ছিলেন। দলীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, মনোনয়ন প্রত্যাশীর কেউ-কেউ গত নির্বাচনে নৌকার বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ফুটবল মার্কার পক্ষে আর কেউ-কেউ নৌকার পক্ষে নির্বাচন করেছিলেন। আসন্ন নির্বাচনেও এমনটি হবে কি-না এ নিয়ে এলাকায় চায়ের ষ্টল থেকে শুরু করে মাঠে-ঘাটে, গ্রাম-গঞ্জে তুমুল সমালোচনাসহ হাস্য রসের সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমান এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়ন যে কেউ চাইতে পারে। দলীয় সভানেত্রী ছাড়া অন্য কেউ বলতে পারবেন না মনোনয়ন কে পাচ্ছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরে সুনামগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকায় যে উন্নয়ন হয়নি গত ১০ বছরে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশে আমি তার কয়েকগুণ বেশি উন্নয়ন করেছি, আমার উন্নয়ন কাজ সব দৃশ্যমান আছে।

তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের প্রশ্নে তিনি বলেন, মনোনয়ন পাওয়ার আশায় আমার বিরুদ্ধে যারা মিথ্যা প্রবকাঞ্চনা করছেন, অন্যরা এলাকার উন্নয়নের কথা স্বীকার করলেও তারা কোন দিনও বর্তমান সরকারের উন্নয়নের কথা মুখে আনেননা। প্রতিযোগীতা থাকা ভালো প্রতিহিংসা থাকা ভালোনা, এগুলো সময় হলেই ঠিক হয়ে যাবে। তারা যদি বঙ্গবন্ধু কে ভালোবাসে তাহলে নৌকার পক্ষে আওয়াজ তুলোক, আগামীতেও নৌকার বিজয় কেউ ঠেকাতে পাবেনা।

আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল বলেন, দলীয় মনোনয়ন পেলে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করে এই আসনটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারব। রেজাউল করিম শামীম বলেন, আমি দলের একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে সারা জীবন দলের জন্য কাজ করেছি, জেল-জুলুম থেকে শুরু করে তৃণমূল আ’লীগকে শক্তিশালী করেছি। দলীয় সভানেত্রী বঙ্গকন্যা প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে নৌকা প্রতীক দিলে, দলে কোন গ্রুপিং থাকবেনা আমার বিজয় সুনিশ্চি হবেই ইনশা আল্লাহ্।

রনজিত সরকার বলেন, আমি সারাজীবন দলকে তৃণমূলে সুসংঘটিত করতে কাজ করেছি। দলের প্রতি আনুগত্য থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সব সময় দলীয় সভানেত্রীর উন্নয়ন বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। এলাকার তৃণমূল নেতাকর্মীরা জাতীয় নির্বাচনের জন্য আমাকে উদ্ধোদ্ধ করেছেন। দীর্ঘ কয়েক বছর থেকে নেতাকর্মীদের নিয়ে আমি নির্বাচনী মাঠে প্রচারণায় কাজ করছি। দলীয় সভানেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে মনোনয়ন দিলে সুনামগঞ্জ-১ আসনের বিজয় নিশ্চিত করে শেখ হাসিনাকে এই আসনটি উপহার দেবো।

বিএনপির বেশ কয়েক জনের মধ্যে চার জনকে নিয়ে ভোটের মাঠে দলীয় তৃণমূল নেতাকর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের মাঝে চলছে তুমুল আলোচনা। বিভিন্ন চাপের মুখেও শান্তিপ্রিয় আন্দোলন কর্মসূচির মধ্যেও নির্বাচন সামনে রেখে ভোটের মাঠ থেকে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারনীদের সাথে জোর লবিং করে যাচ্ছেন তারা। মনোনয়ন নিশ্চিত করতে তারা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ছাড়াও কেহ কেহ লন্ডনের সঙ্গেও সরব যোগাযোগ রাখছেন। সাবেক এমপি নজির হোসেন ও আরও দু’জন তরুণ নেতা লন্ডনে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন বলে শুনা যাচ্ছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাদের নির্বাচনী এলাকায় কাজ করে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এব্যাপারে জানতে চাইলে নজির হোসেন বলেন, দলীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান বলেছেন এলাকার দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধকরে দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন জোরদার করতে করে নেত্রীকে মুক্তি করতে হবে। তারকে জিয়ার উপর সকল ষড়যন্ত্রমুলক মিথ্যা মামলার প্রত্যাহরের দাবী করে বলেন, দলীয় মনোনয়ন দিলে আমি আবারো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।

অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী বলেন, ২০০৮ সালে ভোটে লড়ে এক লাখ ভোট পেয়েছিলাম। আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলে এ আসনে বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত।

বিএনপির তরুণ মনোনয়ন প্রত্যাশী আনিসুল হক বলেন, আমি প্রথমেই বেগম জিয়ার নি:শর্তে মুক্তি চাই, দেশ নায়ক তারেক রহমানসহ সকল নেতৃবেৃন্দের উপর মিথ্যা মামলার প্রত্যাহারের দাবী করে বলেন, আমি ওয়ান ইলিভেন থেকে শুরু করে সকল আন্দোলনে সোচ্চার ভুমিকা রেখে যাচ্ছি। যতদিন দেশমাতা বেগম জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের উপর থেকে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহর না হবে ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাবো।

যুক্তফ্রন্টের সাত দফাসহ দাবি এই সরকারকে মানতে বাধ্য করে তাদের পতন ঘটাব। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠ সরব করে রেখেছি। তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর এলাকার সকল নেতাকর্মী নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে কাজ করছি। আশা করি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আমাকে মূল্যায়ন করবেন, আমি মনোনয়ন পেলে এ আসনের জনগন ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিজয় সুনিশ্চিত করবেন।

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, এই মুহুর্তে দাবী একটাই দেশমাতা ২০ দলীয় জোট নেত্রী বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। আমি সারা জীবন দলের জন্য জেল জুলুম সহ্য করে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতন্ত্রের ‘মা’ বেগম জিয়ার মুক্তি আন্দোলন করে যাচ্ছি। দল নির্বাচনে গেলে মনোনয়ন চাইব। আমাকে মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করবো, যদি আমাকে না দেয় যাকে দেবে আমি তার পক্ষেই মাঠে নামব।

জানা যায়, ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে এমপি নির্বাচিত হওয়ার গৌরব আর্জন করেন আওয়ামীলীগের প্রার্থী মো: আব্দুল হেকিম চৌধুরী, ১৯৭৯ সালে একতা পার্টি প্রার্থী প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, ১৯৮৬ সালে কমিউনিষ্ট পার্টির প্রার্থী (১৪ দলীয় জোটে নৌকা প্রতীক) প্রসূণ কান্তি রায় (ররুণ রায়), ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বদরুদ্দোজা আহম্মেদ সুজা, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে কমিউনিষ্ট পার্টির প্রার্থী (১৪ দলীয় জোটে নৌকা প্রতীক) নজির হোসেন, পরে তিনি দল বদল করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে বিজয়ী হন।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে জয়ী হন আ’লীগের সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল। ২০০১ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির নজির হোসেন। ২০০৮ সালের ভোটে ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৫২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী ছিলেন ড্যাবের কেন্দ্রীয় নেতা বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী তিনি পেয়েছিলেন ৯৪ হাজার ৪৫৮ ভোট।

সর্বশেষে বিএনপি বিহীন ২০১৪ সালের বির্তকিত একতরফা নির্বাচনেও সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল গত জাতীয় নির্বাচনে আ’লীগ প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের (নৌকা) মার্কার বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী (ফুটবল মার্কা) হিসেবে নির্বাচন করে বিশাল ব্যবধানে পরাস্ত হন। সময়েই বলে দেবে কার পাল্লা কতটুকু ভারী, কে হচ্ছেন নৌকার মাঝি আর ধানেরশীষ যাবে কার হাতে।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ