আজ মঙ্গলবার, ১২ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং

ওরা কি আইনের উর্ধ্বে থাকতে চায়?

  • আপডেট টাইম : অক্টোবর ২৮, ২০১৮ ৮:১৭ অপরাহ্ণ

লুৎফুর রহমান তোফায়েল : আমি চিন্তা করে পাই না, আমাদের মধ্যে এতো দ্রুত বিভাজনটা কেমনে তৈরী হয়? এই পরিবহণ শ্রমিকরা কি বাইরের কেউ? এরা তো আমাদেরই ভাই, বন্ধু, আত্মীয় বা প্রতিবেশী। গতকাল রাতেও তো ওরা আমাদের সাথে খেয়েছে, আমাদের পাশে ঘুমিয়েছে। ভোরে প্রায় একই সাথে সবাই ঘুম থেকে উঠেছি। কিন্তু ঘুম থেকে উঠেই ওরা কেমনে আমাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল?

ভোর থেকে নাগরিক জীবনকে ওরা স্তব্ধ করে দিয়েছে। নিজেরা নিজেদের গাড়িগুলো তো বন্ধ রেখেছে; অন্য কোনো পরিবহণও চলতে দিচ্ছে না। শুধু চলতে দিচ্ছে না নয়, মারমুখি অবস্থান দেখে মনে হয় যেন ওরা যুদ্ধে নেমেছে। এই যুদ্ধ কার বিরুদ্ধে? আপনার-আমার বিরুদ্ধে। ওদের আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধ, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে।

ওদের কর্মসূচি হচ্ছে কর্মবিরতি পালন। কিন্তু অন্য পরিবহণ চলতে বাধা দেবে কেন? পথে পথে মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। স্থবিরতা নেমে এসেছে দিনের স্বাভাবিক কর্মকা-ে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, হাসপাতাল-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

সবধরনের চলতে ওদের বাঁধার মধ্যে পড়ছে। ওরা রিকশা, অটো রিকশা এমনকি ব্যক্তিগত গাড়িও চলতে দিচ্ছে না। স্কুলবাস-অ্যাম্বুলেন্স, বিয়ের গাড়ি পর্যন্ত ওদের হামলা থেকে রক্ষা পায় নি। অবস্থা এমন যেন সাধারণ পথচারীদেরও সুযোগ পেলে হামলা করে বসে। এ কেমন নৈরাজ্য? কেউ গাড়ি বের করলে ভাঙচুর করছে, ড্রাইভারের মুখে পুড়া মবিল মেখে দিচ্ছে, মারধর করছে, রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরসাইকেল থেকেও যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছে, স্কুলবাসে হামলা করে ছাত্রীদের গায়ে আলকাতরা বা পুড়া মবিল মাখা ছবি পর্যন্ত ফেসবুকে দেখলাম। কোথায় আছি আমরা?

এই সন্ত্রাসী কর্মকা- কেন? ওরা সাধারণ মানুষকে শুধু জিম্মি নয় রীতিমতো নির্যাতন করছে! এর মানে কী? এর মানে ওরা আইনের বাইরের বাইরে থাকতে চায়। সোজাসাপ্টা বলতে গেলে ওরা মানুষ হত্যার লাইসেন্স চায়!

কেমনে? বলি, ওরা যে আইন সংশোধনের দাবি জানাচ্ছে সেই আইনে স্পষ্ট বলা আছে, “ বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে গাড়ি চালানোর কারণে কেউ আহত বা নিহত হলে দণ্ডবিধির ৩০৪ (খ) ধারায় মামলা দায়ের হবে। আর এই ধারায় সাজা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা। এ ছাড়া তদন্তে হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ৩০২ দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি হবে।” অর্থাৎ তখন চালকের মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ- হতে পারে।

এই আইনে তো বলা হচ্ছে, যদি প্রমাণিত হয় চালক বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে গাড়ি চালিয়েছে আর এতে কেউ আহত বা নিহত হয় তাহলে শাস্তি পাবে। বলা হয়েছে ‘যদি প্রমাণিত হয়’, এর মধ্যে অনেক মারপ্যাঁচ আছে। এছাড়া সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং বিশেষজ্ঞরা এই আইনেরও সংশোধন করতে বলেছেন। তারা বলেছেন, দুর্ঘটনার জন্য চালক দায়ী হলে এই শাস্তি কম হয়ে যায়। চালকের আরও কঠোর শাস্তি হওয়া উচিৎ। তবুও ওরা এই আইন মানতে নারাজ। তার মানে তারা আইনের উর্ধ্বে থাকবে? কোনো আইন মানবে না? বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষ মারবে, কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না? এটা কি দেশের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো নয়?

প্রশাসনও ওদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। শহরের বিভিন্ন জায়গায় অদের এতো নৈরাজ্য-সন্ত্রাসী কর্মকা- দেখলাম। ওরা জনগণের জানমালের ক্ষতি সাধন করছে কিন্তু কোনো পুলিশকে এতে বাঁধা দিতে দেখলাম না। বলতে গেলে মাঠে আজ পুলিশের কোনো উপস্থিতিই লক্ষ্য করা যায় নি।

তাহলে আমরা কার কাছে যাবো? গণামাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি, দেশের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর সবচেয়ে বড় মোর্চা সংগঠনের প্রধান নেতা, সরকারের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলছেন, তিনি এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না! অথচ তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি। এই সংগঠনটির ডাকেই এই নৈরাজ্য চলছে।

তবে আইনমন্ত্রী সড়ক পরিবহনমন্ত্রী দু’জনই শ্রমিকদের এই ধর্মঘট প্রত্যাহারের আহ্বান করেছেন। শ্রমিকরা এই দাবি এখনই পূরণ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেছেন, ‘এই সরকারের হাতে যে সময় আছে, তাতে সড়ক পরিবহন আইনটি আর সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। শ্রমিক নেতারা আইনটি ভালোভাবে না পড়েই আন্দোলনে নেমেছেন।’ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও আইনটি সংশোধন করা বা শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান। তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে শুধু বলতে চাই, ধর্মঘট প্রত্যাহার করুন, মানুষকে কষ্ট দিয়ে কোনো লাভ নেই।’

শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ালো? শ্রমিকরা তো দিনশেষে নিজেদের অবস্থানে বহাল তবিয়তেই আছে। আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে জননিরাপত্তা ও জনঅধিকার তো প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায়।

(লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ