আজ মঙ্গলবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

সিলেটে সাত বছরে ১১ রাজনৈতিক খুন, বিচার হয়নি একটিরও

  • আপডেট টাইম : আগস্ট ২০, ২০১৭ ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

বিশেষ প্রতিবেদক : রাজনীতিতে হত্যা, হামলা, অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। পান থেকে চুন খসলেই এক পক্ষ অন্য পক্ষের উপর হামলে পড়ে। আর এসবে শুধু দেশীয় অস্ত্রই নয়, আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করা হয়। গত অর্ধযুগেরও বেশী সময় থেকে সিলেটে রাজনৈতিক হত্যা, হামলা, মামলা বেড়ে চললেও একটি ঘটনারও বিচার হয়নি। কোনোটি আপসে আবার কোনোটি খারিজ হয়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এসব হামলা-মামলা কঠোর হাতে দমন করতে হবে। তা না হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা বেড়েই চলবে। হামলা-মামলা ও হত্যাকান্ডে যে-কোনো দলের নেতা-কর্মীরা জড়িত থাকলে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। আবার অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক মামলা হওয়ায় এসব মামলার সঠিক বিচার হয় না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, আসামি যে দলেরই হোক আমরা বিচারের আওতায় নিয়ে আসি।

২০১০-২০১৭ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন। পঙ্গুত্ব বরণ করছেন পাঁচ জন। সরকারি দল, বিরোধী দল কেউ বাদ নেই। বিশেষ করে ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরাই এসব হামলা মামলার শিকার হয়েছেন। তবে এসব হামলা মামলা বেড়ে চললেও তার রহস্য উন্মোচন করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সর্বশেষ সাম্প্রতি নগরীর সোবহানিঘাটে ছাত্রলীগের দুই নেতার উপর হামলার অভিযোগে শিবিরকে দায়ী করে মামলা করা হয়েছে।

২০১০ সালের ১২ জুলাই। সিলেট নগরীর টিলাগড়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে নিজ সংগঠনের ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে খুন হন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ছাত্রলীগকর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ।

২০১৩ সালের ২ মার্চ রাত ৯টায় নগরীর আখালিয়ার তপোবন এলাকার সামনে ঢাকা মেট্রো ডিলার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সামনে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জগৎ জ্যোতিকে খুন করা হয়। নিহত জগৎ জ্যোতির শরীরের বিভিন্ন স্থানে ২৩টি গুরুতর জখম ছিল। এ ঘটনায় নিহতের বন্ধু-সাব্বির আহমদ বাদি হয়ে কোতোয়ালি থানায় ঘটনার ৩ দিন পর একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় জামায়াত-শিবিরের ২৫ নেতাকর্মী আসামি করা হয়। তবে পুলিশ ঘটনা তদন্ত করে আদালতে অভিযোগ পত্র জমা দেয়। অভিযোগপত্রে এজাহারনামীয় একজনকে বাদ দিয়ে নতুন করে অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সহ ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।

২০১৩ সালে ২ ফেব্রুয়ারি শহরতলির রোডে হামলার শিকার মদনমোহন কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অরুণ দেবনাথ সাগর। ২০১৩ সালে ১৩ অক্টোবর মদনমোহন কলেজ ছাত্রলীগ নেতা রাসেল আহমদের উপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায়ও শিবিরকে দোষারোপ করে মামলা দায়ের করা হয়।

২০১২ সালের ১৯ নভেম্বর শিবির ক্যাডারদের হামলায় গুরুতর আহত হন অসীম কান্তি ধর । তার দুই পায়ের রগ কেটে দেয় শিবির ক্যাডাররা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় অসীমের পায়ের হাড়। বর্তমানে পঙ্গুত্ব জীবনযাপন করছেন অসীম। অসীম ছাড়াও সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে শিবিরের হাতে নির্যাতিত মেহেদি হাসান উজ্জ্বল ও গোলাপগঞ্জ ছাত্রলীগের নেতা মিজানুর রহমান। ছাত্রলীগ এসব হত্যাকান্ড ও হামলার জন্য শিবিরকে দায়ী করে।

সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দুই ছাত্র কাজী হাবীব ও সুমন হত্যাকান্ডের জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ করে মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৪ সালের ১৯ নভেম্বর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র সুমন রায় খুন হন। এর ১৪ মাসের মধ্যে ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি খুন হন হাবিব।

২০১৫ সালের ২৭ জানুয়ারি নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুন হন ছাত্রদল নেতা জিল্লুল হক জিলু। এ ঘটনায় সাবেক ছাত্রদল নেতা মাহবুব কাদীর শাহীসহ ২০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়।

২০১৪ সালের ৪ জুন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে খুন করা হয় ছাত্রদল নেতা তাওহীদকে। এ ঘটনায় ওসমানী মেডিকেল কলেজের তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতিকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়।

২০১৫ সালের ১২ আগস্ট অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে মদন মোহন কলেজে খুন হন ছাত্রলীগকর্মী আবদুল আলী। এ ঘটনায় পুলিশ ছাত্রলীগ ক্যাডার প্রণজিৎ দাশ ও আঙ্গুর মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। প্রণজিৎ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই দুজন ছাড়া এই হত্যা মামলার অন্য কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

একই বছরের ১৫ জুলাই মদিনা মার্কেটে একটি অটোরিকশা স্ট্যান্ড দখল নিয়ে নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় খুন হন ছাত্রলীগকর্মী আবদুল্লাহ ওরফে কচি। এ ঘটনায় কচির ভাই আসাদুল হক মামলা দায়ের করলেও আসামিদেরও অনেকে রয়েছে অধরা।

২০১৬ সালের আগস্ট নগরীর জিন্দাবাজারের এ্যালিগেন্ট শপিং সিটির পার্কিংয়ের সামনে মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে জেলা ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সহ সভাপতি এম. সুলেমান হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে ওই মার্কেটের ব্যবসায়ী করিম বক্স মামুনকে ছুরিকাঘাত করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতেই মামুন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় পরদিন সুলেমান হোসেন চৌধুরীকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে।

২০১৭ সালের ১ মে নগরীর শামীমাবাদে ইসলাম হোসেন নামের এক শ্রমিককে কুপিয়ে খুন করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদি হয়ে থানায় মামলা করলেও ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ধরা পড়েনি।

এর পর ১০ জুলাই নগরীর পাঠানটুলায় একটি বাসার দখল নিয়ে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হামলায় খুন হন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আব্দুল্লাহ অন্তর। এ ঘটনায় অন্তরের স্ত্রী বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলেও আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার জেদান আল মুসা বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় আমরা কোনো মামলা পর্যালোচনা করি না। অপরাধী সে যে-কোনো রাজনৈতিক দলের হোক না কেন, সে অপরাধী। সেদিক বিবেচনায় আমরা মামলা পর্যালোচনা করে থাকি।

 

(আজকের সিলেট/২০ আগস্ট/ডি/এসটি/ঘ.)

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ...