আজ মঙ্গলবার, ১২ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং

আজ ভালোবাসা দিবস!

  • আপডেট টাইম : ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯ ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

মো: হাবিবুর রহমান সাদী : আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। পুরো ক্যাম্পাসে সাজ সাজ রব। যুগল প্রেমিকরা নিজের মতো করে দিনের কার্যসূচি শুরু করেছে। কিন্তু রাতুলটার কি যে হলো!

দেরী করার অভ্যাসটা মানুষটির আর যাবেনা। খুব বিরক্ত লাগছে লাবণ্যের। অথচ আজকের দিন কি ঝগড়া করার দিন? নাহ, অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হতেই চাচ্ছে না।

হ্যাঁ রাতুল তুমি কি আসবে, না আমি চলে যাব?

এইতো চলে আসছি, প্লিজ প্লিজ একটু দাঁড়াও না লাবণ্য, কাছাকাছি চলে এসেছি প্রায়।

আচ্ছা তুমি কি আমাকে এভাবে সারাটি জীবন অপেক্ষায় রাখবে। সময়ের জ্ঞান কি তোমার এই জীবনে আর হবেনা। ছাত্র জীবনে সময়ের দাম না দিলে পরে আফসোসের সীমা থাকবে না বলে দিলাম কিন্তু রাতুল। এক নাগাড়ে কথাগুলো বললো লাবণ্য।

রাতুল মনে মনে ভাবে এরকম একজনই তার জীবনে প্রয়োজন। যার কড়া শাসন আমাকে গুছিয়ে নিবে অগোছালো এক বিধ্বস্ত জীবন থেকে।

কি করব বল, ঘুম ভাঙ্গতে যে লেইট হয়ে যায়, তাইতো দেরি…

থামো,আর ন্যাকামি করতে হবে না। তুমি কবে যে ঠিক হবা। আচ্ছা তোমার লাইফস্টাইলে কি একটু পরিবর্তন নিয়ে আসা যায় না।

আসবে না কেন? অবশ্যই আসবে। এই যেমন প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার প্রাক্কালে তুমি আমার চুলগুলো গুছিয়ে দিবে। প্রতি রাতে বালিশের নিচ থেকে সিগারেটের প্যাকেট লুকিয়ে রাখবে। পানির জগ নিয়ে কাক ডাকা ভোরে নাকের ডগায় এই তুমি রাগান্বিত লালবর্ণের চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। মিষ্টি মিষ্টি শাসন বারণে আমাকে যে তুমিই পরিবর্তন করে নিবে লাবণ্য, একদম তোমার মত করে।

লাবণ্য মুচকি হাসে,পাগলামিটা বুঝি আর গেলোই না বাঁদরটির।

মেয়েরা না এই একটি জায়গায় খুবই দুর্বল। কেউ তার শাসনগুলো মেনে চলুক, তার প্রতিটি কথায় সায় দিক, এক কথায় তার পরিচালনায় তার প্রিয় মানুষটি চলুক সেটাই তারা চায়। সেদিক দিয়ে লাবণ্য ভাগ্যবতীই বলা যায়।

এই যে রাতুলকে সে কত বকা দেয়, কত হার্ডলাইনে রাখে,কই একদিনের জন্যেও তো রাতুল তার প্রতিবাদ করেনি। এখানেই বুঝি তাদের প্রেমের স্বাথর্কতা।

লাবণ্য আর রাতুল একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ব্যাচের শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল আঙ্গিনায় অনেক কিছুরই উন্মুক্ত ছড়াছড়ি। প্রেম ভালোবাসার উর্বর এক বিচরণ ভূমি ভার্সিটি। শাসন-বারণ,সামাজিক চক্ষু লজ্জা এসব কিছুরই বালাই নেই এই কয়েক শত একরের বাওন্ডারির ভেতরে। সেই সুবাধে রক্ষণশীল পরিবার থেকে বেড়ে ওটা লাবণ্যের এই পরিবেশটা মনে বেশ দাগই কাটল বলা যায়। চতুর্পাশের সবকিছুকেই দারুণ মনে হল তার কাছে।

বড়রা যখন অবাধে ক্যাম্পাসের পুকুর ঘাটে বসে চুটিয়ে চুটিয়ে প্রেম নিয়ে মহাব্যস্থ, মাঝে মাঝে যখন পাহাড়ের পাদদেশে যুগলদের জন্মদিন ধুমধাম করে উদযাপন হয়, ভালোবাসা দিবসে বড় ভাই-আপুদের রঙ্গীন পাঞ্জাবি আর নীল শাড়ী পড়ে রাস্থায় রাস্থায় ঘুরে বেড়ানো কতই না ইনজয়ফুল লাইফ মনে হয় লাবণ্যের কাছে। জীবনের প্রকৃত স্বাদ মনে হয় এখানেই নিহিত।

এরকম চিন্তাশক্তি থেকেই অনার্স ২য় বর্ষে পড়াকালীন,১৪ই ফেব্রুয়ারীর ভালোবাসা দিবসে রাতুল আর লাবণ্যের শুরু হয় হাতে হাত রেখে একসাথে পথচলার আলাদা এক জীবন। নিয়ম করে ফুল দেয়া নেয়া চলতেই থাকল অবিরাম। একে অপরের প্রতি কেয়ার নেয়াটা চলতে থাকল নিয়ম করে।

দিনগুলো যাচ্ছে কখনো রাগ, ভালোবাসা, অভিমান, মোবাইল বন্ধ করে রাখা, ফুচকা হাউজে মধ্যরাত অবধি আড্ডা দেয়া এভাবেই। ক্যাম্পাসে চমৎকার যেসব জুটিদের লোকমুখে নাম রয়েছে তাদের মধ্যে রাতুল-লাবণ্য জুটির নামটাও সবার কানে কানে জানাজানি রয়েছে।

দেখতে দেখতে দু’জনেরই শিক্ষা জীবন সমাপ্তির পথে শহীদ মিনারে লাবণ্য রাতুলের হাত শক্ত করে ধরে আছে।

রাতুল আমাকে যে ফিরতে হবে গ্রামের বাড়ীতে। বাবা তাগদা দিচ্ছেন। শুনেছি বিয়ের আলোচনাও চলছে বাড়ীতে। তুমি একটা কিছু কর এই মুহুর্তে।

লাবণ্য দেখো, আমরা দু’জনেই বেকার। তাছাড়া চাকুরী যে আমাদের হবে না সেটাও কিন্তু নয়। তবে এই দুই-একটা বছর আমাদের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিতে হবে।

কি করতে পারি আমরা? লাবণ্য দরদমাখা কণ্ঠে রাতুলকে জিজ্ঞেস করে।

আমরা না হয় বিয়েই করে ফেলি। তাছাড়া আমদের তো নিজেদের ভালোমন্দ বুঝার বয়স হয়েছে নাকি? লাবণ্য মাথা নিচু করে সম্মতি জ্ঞাপন করে।

বিয়ে পরবর্তী সময়ে আমরা একত্রে তোমার আর্মি বাবার পায়ে ধরে মাফ চেয়ে নেব। দেখবে সময়ই সবকিছু অনুকূলে নিয়ে আসবে।

লাবণ্য ভাবনার জগতে হারায়। সময়কে সে বড্ড ভয় পায়। সময় যদি কারো প্রতিকুলে দাঁড়িয়ে যায় তখন স্রোতের অনুকুলেও পথচলা দূরুহ হয়ে যায়।

লাবণ্য সাতপাঁচ না ভেবে রাতুলের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়, তাছাড়া রাজি না হয়ে এই মুহুর্তে তার কোন উপায়ন্তর নেই। লম্বা এই সম্পর্কের মাঝে তাদের শারিরীক সম্পর্কেও গড়িয়েছিল। রাতুলের সন্তান এখন তার গর্ভে। সুতরাং পেছনে তাকানোর আর কোন সুযোগ নেই তার হাতে।

বন্ধুদের সহায়তায় তাদের বিয়েটি হলো শেষ অবধি।

সেনাবাহিনীদের হৃদয় নাকি খুবই কঠিন থাকে। পুরো জীবন যাদের অস্ত্রের সাথে কাটাতে হয় সেখানে নাকি শুধু বারুদের গন্ধ মিলে, ফুলের সুঘ্রাণ সেখানে ভাবাটাও অবান্তর।

কিন্তু আদরের মেয়েটি যখন স্বামী নিয়ে বাবার পায়ে অবুঝ মেয়েদের মতো ফুঁপিয় ফুঁপিয়ে কাঁদছে, বাবা আর তাকে বুকে না নিয়ে পারলেন না।

অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা অফিসার বললেন, যতদিন রাতুলের চাকরি না হচ্ছে ততদিন তোমাদের সাংসারিক খরচ না হয় এই বুড়ো বাবাই কাধে তুলে নিলাম।

কিন্তু কে জানত? এই সহানুভূতিটাই একদিন কাল হবে লাবণ্যের জন্য, লাবণ্যের পরিবারের জন্য।

রাতুল শ্বশুরের পেনশনের টাকা বসে বসে খাওয়ার এক কুট কৌশলে তখন পুরোপুরি মত্ত। লাবণ্য যতোই তাকে চাকুরী খোঁজার তাগদা দেয় ততই দেখা দেয় তাদের পারিবারিক কলহ।

আজকাল ঠুনকো বিষয়ে লাবণ্যের গায়ে হাত তোলা রাতুলের সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে।

রাতুল সাফ জানিয়ে দেয়, তোমার বাবা বিনে পয়সায় মেয়ে বিয়ে দিয়ে মহাখুশি, এখন সামান্য এই কয়টা টাকা দিয়েই হাফিয়ে উটলেন নাকি?

মেয়ে বিয়ে দেয়ার টাকা যে বাঁচিয়ে দিলেন সেখানে কি আমার কোন অবদান নেই।

লাবণ্যের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সেই রাতুল আর এই রাতুলের মধ্যে সে রাত আর দিনের পার্থক্য খুঁজে ফিরে।

সে সংজ্ঞা পায় ফুচকা হাউজের প্রেমিক আর সংসার ঘরের স্বামীর মধ্যে। ফুচকা হাউজের প্রেমিক হয় রোমান্টিকতায় ভরপুর, আর সংসারী স্বামী হয় বাস্তববাদী এক পুরুষ।

অনেকদিন হয় রাতুলের সাথে বিচ্ছেদ হয়েছে লাবণ্যের। যোগাযোগ একেবারেই নেই লোকটির সাথে। মানুষটির জন্য মন কাঁদে আবার প্রচন্ড ঘৃণায় মুখ ভরে বমি আসে। মানুষের মন বড়ই বিচিত্র, যাকে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে সেই তার জন্যই কিনা মনটা আবার কাঁদে।

খুব নিম্ন লেভেলের পরিবার থেকে শুনেছি রাতুল উটে এসেছে। কিন্তু আবেগের মোহে, টুনকো ভালোবাসার টানে সেদিন কিছুই জানা হয়নি লাবণ্যের। রাতুল নাকি এখন বাজে বন্ধুদের আড্ডায় রাত কাটিয়ে ঘরে ফিরে। বিধ্বস্ত রুমে এখন সেই আগের অগোছালোই রাতুল রয়ে গেছে। না তাকে আর গোছানো জীবনে ফেরাতে পারেনি মেয়েটি। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে সে, মানুষ নিজেকেই যেখানে নিজের মত সাঁজাতে পারেনা সেখানে অন্য একজনকে রাঙ্গিয়ে তোলা আসলেই অবান্তর চিন্তা।

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারী, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। খোলা কেশ আর অবাক দু’টো চোখ দিয়ে লাবণ্য বেলকনির পাশে। যে দু’টো চোখে কান্নার শুকনো নদী। পানি নেই শুধু কষ্টের মরুভূমি বহমান।

যুগলেরা রিকশায় রিকশায় পুরো শহর মাতাচ্ছে। কেউবা এক আইসক্রিম ভাগভাগি করে খাচ্ছে। কেউবা চুলের খোঁপা বেধে দিচ্ছে ভালোবাসার মানুষটির।

লাবণ্য চিৎকার করে প্রলাপ করে, মিথ্যে সবই মিথ্যে। বাইরের এই চাকচিক্য এক পৃথিবী ভালোবাসা সবই মিথ্যে। অভিনয়ের খোলসে খুব অল্পদিন এসব রোমান্টিকতা টিকে। ভালোবাসার আবরণ ঠিকই খসে পড়ে স্বার্থের তাপদাহে। ভালোবাসা শুধুই আবেগের মোহ, বাস্তবতার কাঠিন্যে মোমের যতি।

মানসিক হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে সেবিকারা লাবণ্যকে রুমে বন্দী করে রাখে। ভালোবাসা দিবস আর যেন না ফিরে, ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে এই দিনটি মুছে যাক চিরতরে এমনটাই চায় লাবণ্য। উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে অচেতন হয়ে যায় লাবণ্য, পড়ে থাকে অন্ধকার একাকী রুমের ঠান্ডা মেঝেতে, অস্ফুট স্বরে মুখ থেকে বেরোয় আহ! আজ ভালোবাসা দিবস।

(লেখক : শিক্ষার্থী, সিলেট এম.সি কলেজ।)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ