আজ মঙ্গলবার, ১২ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং

‘হাসির পাত্র’ থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান

  • আপডেট টাইম : মার্চ ১৩, ২০১৯ ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ

জেলা প্রতিনিধি

হবিগঞ্জ : যেকোনো নির্বাচন এলেই অংশগ্রহণ এবং পরে পরাজয়। এটাই ছিল হবিগঞ্জের বাহুবলের নবাগত উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ খলিলুর রহমান আগের জীবন কাহিনী। কিছুদিন আগেও তিনি সবার কাছে ছিলেন অবহেলার প্রাত্র। সদ্য শেষ হওয়া উপজেলা নির্বাচনে এলাকায় একমাত্র হাসির পাত্র ছিলেন তিনি। নির্বাচনী প্রচার প্রচারণার সময় অনেকেই তাকে টমেটো আলু দিয়ে ঢিল ছুড়ে মারা হতো। শুধু ঢিল নয় অনেক স্থানে তাকে ধাওয়া করা হয়েছে। তার প্রার্থী হওয়াকে প্রতিদন্দ্বী প্রার্থীরা তেমন গুরুত্ব দিতেন না। সেই হাসির পাত্র সৈয়দ খলিলুর রহমানের কাছেই পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের দুই প্রভাবশালী নেতা।

তাই এখন বাহুবলের জনগণের মুখে মুখে ফিরছে খলিলুর রহমানের কথা। শুধু তাই নয়, তিনি বিজয়ী হওয়ার পর লোকজন তাকে টাকার মালা উপহার দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত তিনি ৬০টি টাকার মালা উপহার পেয়েছেন। সব মালায় থেকে তিনি ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পেয়েছেন।

নির্বাচনী ফলাফলে জানা যায়, বাহুবল উপজেলায় ২৩ হাজার ৪৮৩ ভোট পেয়ে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ খলিলুর রহমান। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল হাই নৌকা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১৭ হাজার ৬০৬ ভোট।

বেশ কয়েকবার নির্বাচন করে পরাজিত হওয়ার রেকর্ড আছে খলিলুর রহমানের। তাই এবার অভিনব প্রচারণা করে দুই হেভিওয়েট প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

জানা যায়, সৈয়দ খলিলুর রহমান নিজেকে একজন মানবাধিকারকর্মী বলে সব জায়গায় পরিচয় দেন। নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই তার। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-১ (বাহুবল-নবীগঞ্জ) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। এর আগে তিনি ইউপি নির্বাচন করে পরাজিত হন। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনেও অংশ নেন তিনি। সব নির্বাচনেই বিপুল ভোটে পরাজিত হওয়ার পর এবারের উপজেলা নির্বাচনে তিনি অভিনব প্রচারণা শুরু করেন।

ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে গিয়ে খলিলুর নির্বাচনী ইশতেহারে বলেন, আমাকে নির্বাচিত করে বাহুবলের জনগণের জুতার ধুলা-বালি পরিষ্কারের সুযোগ দিন। পাশাপাশি কাফনের সাদা কাপড় ও ফাঁসির রশি হাতে নিয়ে সবার কাছে ভোট প্রার্থনা করে খলিলুর বলতেন, ‘যদি আমি এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হতে না পারি, তাহলে আমি গলায় রশি দিয়ে ফাঁস দেব। নির্বাচনের পরের দিন ১১ মার্চ সকালে সবাই আমার জানাজা পড়বেন।’

তাঁর এই প্রচারণা শুনে অনেকে তাঁকে ধাওয়া করতেন এবং অনেক স্থানে ঢিল ছুড়ে মারতেন।

এছাড়াও ব্যক্তিগত জীবনে খলিলুর বহু বিবাহ করেছেন এবং স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। তিনি এই বলেও প্রচারণা করতেন, ‘আমি নির্বাচনে আসায় আমার স্ত্রী আমাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে, আমি এখন অসহায়।’

নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে বাহুবল উপজেলার স্নানঘাটে এক নির্বাচনী প্রচারণায় তার উপড় হামলায় পায়ে ব্যথা পান খলিল। পরে পায়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে তিনি প্রচার করেন।

যেকানে খলিলুর রহমানের এই অভিনব প্রচারণায় পুরো বাহুবলে হাস্যরস সৃষ্টি হয়। সেখানে নির্বাচনের মূল লড়াইয়ে থাকা সদ্য পদত্যাগী চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাই (নৌকা) এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি আবদুল কাদির চৌধুরী (আনারস) কে পরাজিত করে সবার নজর কেড়েছেন তিনি।

নির্বাচনের সৈয়দ খলিলুর রহমান পান ২৩ হাজার ৪৮৩ ভোট। আওয়ামী লীগের আবদুল হাই পান ১৭ হাজার ৬০৬ ও আবদুল কাদির চৌধুরী পান ১০ হাজার ৪৫৭ ভোট।

বাহুবল উপজেলা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হেলাল মিয়া বলেন, সৈয়দ খলিলুর রহমানের অভিনব প্রচারণায় সবাই হাসি ঠাট্টা করতেন। নির্বাচনের ১০ দিন আগে তিনি মিরপুর এলাকায় গেলে লোকজন তাকে টমেটো দিয়ে ঢিল ছুড়ে এবং হাসি ঠাট্টা করে বিদায় দেন।

নির্বাচনে পরাজিত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল কাদির চৌধুরী বলেন, খলিলুর রহমান লোকজনকে কান্নাকাটি করে বলেছেন, ‘আমি চারবার নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছি। এবার ভোট না দিলে আমি আত্মহত্যা করব। পরের দিন আমার জানাজায় যাবেন।’ এ ধরনের কথা বলে তিনি মানুষের সমর্থন পেয়েছেন। যেহেতু তিনি নির্বাচিত হয়েছেন এ বিষয়ে তাই আমার বলার কিছু নেই।

নব-নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যঅন সৈয়দ খলিলুর রহমান বলেন, আমি নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, সুযোগ পেলে পাঁচ বছর জনগণের পায়ের ধুলা পরিষ্কার করব। এখনো আমি সেই কথায় অটল আছি। তবে কাফনের কাপড় ও ফাঁসির দড়ি নিয়ে যে কথা বলা হচ্ছে, তা অপপ্রচার। একইভাবে স্ত্রী ডিভোর্স দিয়ে চলে যাওয়ার কথাও সঠিক নয়।

তিনি বলেন, আমার কোনো দল নেই, সংগঠনও নেই। আলুওয়ালা, ধানওয়ালা আর মাছওয়ালাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। কোনো নেতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। কোনো সমাবেশে গেলে নেতারা আমাকে দেখলে হিংসা করে। কারণ হ্যাজাকের আলোর সঙ্গে হারিকেনের আলো ম্লান হয়ে যায়।

নির্বাচনকালীন হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি একটি সভা থেকে ফেরার পথে কে বা কারা ঢিল ছুড়ে আমাকে আহত করে। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। তবে কার আঘাত করেছে তা বুঝতে পারিনি।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ