আজ মঙ্গলবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং

একজন কর্মবীর আজিজুল হক মানিক

  • আপডেট টাইম : মার্চ ২৬, ২০১৯ ৫:৩৪ অপরাহ্ণ

সুলায়মান আল মাহমুদ

পরিচিতদের মধ্যে কেউ হাসপাতালে গেলে বুকের ভিতরটা ধড়ক করে উঠে। আর যদি কোন স্বজন হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকলে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার যেন আর সীমা থাকেনা। তেমনী এক প্রিয় স্বজন শ্রদ্ধাভাজন আজিজুল হক মানিক ভাই। লেখক, সাংবাদিক এবং সফল জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানিক ভাই অনুকরনীয় এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। কয়েক দিন হলো শ্রদ্ধাভাজন মানিক ভাই হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। দোয়া করি আল্লাহ পাক মানিক ভাইকে দ্রুত সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিন। আমীন।
সিলেটের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যাঙ্গনে আজিজুল হক মানিক ভাই স্বকীয় খ্যাতি অর্জন করেছেন। সিলেটের ছাত্র আন্দোলনে তাঁর রয়েছে স্মরণীয় ভূমিকা। পাশাপাশি একজন সফল সমাজকর্মী হিসেবে তাঁকে চিহ্নিত করা যায়। একজন সুবক্তা হিসেবেও তাঁর রয়েছে বাড়তি পরিচয়। যে কোন অনুষ্ঠানে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে তার বক্তব্য উপস্থাপন সকলের নজর কাড়ে।
সিলেট শহরের দরগাহ এলাকার ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান আজিজুল হক মানিক। তাঁর পিতা-গ্রন্থাগার আন্দোলনের পথিকৃৎ, ভাষা সৈনিক, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ নূরুল হক। তাঁর মা-বেগম নুরুন্নেসা হক একজন সমাজ বিদূষী ও বিশিষ্ট লেখিকা। পুরো পরিবারেই সাহিত্যের এক অনন্য আবহ ছড়িয়ে আছে। দশ ভাই-বোনের প্রায় সবাই সাহিত্যের কোন না কোন শাখায় পদচারণা করছেন। বড় বোন রোকেয়া খাতুন রুবী দেশের একজন বিশিষ্ট লেখিকা ও রাজশাহী অঞ্চলের কর কমিশনার। আরেক ভাই এনামুল হক জুবের দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেটের ব্যুরো প্রধান। পাশাপাশি একজন ছড়াকার হিসেবেও তার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। আরেক ভাই জিয়াউল হক খালেদ একজন সামরিক কর্মকর্তা। বর্তমানে জাতিসংঘ বাহিনীর সদস্য হিসাবে তিনি সুদানে রয়েছেন। তার পদবী লেঃ কর্ণেল।
আজিজুল হক মানিকের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে সাপ্তাহিক হক কথা’য়। পরবর্তীতে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় তাঁর অনেক ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ ও গল্প প্রকাশিত হয়। তিনি দুটো গ্রন্থ সম্পাদনা করেন এবং তিনি দীর্ঘদিন ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য মাসিক আল ইসলাহ’র সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। বর্তমানে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক জালালাবাদের সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।
১৯৬০ সালের ১৮ মার্চ শহরের ঝরণার পারে তার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ‘গোলাপকুড়ি’ নামের শিশু সংগঠনের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। যা পরবর্তীতে ‘ফুলকুঁড়ি’তে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭৯ সালে মদন মোহন কলেজে ভর্তির পরই তিনি ছাত্র আন্দোলনের এক বলিষ্ঠ নেতা হিসেবে সামনের সারিতে চলে আসেন। যুক্তিপূর্ণ জ্বালাময়ী বক্তৃতার কারণে খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। পর পর ৩ বার মদন মোহন কলেজের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহে তিনি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশন আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগীতায় কলেজের পক্ষ থেকে ২ বার অংশগ্রহণ করেন এবং দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে মদন মোহন কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কলেজে থাকাবস্থায়ই আজিজুল হক মানিক সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮১ সালে সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠের স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতায় তাঁর হাতেখড়ি। পরবর্তীতে দৈনিক জালালাবাদ’র জন্মলগ্ন থেকেই পত্রিকার সাথে সম্পৃক্ত হন এবং বর্তমানে তিনি এ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আজিজুল হক মানিক ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে সংসদের প্রাণপুরুষ মুহাম্মদ নূরুল হক ইন্তেকাল করলে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সাহিত্য সংসদের পাঠাগার আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হলে এর মূল দায়িত্ব পালন করেন আজিজুল হক মানিক। তাঁর নেতৃত্বে একদল তরুণ এ পাঠাগারকে ডিউই ডিসিমেল পদ্ধতিতে রূপান্তর করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম সাহিত্য সংসদের পরিচালনা কমিটির সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
একজন সফল সমাজকর্মী হিসেবে আজিজুল হক মানিক সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে বিপুল ভোটে ১ নং ওয়ার্ডের কমিশনার এবং ২০০৮ সালের আগষ্ট মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২য় বার কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন। সিটি কর্পোরেশনের একজন জনপ্রিয় কাউন্সিলর হিসেবে তাঁর বিভিন্ন কর্মকান্ড সর্বমহলে প্রশংসিত।
লেখক-সমাজকর্মীর পাশাপাশি একজন জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবেও তাঁর আলাদা পরিচিতি গড়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রীধারী আজিজুল হক মানিক শহরের ঐতিহ্যবাহী শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল এন্ড কলেজে দীর্ঘদিন প্রভাষক ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ৪ সন্তানের জনক আজিজুল হক মানিক। তাঁর স্ত্রী শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ কর্মে মাস্টার্স ডিগ্রীধারী দিলওয়ারা বেগম বর্তমানে শিক্ষিকা হিসেবে ওসমানী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত। তাঁর কন্যা নাজমুস সামাহ, পুত্র নাসিফ আলভী হক বিশিষ্ট শিশু শিল্পী হিসেবে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে বহু পুরস্কার লাভ করেছে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কর্মবীর আজিজুল হক মানিক ভাই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মহান আল্লাহ তা’আলা এ কীর্তিমান লেখক-সাংবাদিকের নেক হায়াত ও কর্মময় জিন্দেগীতে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও অশেষ কল্যাণ দান করুন। এই শুভ কামনা রইলো।

(লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সিলেট বাণী।)

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ