আজ মঙ্গলবার, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং

মৌলভীবাজারে মৃত পাঠাগার এবং একটি বেদনা চিঠি

  • আপডেট টাইম : জুলাই ২, ২০১৯ ৩:৪৫ অপরাহ্ণ


মুনজের আহমদ চৌধুরী :: আমা‌দের মৌলভীবাজার জেলা শহ‌রের একমাত্র লাইব্রেরিটা বন্ধ হ‌য়ে গে‌ছে। নতুন ভব‌নে পুর‌নো লাইব্রেরিটা মামা যা‌চ্ছে চো‌খের সাম‌নে। মৌ‌লভীবাজা‌র পাব‌লিক লাইব্রেরি। ষাট বছ‌রের বে‌শি সময় ধ‌রে এ লাইব্রেরি মৌলভীবাজা‌রের মুক্তবু‌দ্ধি ও সাংস্কৃ‌তিক চর্চার কেন্দ্রস্থল ছিল। ষাট থে‌কে শুণ্য দশক পর্যন্ত মৌলভীব‌াজা‌রের প্রজন্ম বিনির্মাণে এ লাই‌ব্রেরির কা‌ছে আমা‌দের অনেক ঋণ। আমার শহ‌রের আজ‌কের প্রজ‌ন্মের অনেকে এসব কথার উত্ত‌রে জা‌নি বল‌বেন, পৃ‌থিবী তো ডিভাইসে চ‌লে যা‌চ্ছে, ই-বু‌কে‌র বাজা‌রে ছাপা বই‌য়ের পাঠক কম।

তা‌দের কী ক‌রে ব‌লি, বুঝাই, পুর‌নো লাল ইটের লাই‌ব্রেরির আগের ভবনটা, লাই‌ব্রেরির পুকুর পার আমার, আমা‌দের উত্তর প্রজ‌ন্মের ‌মৌলভীবাজা‌রের হাজা‌র হাজার মানু‌ষের শৈশ‌বের, তারু‌ণ্যের অংশ। ২০০৫ বা ২০০৬ সা‌লে পড়বার জন্যই লাইব্রেরির সাধ‌ারণ সদস্য হ‌য়ে‌ছিল‌াম।

২০০৮ সা‌লে যৌথ বা‌হিনীর ক্ষমতার আম‌লে এ লাইব্রেরির ইতিহাসে প্রথমবা‌রের ম‌তো সর‌াস‌রি ভো‌টে প‌রিচালনা পর্ষ‌দের নির্বাচন অনু‌ষ্ঠিত হয়। তখন কাজ করতাম অধুনালুপ্ত দৈ‌নিক সি‌লেট প্রতি‌দি‌নে মৌলভীবাজার প্রতি‌নি‌ধি হিসেবে।

সে নির্বাচনে আমি ব‌য়সে সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী হি‌সে‌বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক‌রে সর্বচ্চো ভো‌টে নির্বা‌চিত হই। পাব‌লিক লাই‌ব্রেরির আজীবন সদস্য জেলা ও শহ‌রের পড়ুয়‌া, বর্ষীয়‌ান গুরুজন আর জনপ্র‌তি‌নিধির‌া ছি‌লেন সে নির্ব‌াচ‌নের ভোটা‌র। সা‌বেক সমাজক‌ল্যাণ মন্ত্রী মরহুম সৈয়দ মহসীন আলী ছি‌লেন আমার ন‌মি‌নেশন ফরমে প্রস্তাবকারী।

আর এখন কর্কট ব্যাধি ক্যান্সারে সা‌থে লড়াই করা সিলকো পাইপ ইন্ডাস্ট্রির মা‌লিক তা‌রেক আহ‌মেদ চাচা ছি‌লেন সমর্থনকারী। সে নির্বাচ‌নের আগে একজন মানুষ‌কেও আমি ভো‌টের আশায় সদস্য করা তো দু‌রে থাক, সেস‌বের পথও মাড়াই‌নি।

তখনও লাই‌ব্রে‌রির পদা‌ধিকার ব‌লে সভাপ‌তি ছি‌লেন জেলা প্রশ‌াসক। প্র‌তি‌টি সভায় কর্মচারী‌দের বেতন নি‌য়ে, লাই‌ব্রেরির সংকট, সমস্যা নি‌য়ে কথ‌া বলতাম। প‌রিচালনা পর্ষ‌দে মানুষ যে হতাশ‌াজনক ব‌াস্তবতায় আমা‌কে সব‌চে‌য়ে বে‌শি ভোট দি‌য়ে নির্বাচিত ক‌রে‌ছি‌লেন, আমি আম‌ার ঈমান ও বিবেকের কা‌ছে দায়বদ্ধ থে‌কে চেষ্টা ক‌রে‌ছি লাই‌ব্রেরির কাজ কর‌তে। কর্মচারী‌দের বেতন বন্ধ হ‌লেই লাই‌ব্রেরিয়‌ান সজল দা আজীবন সদ‌স্যের ক‌য়েকটা ফরম তু‌লে দি‌য়ে বল‌তেন টাকার ব্যবস্থা ক‌রো। এখলাছ ভাই, আকবর চাচা, খা‌লিক চাচাসহ কত মানুষ‌কে যে লাই‌ব্রেরির আজীবন সদস্যের ফরম পুরণ ক‌রি‌য়ে‌ছি‌। ব্যক্তিগত উ‌দ্যোগে বহু বই সংগ্রহ বা বেতন না পাওয়া স্টাফদের অসহায়‌ চাহ‌নির জবা‌বে কি কর‌তে পে‌রে‌ছি, কী পা‌রি‌নি সে ব্য‌ক্তিগত হি‌সেব অনুল্লেখ থাকাই সমী‌চিন।

আমা‌দের নির্বা‌চিত আম‌লে সাধারন সম্পাদক নজরুল ইসলাম মু‌হি‌বের নেতৃ‌ত্বে কো‌টি টাকা ব্যা‌য়ে লাই‌ব্রেরীর আজ‌কের সু‌বিশাল ও সুপ‌রিসর ভবন‌টি নি‌র্মিত হয়।

জীব‌নের ফে‌রে আম সহ সে প‌রিষ‌দের অগ্রজ কন্ঠ‌শিল্পী মাহবুবুর রহমান শিবলু, কা‌বেরী রায়, খন্দকার খা‌লিকুর রহমানসহ অ‌নেকেই প্রবাসী হন।

অত্যান্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হ‌লো, ২০০৮ সা‌লে আমরা নির্বা‌চিত হব‌ার পর গত ১১ বছ‌রে লাই‌ব্রেরির প‌রিচালন‌া পর্ষ‌দে আর কোনো নির্বা‌চন অনু‌ষ্ঠিত হয়নি। প‌রিষ‌দের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পর শুধুমাত্র লাই‌ব্রেরির সে‌ক্রেটারি হবার জন্য প‌রিষ‌দেরই একজন খোঁড়া অজুহা‌তে আদাল‌তে মামলা দা‌য়ের ক‌রেন। প‌রে অবশ্য সে মামলা আদাল‌তে খা‌রিজ হয়। সে সময়কা‌লে লাই‌ব্রেরি প‌রিচালনায় এক‌টি এডহক ক‌মি‌টি গ‌ঠিত হয়।

মৌলভীবাজা‌রের তৎকালীন জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান অচলাবস্থা নিরস‌নে চেষ্টা কর‌লেও সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম তার প্রায় তিন বছর মৌ‌লভীবাজা‌রে দা‌য়িত্ব পালনকা‌লে এ ব্যাপা‌রে ছি‌লেন সম্পুর্ণ নীরব। লাই‌ব্রেরীর সভা ডাক‌ার জন্য এডহক ক‌মি‌টি বহু অনু‌রোধ করা তি‌নি সাড়া ‌দেননি। একবারও মি‌টিং ডা‌কেননি। জেলা প‌রিষদ‌কে বার বার অনু‌রোধ করা হ‌লেও জেলা প‌রিষদও লাই‌ব্রে‌রির চা‌বি বু‌ঝে নেবার আগে তারাও কোনো সাহায্য কর‌তে রা‌জি হয়নি।

শুধু লাই‌ব্রেরির সম্পাদক পদ‌টি নি‌য়ে সু‌বিধ‌া‌ভোগী চ‌ক্রগু‌লির ইতরা‌মি সৃষ্ট এ অচল‌াবস্থার কার‌ণে প‌ত্রিকার বিল, কর্মচারী বেতন দেয়‌া বন্ধ হবার প্রে‌ক্ষি‌তে লাই‌ব্রেরি আজ পু‌রোপু‌রি বন্ধ হবার প‌থে।

এ কথা স্বীকার কর‌তেই হ‌বে, সরকারী ক‌লে‌জের সা‌বেক ভি‌পি নাট্যকার আবদুল ম‌তিন আমাদের বহু ম‌ানুষ‌কে সম্পৃক্ত ক‌রে লাই‌ব্রেরির ২০০৮ সা‌লে নির্বাচ‌ন অনুষ্ঠান ও লাই‌ব্রেরিতে গণতন্ত্রায়‌নে মুখ্য ভূ‌মিকা পালন ক‌রেন। কিন্তু সরকারি চাকরিরত থাকায় আইন ও গঠনতন্ত্র অনুসা‌রে তি‌নি সেসময় প‌রিষ‌দের নির্বা‌চিত সদস্য‌দের সমর্থন থাকা স‌ত্ত্বেও লাই‌ব্রেরির সম্পাদক হ‌তে পা‌রেননি।

মাস তি‌নেক আগে মা‌র্চে এক শুক্রবা‌রে ম্যা‌নেজার স্টলের উ‌ল্টো‌দি‌কে গা‌ড়ি পার্ক ক‌রে রাস্তা পেরুবো, এমন সময় পেছন থে‌কে ডাক দি‌লেন ম‌তিন ভাই। আমা‌দের শহ‌রের বাগ্মী বক্তা, ভি‌পি ম‌তিন ভাই। সাধনার বেঞ্চি‌তে ব‌সে কথা হ‌লো খ‌া‌নিকক্ষণ। ম‌তিন ভাই‌য়ের স‌ঙ্গে সে‌দিন আমা‌দের শহ‌রের পুর্নকালীন ক‌বি পুলক কা‌ন্তি ধরও ছি‌লেন।

ম‌তিন ভাই‌ আমা‌কে বল‌লেন, তি‌নি উপ‌জেলা ভাইস চেয়ারম্যান প‌দে নির্বাচন কর‌বেন। সহ‌যোগিতা চাই‌লেন। আমি তা‌কে বললাম, আপ‌না‌কে ভাইস চেয়‌ারম্যান পদে আমি সমর্থন ক‌রি না,‌ আর সেটা আপন‌ার জায়গ‌াও নয়। আপন‌ার জায়গ‌া তো লাই‌ব্রেরি অথবা শিল্পকলা।

সে‌দিন তার সা‌থে কথা যা হ‌য়ে‌ছিল, প্রায় সবটাই লাই‌ব্রেরি নি‌য়েই। তিনি লাই‌ব্রেরি নি‌য়ে সৃষ্ট বি‌ভিন্ন সংক‌টের কথা বল‌লেন। এক পর্য‌া‌য়ে আমি তা‌কে বললাম, বর্তমান এমপির সা‌থে আমার দেখা যোগ‌া‌যে‌াগ দু‌টোই কম। তারপরও চলুন আমি নি‌জে আপনা‌কে বর্তম‌ান এম‌পি নেছ‌ার আহ‌মে‌দের কা‌ছে নি‌য়ে যাব… লাই‌ব্রেরিটা বন্ধ হ‌য়ে যা‌বে ম‌তিন ভাই। ম‌তিন ভাই বল‌লেন জানা‌বেন, আর জানাননি।

লেখক: সাংবা‌দিক, লন্ড‌ন।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ