আজ বৃহস্পতিবার, ১২ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

প্রকাশ হয় না দলিল ‘জালিয়াতির’ তদন্ত রিপোর্ট

  • আপডেট টাইম : July 9, 2019 12:13 PM

মো. মুহিবুর রহমান (অতিথি প্রতিবেদক)

সিলেট : সিলেট সদর সাব রেজিষ্ট্রার অফিসে অনিয়ম ও জালিয়াতির সাথে জড়িতদের শাস্তি না হওয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতি বেড়েই চলছে। প্রতিদিন সেবা পেতে গিয়ে অনিয়ম ও হয়রানীর শিকার হতে হয় অনেককে। এ থেকে রেহাই পেতে দলিল জালিয়াতিসহ অনিয়মের তদন্ত কার্যক্রমের দীর্ঘ সুত্রিতাকে দায়ি করেন অনেকই। তারা মনে করেন জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসলে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও জালিয়াতি কিছুটা হলে হ্রাস পাবে।

সিলেটের সদর সাব রেজিষ্ট্রার অফিসে মোমিনখলা মৌজার প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের ৩০ শতক জমির দলিল জালিয়াতির ঘটনার তদন্ত কার্যক্রমের দীর্ঘ সুত্রিতা দেখা দিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠনের প্রায় দেড় মাস পর জকিগঞ্জ বহর রেজিষ্ট্রারী অফিসের সাব রেজিষ্ট্রার শেখ নাসিমুল আরিফকে তদন্তের দায়িত্বভার দেয়া হয়। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর অভিযুক্ত কয়েক জনের সাক্ষ্য নেন। এর পর তিনি অন্যত্র বদলি হলে তদন্ত কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে।

এরপর ফেঞ্চুগঞ্জ সাব রেজিষ্ট্রার অফিসের সাব রেজিষ্ট্রার মো.মিজহারুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পর তদন্তে তেমন অগ্রগতি হয়নি এ আলোচিত ঘটনায়। প্রায় ১৪ বছর পর ২০০৩ সালের ভলিয়মে মোমিনখলার বাসিন্দা এ দলিলের দাতা আব্দুর রহমান ও গ্রহিতা নুরী ওয়াদুদকে দেখানো হয়েছে। দুজন সম্পর্কে পিতা ও কন্যা। এর মধ্যে পিতা আব্দুর রহমান মারা গেছেন এবং কন্যা নুরী ওয়াদুদ যুক্তরাজ্যে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন। গত বছর ১৬ অক্টোবর সিলেট সদর সাব রেজিষ্ট্রার অফিসে জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পায়। ঐদিন রেকর্ড রুমে সকালে নকল নবিশ মুহিবুর রহমান জিলু নামে একটি দলিলের নকলের জন্য আবেদন করা হয়। তার স্বাক্ষরের সাথে মিল না থাকায় জিলুকে রেকর্ড রুমের একজন ফোন দিয়ে বিষয়টি জানায়।

তখন তিনি রেকর্ড রুমে গিয়ে নিশ্চিত করেন, তিনি নকলের জন্য কোন আবেদন করেন নি। তখন রেকর্ড রুম থেকে জানানো হয় সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসেরই একজন সিনিয়র নকল নবিশের নাম দিয়ে কালাম নকলের জন্য আবেদন করে। কালাম দালালির সাথে জড়িত। তখন নকলের জন্য আবেদনকারী দালাল কালামকে ডেকে আনা হয়। সে জানায়, উমেদার নাহিদ তাকে আবেদন জমা দিতে বলেছে।

উমেদার নাহিদ জানায়, নকল নবিশ মাহমুদ এর মূল হোতা। ঘটনার সাথে জড়িত বলে নকল নবিশ নুরুজ্জামানের নামও চলে আসে তখন। ঘটনাটি প্রকাশের পর একে অন্যের উপর দোষ চাপালেও মাহমুদ আত্মগোপনে চলে যায়। বিষয়টি নিয়ে রহস্য আরো ঘণিভূত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে সম্পাদিত ১০৬৬৬ নং দলিল যার ভলিয়ম নং ১২০ ও পৃষ্ঠা ২৯০। সিলেট নগরীর মোমিনখলা মৌজার ৩০ শতক জায়গার দলিলটি সম্পাদিত হয় বলে নকলের আবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে ভলিয়মে শেষের দিকে আরো পৃষ্ঠা থাকলেও ২৮৯ পৃষ্ঠার ভলিয়ম বন্ধ করে দেন সাব রেজিষ্ট্রার। কিন্তু যে দলিলটির নকলের জন্য আবেদন করা হয়েছে ২৯০ পৃষ্ঠার লিপি বন্ধ। বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, কোন নকল নবিশ সুকৌশলে সাব রেজিষ্ট্রারের লেখা ঘষামাজা করে তুলে পৃষ্ঠা বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার একটি ভলিয়ম যিনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ঠিক হাতের লেখার অনরূপ ঐ দলিলটি লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। যেখানে কোন অবস্থাতেই একই নাম্বারে দুটি দলিল করা হয়না। সেখানে একই বছরে ১০৬৬৬ এই নাম্বারে অন্য একটি দলিল সম্পাদিত হয়েছে।

অভিযুক্ত উমেদার নাহিদ, উমেদার নবজিতসহ জড়িতরা প্রায় জালিয়াতি ও একটি অগ্নি সংযোগের ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন।

কিন্তু জেলা সদর সাব রেজিষ্ট্রারী অফিসের সহায়ক (উমেদার) মো. নাহিদ আকবর জানান, মূলত এ ঘটনাটি বালাম বহি নিয়ে ঘটেছে। বালাম বহির সম্পূর্ণ দায়িত্বে থাকেন রেকর্ড কিপার। ফলে এই ঘটনার সাথে তাকে শত্রুতা বসত জাড়ানো হয়েছে বলে তিনি দাবী করেন।

এ ঘটনায় গত বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সিলেট জেলা সাব রেজিষ্ট্রারকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিকে এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেয়া হলেও দীর্ঘ এক বছরেও রিপোর্ট দাখিল করা হয়নি। এতে অপরাধীরা লাগামহীন ভাবে সুকৌশলে সিলেট জেলা সাব রেজিষ্ট্রারী অফিসে জালিয়াতির অপকর্ম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিলেট সদর সাব রেজিষ্টারী অফিসে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, দলিলের নকল তুলতে এসে কয়েক মাস ধরে হয়রানী শিকার হচ্ছেন। অনেকে আবেদন করে অনেক টাকা দিয়েও নকল তুলতে পারেননি। এ অফিসে আসলে কর্মকর্তা, অফিস সহাকারী ও পিয়ন থেকে শুরু করে মোহরিরকে পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। তিনি এ অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দাবী জানান।

বাংলাদেশ নকল নবিশ সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি সাহাব উদ্দিন জানান, সিলেট সাব রেজিষ্ট্রারী অফিসে বিভিন্ন সময় অনেক অনিয়ম, জালিয়াতি ঘটনা ঘটেছে। প্রথম পর্যায়ে তা নিয়ে আলোচনা হয়। পরে তা প্রভাবশালীদের চাপে স্থিমিত হয়ে যায়। যার ফলে অপরাধীরা সাহস পায়। এসব অপকর্মের তদন্ত রিপোর্ট সঠিক সময়ে প্রকাশ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তারা এসব অপকর্ম করতে সাহস পেত না।

বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মাহমুদ আলী জানান, সিলেট সাব রেজিষ্ট্রারী অফিসে বিভিন্ন সময় জালিয়াতিসহ নানা ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার অনেকই চাপা পড়ে যায়। অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ায় তারা অপকর্ম চালাতে সাহস পায়। তাই তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরী বলে তিনি মনে করেন।

সিলেট জেলা সাব রেজিষ্ট্রার জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, সিলেট সাব রেজিষ্ট্রার অফিসে এখন জালিয়াতিসহ অপরাধ কমাতে আমি সবাইকে নিয়ে চেষ্টা করছি। সবাইকে ডেকে আমি সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করে জনগনকে সেবা দিতে বলেছি। তিনি জানান মোমিনখলা মৌজার ২০০৩ সালের ১০৬৬৬ নম্বর দলিল জালিয়াতির তদন্ত রিপোর্ট এখনও জমা হয়নি। আগের তদন্ত কর্মকর্তা জকিগঞ্জের বহর সাব রেজিষ্ট্রার অফিসের সাব রেজিষ্ট্রার শেখ নাসিমুল আরিফ দক্ষিনাঞ্চলের একটি উপজেলায় বদলী হয়ে যাওয়ায় ফেঞ্চুগঞ্চ সাব রেজিষ্ট্রার মো. মিজহারুন ইসলামকে পুনরায় তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে তদন্ত কাজ শেষ হওয়ার পর তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ