আজ মঙ্গলবার, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং

চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত হাওরবাসী

  • আপডেট টাইম : জুলাই ১০, ২০১৯ ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ

জেলা প্রতিনিধি

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের ৭৬টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার না থাকায় জেলা-উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন হাওরবাসী স্বাস্থ্য সেবা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এই শ্লোগানটি আজো স্বপ্নের সুমধুর বুলি হয়ে আছে।

দুই তলা ভবন, বারান্দার নীচে গ্রামের যুবকরা তাস, লুডু খেলে অবসর সময় পার করে। উপরে দুই ইউনিটে ডাক্তার থাকার ব্যবস্থা, নীচের তলায় দুই পাশে রয়েছে কয়েকটি কক্ষ। তবুও সেখানে ডাক্তার থাকেন না। পাকনা হাওর অধ্যুষিত জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের লক্ষীপুর বিলপাড় হাটিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের দৃশ্য এমনটিই। এই ইউনিয়নে প্রায় ৩৩ হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার একমাত্র স্বাস্থ্য কেন্দ্র এটি।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাওরের জেলার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোর এমন বেহাল দশা। সুনামগঞ্জে ২২ টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ৫৪ টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। মোট ৭৬ টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এরমধ্যে ৪ টিতে মেডিকেল অফিসার (এমবিএস ডাক্তার) পদায়ন থাকলেও ৩ জন ডাক্তার সংশি¬ষ্ট উপজেলা সদর হাসপাতালে কাজ করছেন, অন্য একজন প্রায় আড়াই বছর যাবৎ বিনা অনুমতিতে দেশের বাইরে আছেন। অর্থাৎ জেলার কোন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই ডাক্তার নেই।

ফেনারবাঁক ইউনিয়নের বাসিন্দা কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক বছর ধইরা লক্ষ্মীপুর গ্রামে এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রডা অইছে, কিন্তু আইজো কোন ডাক্তার আইছেনা। মাঝে মাঝে এক মহিলা আইয়া কিছু সময় থাইক্যা চইলা যায়। এইভাবে এইডা চলতাছে। আমরা গরীব মানুষ এই খানে চিকিৎসাডা পাইলে কতযে ভালা অইতো কইবার মতো না। দেহেন না লেইখ্যা সরকারে যদি একটা ডাক্তার দেয় আমরা শান্তি পাইমু।’ রুজিনা আক্তার বলেন, ‘ভাই কত কষ্টে আছি মহিলারার কত রোগ-শোক আছে কয়ন যায়না। মাঝে মাঝে এক আপা আয় কিছু বড়ি-বাড়া নেই। আপা যদি সব সময় থাকতো আমরার জানডা শান্তি পাইতো।’ এভাবেই মনের আকুতি বলছিলেন সেবা নিতে আসা কৃষক নজরুল ইসলাম ও রোজিনা বেগম। উপজেলার সদর ইউনিয়নের কালাগুজা গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ‘সোনার বাংলা দাতব্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রে’ও একজন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা। কিন্তু এখানেও থাকেন না কোন ডাক্তার। সেবা নিতে আসা রহিম আলী বলেন, মাঝে মাঝে একজন চিকিৎসা সহকারী জামালগঞ্জ থেকে এসে কিছু সময় সেবা দিয়ে যান। আমরার সেলিমগঞ্জ বাজার কাছে থাকায় বেশীর ভাগ রোগী ফার্মেসী থেকেই ওষুধ কিনে নিয়ে যায়। সবসময় যদি একজন ডাক্তার থাকতো গরীব মানুষের খুবই উপকার হতো।

এদিকে, দোয়ারাবাজার উপজেলার স্থানীয় একজন গণমাধ্যম কর্মী জানান, লক্ষীপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের একাংশের বাসিন্দারা এখানে জরুরি চিকিৎসা নিতে আসেন। লক্ষীপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে কয়েকদিন আগে শিশু কন্যাকে জ্বর ও ডায়রিয়ার জন্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন একজন অভিভাবক, ভিজিটর আপা বলে দিয়েছেন প্যারসিটামল ছাড়া আর কিছুই নেই, ৩ টা প্যারাসিটামল হাতে তুলে দিয়ে জ্বর থাকলে তিন বার তিনটা খাওয়ার জন্য বলে দেন এবং বাজার থেকে স্যালাইন এনে খাওয়ার জন্য বলেন। লক্ষীপুরের পাশের এরোয়াখাই গ্রামের আব্দুর রহিম জানালেন, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারকে অফিস সময়েই ভিজিট দিয়ে রোগী দেখাতে হয়। অফিস সময়ে বাইরে রোগী দেখতেও যান তিনি। লক্ষীপুর গ্রামের বাসিন্দা ফারুখ আহম্মদ জানান, কোন ডাক্তারই এখানে স্থায়ীভাবে থাকেননা। কম্পাউন্ডাররাই ডাক্তার হিসাবে কাজ করছেন। প্রতিদিন অসংখ্য রোগিকে তাদের সামাল দিতে হয়। ডাক্তার না থাকায় ইউনিয়নবাসী স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

লক্ষীপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপ সহকারী মেডিকেল অফিসার মো. মনিরুল ইসলাম বললেন, ঝাড়– দেওয়া থেকে শুরু করে সব কাজই আমাকে একাই করতে হয়। এখানে মেডিকেল অফিসার, ফার্মাসিস্ট ও অফিস সহায়কের পদ থাকলেও সবই শূন্য। ২০১৬ এর শেষের দিকে এই উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগদান করি, দুই মাস ডা. রাশেদুল হাসানকে পেয়েছিলাম। তিনি চলে যাবার পর আর কেউ এখানে আসেননি। গড়ে প্রতিদিন ৪০-৪৫ জন রোগী আসে। এই ইউনিয়নের ছাড়াও আশপাশের লক্ষীপুর, ভোগলা, সুরমা ও রঙ্গাচরের একাংশের মানুষ এখানে চিকিৎসার জন্য আসে। ওষুধ যা বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা দিয়ে তিন মাস চলে না।

সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস কে ফোন দিলে তিনি বলেন, হাওর এলাকায় ডাক্তাররা এসে থাকতে চান না। সুনামগঞ্জে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ২২ টি, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ৫৪ টি। বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে চাচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য, এ ব্যাপারে কাজও চলছে। আশা করি এই সরকারের আমলেই সকল স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ