আজ বুধবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং

ধর্ষক ডা. মাহির প্রতি উদার ওসমানী হাসপাতাল

  • আপডেট টাইম : August 26, 2019 8:36 AM

অতিথি প্রতিবেদক

সিলেট : ধর্ষিতা বদ্ধ ঘরে ডুকরে কাঁদে আর ধর্ষক বুক ফুলিয়ে হাঁটে। কেবল বুক ফুলিয়ে হাঁটাই নয় বরং ইন্টার্নশিপ করার জন্য চালাচ্ছেন তোড়জোড়। ওসমানী হাসপাতালের ইন্টার্ন ডাক্তার কর্তৃক রোগীর স্বজন কিশোরী ধর্ষণ ঘটনার বর্তমান অবস্থা এমনই। কেবল তাই না ধর্ষক মাকামে মাহমুদের প্রতি উদার ওসমানী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমনকি এটিকে পূর্ণাঙ্গ ধর্ষণ বলতেই নারাজ তারা।

২০১৮ সালের ১৫ জুলাই দিবাগত রাতে অসুস্থ নানীর সাথে ওসমানী হাসপাতালের তৃতীয় তলার ৮নং ওয়ার্ডে ছিলো ওই কিশোরী। গভীর রাতে ফাইল দেখার কথা বলে ওই কিশোরীকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন নাক-কান-গলা বিভাগের ইন্টার্ন চিকিৎসক মাকামে মাহমুদ মাহী। পরদিন সকালে কিশোরী তার স্বজনদের বিষয়টি জানায়। পরে কিশোরীর স্বজনরা বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালে কর্তৃপক্ষ মাহীকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। সেই সাথে ওই দিনই (১৬ জুলাই) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাক-কান-গলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এন.কে সিনহাকে সভাপতি করে ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি টিম গঠন করে।

তদন্ত টিমের বাকি ৪ সদস্য হলেন- হাসপাতালের উপ-পরিচালক (তৎকালীন) ডা. দেবপদ রায়, গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জামিলা খাতুন, আরএস ক্যাজুয়ালটি ডা. শ্যামল চন্দ্র বর্মণ এবং সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী জান-ই আলম।

এ কমিটিকে ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিলেও বার বার সময় বাড়িয়েও দিতে পারেননি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। সবশেষে তদন্ত অসম্পন্ন রেখেই প্রতিবেদন দিয়েছেন তারা। তাই অপরাধী ইন্টার্নি করার জন্য আবেদন করলেও ধর্ষীতা ওই কিশোরী পড়ালেখা বাদ দিয়ে বলতে গেলে ঘরেই বন্দী।

কিশোরীর পিতা বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি তাকে ইন্টার্নি করার সুযোগ দেন তাহলে আমরা মর্মাহত হব। তাছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন পদক্ষেপের খবর শোনে আমরা শঙ্কিত।

তার মেয়ে বর্তমানে কোন অবস্থায় আছেন এমন প্রশ্নে কিশোরীর বাবা বলেন, আমার মেয়ে পড়ালেখা বাদ দিয়ে বর্তমানে ঘরেই আছে। যদিও ঘটনার দীর্ঘদিন হয়ে গেছে তবুও মাকামে মাহমুদ জামিনে বেরিয়ে আসায় সে বিচার নিয়ে অনেকটা মনোবল হারিয়ে ফেলেছে। তাই আমরা সঠিক বিচারটাই চাই। কর্তৃপক্ষ যেন কোন অবস্থাতে তার মতো একজন অপরাধীকে ইন্টার্নি করার সুযোগ না দেন সে অনুরোধও জানান তিনি।

এদিকে এ ঘটনায় ওসমানী হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) থেকে যে মেডিকেল রিপোর্ট দেয়া হয়েছিলো সেখানে কিশোরীকে ধর্ষণের প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে মর্মে প্রতিবেদন দিলেও পরবর্তীতে ডিএনও টেস্ট রিপোর্টে বীর্যের উপস্থিতি না পেয়ে মেয়ের যৌনাঙ্গ বরাবর লেগে থাকা কাপড়ে ইন্টার্ন ডাক্তার মাকামে মাহমুদ মাহীর মুখের লালা পাওয়া যাওয়ায় এটিকে পূর্ণাঙ্গ ধর্ষণ না বলে বরং তার প্রতি উদার মনোভাব দেখাচ্ছেন ওসমানী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুধু তাই নয়, তাকে ইন্টার্নি করার সুযোগ দিতে মাকামে মাহমুদ কর্তৃক করা আবেদন পাঠানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর।

এ ব্যাপারে ওসমানী হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। আমি আসার পর তদন্ত কমিটি একটি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। তবে যেহেতু ঘটনাটি আদালতে বিচারাধীন তাই এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করা যাচ্ছে না।’

তবে ‘মানুষ বলতে ভুল হতেই পারে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মাকামে মাহমুদ জামিনে বেরিয়ে আসার পর তার পক্ষ থেকে ইন্টার্নশিপ করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। সে আবেদন ডিজি হেলথ বরাবর পাঠানো হয়েছে। মানুষ বলতে ভুল হতেই পারে। যেহেতু ইন্টার্নিশিপটা তার একটি পেশাগত ব্যাপার। সে ক্ষেত্রে তার প্রতি সিম্প্যাথি দেখানো উচিৎ। সুতরাং তার আবেদন আমরা ডিজি হেলথ বরাবর পাঠিয়েছি। এখন ডিজি হেলথ যদি অনুমতি দেন তাহলে আমরা তাকে ইন্টার্নিশিপের ব্যবস্থা করে দিবো।’

এটা ভুল নাকি অপরাধ এমন প্রশ্নে ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, যেহেতু ডিএনও রিপোর্ট অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ ধর্ষণ প্রতীয়মান হয়নি। বীর্যের উপস্থিতি না পেয়ে মুখের লালা পাওয়া গেছে। সুতরাং এটা আংশিক।

একটা মেয়ের যৌনাঙ্গে কোন পুরুষের লালা পাওয়া গেছে ঘটনাটি কেন সাধারণভাবে দেখছেন বা যেহেতু আদালতে বিচারাধীন এমতাবস্থায় বিচার কার্য শেষ না হতেই ইন্টার্নশিপের আবেদন গ্রহণ করে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাবর পাঠানো যুক্তিযুক্ত কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন- ‘আমি এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে চাই না, আপনি হাসপাতালে এসে পরিচালক সাহেবের সাথে কথা বলেন বলে ফোন কেটে দেন।’

অপরদিকে মাকামে মাহমুদের এ মামলাটি সিলেট মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালত থেকে বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। এ মামলার চার্জ গঠনের দিন গত ২১ আগস্ট থাকলেও বিচারক উপস্থিত না থাকায় আগামী ১৮ নভেম্বর তারিখে পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে বলে কোর্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে একজন ধর্ষকের সাথে নিজেরা ইন্টার্নি করবেন না জানিয়ে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন ডাক্তার এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. হরশিত বিশ্বাস বলেন, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে কেউ যৌনমিলন করলে তার বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যাবে না এটা স্বাভাবিক। তাছাড়া একটি মামলা কোর্টে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তাকে ইন্টার্ন করার সুযোগ দেয়া কোনভাবেই উচিৎ হবে না। তবুও যদি কোন কারণে তাকে সুযোগ দেয়া হয় তাহলে আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন ধর্ষকের সাথে ইন্টার্নি করব না। কারণ ধর্ষকের আলাদা কোন পরিচয় হতে পারে না। উনি (মাকামে মাহমুদ) আমাদের এক বছরের সিনিয়র। তবুও সে সময়েই আমাদের বড় ভাই-আপুরা উনার এ ঘটনায় শাস্তি দাবি করে আন্দোলন করেছিন। এমতাবস্থায় উনার সাথে ইন্টার্নি করার প্রশ্নই আসে না।’

বিষয়টির এমন হলে সুশাসনের অভাবে ন্যায় বিচার ব্যাহত হতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী।

তবে নারী মুক্তি সংসদ কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা শাখার সভাপতি ইন্দ্রাণী সেন বলেন, বিচার কার্য শেষ না হলে তাকে ইন্টার্নি করার অনুমতি দেয়া আর ধর্ষককে সমর্থন করা একই কাজ। তাই নারীদের প্রতি নিপীড়নের এই সময়ে কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াবেন এমনটাই আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে বির্য হোক আর মুখের লালা হোক এটা যৌন নিপীড়নমূলক অপরাধ উল্লেখ করে সিলেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. দেবপদ রায় বলেন, তৎকালীন সময়ে আমি যখন উপ-পরিচালক ছিলাম তখন আমি তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলাম। সে কমিটির একজন সদস্য হিসেবে আমি বলবো যেহেতু অভিযুক্ত ডাক্তারের জবানবন্দি গ্রহণ করা যায়নি তাই অনেকটা অসম্পূর্ণ রেখেই তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। তবে তার বির্য পাওয়া না গেলেও একটি মেয়ের স্পর্শকাতর জায়গায় লালা পাওয়া যাওয়া মানে কি যৌন অপরাধ নয়; প্রশ্ন করেন তিনি।

তিনি বলেন, যদি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহা পরিচালক তাঁর মন্তব্য চান তাহলে তিনি অবশ্যই এ ঘটনার সঠিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরবেন বলে জানান।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ