আজ বুধবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং

হবিগঞ্জ হাসপাতাল এখন নিজেই রোগী!

  • আপডেট টাইম : September 1, 2019 9:10 AM

জেলা প্রতিনিধি

হবিগঞ্জ : ডাক্তার, নার্স, স্টাফ, বেড আর ওষুধ সংকটের ফলে হবিগঞ্জ আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালটি এখন নিজেই রোগীতে পরিণত হয়েছে। জেলার ২১ লাখ জনসংখ্যার চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে সম্প্রতি ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে উন্নীত হওয়া হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালটি। এখানে একদিকে যেমন ডাক্তার সংকট অন্যদিকে রয়েছে সিনিয়র স্টাফ নার্স, স্টাফ নার্সসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকট। সেই সঙ্গে নেই হাসপাতালে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহেরও ব্যবস্থা। নেই পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধের সরবরাহ।

এতকিছুর পরেও নানা জোড়াতালি দিয়ে মাসের পর মাস নামমাত্র চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালটি। যে কজন ডাক্তার কর্মরত আছেন তাদের মধ্যেও রয়েছে চিকিৎসাসেবা দিতে অনীহা।

২০১৪ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হবিগঞ্জ সফরে এলে এই হাসপাতালকে ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন। তার ঘোষণার পরপরই দ্রুত তা বাস্তবায়ন হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগেই বরাদ্দ দেন সম্পূর্ণ নতুন ও অত্যাধুনিক একটি আট তলা ভবনের। সেই অনুযায়ী একটি ভবনও নির্মিত হয়। তবে ভবনটি বর্তমানে অনেকটা পরিত্যক্ত। হাসপাতালটি এখনো চলছে সেই পূর্বের ৫০ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়ে। শুরুতে হাসপাতালটি ছিল ৫০ শয্যার, পরে সেটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। কিন্তু ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ১০০ শয্যায় উন্নীত হলেও আজও এর জনবল সৃষ্টি হয়নি।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ন্যূনতম ৫৬ জন চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু হবিগঞ্জ হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩৮টি। যার মধ্যে অধিকাংশ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে।

হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখানে বাড়েনি বেড, ডাক্তার, নার্স বা স্টাফদের সংখ্যা। জেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা দেন মাত্র আটজন ডাক্তার। সে হিসাবে দুই লাখ ৩১ হাজার ২৫০ জন রোগীর চিকিৎসা দেয়ার দায়িত্বে একজন ডাক্তার। তবে খাতা-কলমে ২১ জন ডাক্তার থাকলেও পাঁচজন আছেন প্রেষণে। শুধু বেতন-ভাতা তুলছেন এই পাঁচজন। আবার অবশিষ্ট ১৬ জনের মধ্যে অন্যত্র প্রেষণে চলে গেছেন আরও আটজন ডাক্তার। আবার ওই আটজনের মধ্যে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে প্রেষণে চলে গেছেন আরও দুই ডাক্তার।

ফলে ছয়জন ডাক্তার প্রতিদিন সেবা দিচ্ছেন আট শতাধিক রোগীর। এমন পরিস্থিতিতে রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠছেন তারা। এখানে নেই কোনো সার্জারি ডাক্তার। জরুরি বিভাগে কর্মরত ডাক্তাররা ওই বিভাগে কাজের পাশাপাশি ৫০-১০০ জন রোগীও দেখছেন তারা। হাসপাতালে জরুরি প্রসূতি সেবাকেন্দ্র চালু থাকলেও নেই গাইনি ডাক্তার।

হাসপাতালের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হাসপাতালে মোট ৪০ জন ডাক্তারের পদ আছে। এর বিপরীতে ২১ জন কর্মরত আছেন। এর মধ্যে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (চক্ষু) বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল ঢাকায় বেশ কয়েক বছর ধরে সংযুক্ত আছেন। মেডিকেল অফিসার ১৪টি পদের বিপরীতে আটজন কর্মরত থাকলেও তাদের মধ্যে দুজন হবিগঞ্জ শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে সংযুক্ত আছেন। বাস্তবে হাসপাতালে কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন।

মেডিকেল অফিসার আয়ুর্বেদ নরসিংদী জেলা হাসপাতাল এবং সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা বরিশাল সিএস অফিসে প্রেষণে আছেন। সিনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন), সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি), সিনিয়র কনসালট্যান্ট (ইএনটি), সিনিয়র কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া), অ্যানেসথেটিস্ট, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (চক্ষু), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (রেডিওলজিস্ট), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অর্থো-সার্জারি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু), আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার, প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, মেডিকেল অফিসার (রক্ত) ও হেলথ এডুকেশন কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদের ডাক্তার নেই। ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার তিনটি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে দুটি। অথচ সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য ৫৮টি ডাক্তারের পদ রয়েছে।

হাসপাতালটির নানা সংকট সম্পর্কে জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা (ইএমও) দেবাশীষ দাশ বলেন, ‘প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ৩০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। চিকিৎসা নেন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী। এক্ষেত্রে জরুরি বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ২৪ ঘণ্টাই একজন ডাক্তার থাকা প্রয়োজন। এখানে অন্যান্য পদের ডাক্তারদের এনে সেবা দিতে হয়। জরুরি বিভাগের ডাক্তারদেরই সার্জারি করতে হয়, আবার ওয়ার্ডেও ডিউটি করতে হয়। রেস্টলেস কাজ করতে হয় আমাদের। কারও পক্ষে তেমন ছুটি কাটানোরও সুযোগ হয় না।’

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার রথীন্দ্র চন্দ্র দেব বলেন, ‘একটি হাসপাতালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ মেডিসিন, গাইনি, সার্জারি ও শিশু। কিন্তু এসব পদের ডাক্তার এখানে নেই। জরুরি প্রসূতিসেবা পর্যন্ত বাইরে থেকে ডাক্তার এনে দিতে হয়। কর্মরত ডাক্তাররা সেবা দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।’ হাসপাতালটিতে দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে চিকিৎসাসেবা গতিশীল করতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ