আজ বুধবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

নিয়মিত বেতন পান না শাবির ৯৭ নিরাপত্তাকর্মী

  • আপডেট টাইম : সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯ ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

শাবি : ক্রীতদাস হিসেবে মানুষকে ব্যবহারের ঘটনা এই আধুনিক যুগে না থাকলেও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তার একটি প্রতিবেদনে বলেছিল বিশ্বে অনেক মানুষ এখনো দাসত্বের শিকার হয়েছে। যারা বাধ্য হয়ে কাজ করে আর এদের আধুনিক দাস বলে। তেমনই পরিস্থিতির স্বীকার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) ‘যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিস লিমিটেড’ এর অধীনে চাকরি করা নিরাপত্তা কর্মীরা।

চাকরি করে, মাসের পর মাস পার হয় কিন্তু বেতন আর হয় না তাদের। গত তিন মাস ঘুরিয়ে বেতন হয়েছে মাত্র এক মাসের। চাকরিতে প্রবেশের পরে প্রথমদিকে বেতন হলেও এর সিংহভাগ মধ্যস্বত্বভোগীরা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাদা স্টাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছে ভুক্তভোগীরা। এসকল নিরাপত্তা-কর্মীরা যেন দাস না হয়েও ক্রীতদাস।

এই নিরাপত্তা-কর্মীদের প্রতিমাস শেষে পরবর্তী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধ করার নিয়ম থাকলেও গত জুলাই এবং আগস্ট মাসের বেতন তারা পায়নি। দুই মাসের বেতন তাদের পাওনা হলেও জুন মাসের বেতন হয়েছে গত বুধবার। নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় নিম্ন আয়ের এই মানুষ গুলো খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে কথা বলে এমন অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে বারবার। এমন পরিস্থিতি তাদের একার নয়, শাবিতে যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিস লিমিটেডের অধীনে কর্মরত প্রায় ৯৭জন নিরাপত্তাকর্মীর।

এসময় তারা আরও জানান, চাকরিতে প্রবেশের সময় তাদের বেতন ১৪ হাজার ৪৫০ টাকা জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিকে তাদের বেতন দেওয়া হয়েছে ৮ হাজার টাকা করে। মাঝে এপ্রিল ও মে মাসের সম্পূর্ণ বেতন সোনালী ব্যাংকের নতুন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পেলেও আবারও আটকে যায় কোন কারণ ছাড়াই। এদিকে নিরাপত্তাকর্মীদের বেতনের অনিয়ম ও ন্যায্য বেতন থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা গত ২৫শে জুলাই মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ পালন করেন।

নিরাপত্তাকর্মীদের তদারক করা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দপ্তরে গত বুধবার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিমাস শেষে পাঁচ তারিখের মধ্যে বিগত মাসের বেতন তালিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দপ্তরে জমা দিতে হয়। পরে সেই তালিকা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কোম্পানির কাছে নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন হস্তাতর করবে।

পরে কোম্পানি ১০ তারিখের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন পরিশোধ করার নিয়ম থাকলেও অনেক বলার পরে কিছুদিন আগে জুন মাসের তালিকা জমা দেয়। তাতে বারবার ভুল করায় শেষমেশ গত বুধবার পেয়েছে জুন মাসের বেতন। কিন্তু বাকি মাস গুলোর অসম্পূর্ণ বেতন তালিকা জমা দিলে পরে তাকে ঠিক করে জমা দিতে বলা হলেও সে এখনো জমা দেয়নি। এছাড়াও তাদের বেতন তালিকা নিয়মিত জমা দেওয়া হয় না কেন? এই মর্মে কোম্পানিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে কারণ দর্শানোর জন্য বলা হয়েছে।

এবিষয়ে যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রেজার সাথে কথা বললে তিনি বলেন, এখানে যারা আমার এই কাজ গুলো করে, অফিস এবং আমার লোকের মধ্যে সম্পর্ক মনে হয় ভালো নেই। যার জন্য এরা একটা বিল জমা দেয় নানান ভুল ধরে এবং নতুন করে আবারও করতে হয়। এতে গরিব অসহায় লোক গুলো ভুগতেছে। আমি ভিসির সাথে কথা বলছি। স্যার আমি যেহেতু ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না তাহলে আমার এটা বাতিল করে দেন। কারণ আমি চাই না আমার দ্বারা কোন লোক ক্ষতিগ্রস্থ হোক। আমি তাদের বলবো তারা যেন পরবর্তী মাস গুলোর বেতনের ব্যবস্থা করে। এর আগে (৪ সেপ্টেম্বর) এবং এবারও তিনি বেতন অনিয়মের কারণ বিষয়টি জানতে কোম্পানির সিলেটের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীরের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

এদিকে অফিস সূত্রে এবং ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শাবিতে নিরাপত্তা-কর্মী সরবরাহের জন্য যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিস লিমিটেড গত জানুয়ারি মাসে টেন্ডার পায়। পূর্বের কোম্পানির অধীনস্থ নিরাপত্তা-কর্মীদের শিক্ষাগত যোগত্যা এইট পাস থাকায় অধিকাংশ নিরাপত্তা-কর্মী শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি এই শর্তে মার্চ মাসে তাদের চাকরি হারায়। পরে শিক্ষাগত যোগত্যা এসএসসি পাস এবং ১৪ হাজার ৪৫০ টাকা বেতন জেনে শূন্য পদে যোগদান করে অনেকে। আর জানুয়ারি মাসে যারা চাকরিতে প্রবেশ করেছিল তাদের দুই মাসের বেতন ৮ হাজার টাকা করে মোট ১৬ হাজার টাকা মার্চ মাসের প্রথমে দেয়। কিন্তু বাকি টাকা তারা এখনো পায় নি।

এদিকে মার্চ মাসে যারা চাকরিতে প্রবেশ করে তাদের ভাইভা ৪ মার্চ তারিখে নেওয়া হয়েছিল। ভাইভা শেষে যোগ্য প্রার্থীরা ৩-৪ দিন পর চাকরিতে যোগদান করে। চাকরিতে যোগদানের ১২-১৫ দিন পর অনেকের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের কথা বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাদা স্টাম্পে স্বাক্ষর নেয় জাহাঙ্গীর আলম নামের যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিস লিমিটেডের এক কর্মকর্তা। তিনি নিরাপত্তা-কর্মীদের কাছে এমডি স্যার নামে পরিচিত। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরের কথামত সবাই ৫০০ টাকা করে জমা দিয়ে যমুনা ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলেন। পরে জাহাঙ্গীর আলম সবার চেক বই ব্যাংক তুলে নিজের কাছে রেখে দেয় বলে অভিযোগ যায়।

এর পরে বেশকিছু সময় পার হয়ে গেলেও তাঁরা কোন বেতন পায় নি এবং মার্চ মাসের বেতন গত মে মাসে দেওয়া হয়। এবারও ৮ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। অথচ চাকরিতে যোগদানের সময় কথা ছিল দুই ঈদের বোনাসসহ বৈশাখী উৎসব ভাতা দিবে। এনিয়ে নিরাপত্তা-কর্মীরা অসন্তোষ প্রকাশ করে। গত রমজানের ঈদের আগে একদিন দুপুরে ২টার দিকে সবাই বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে গিয়ে নিরাপত্তা দপ্তরের রেজিস্ট্রারের সাথে দেখা করেন। রেজিস্ট্রার তাদের লিখিত অভিযোগ দিতে বললে তারা উপাচার্য, রেজিস্ট্রার এবং প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগের অনুলিপি জমা দেন।

পরবর্তীতে শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ সবকিছু জানার পরে প্রক্টর অধ্যাপক জহীর উদ্দীন আহমদের মাধ্যমে নিরাপত্তা-কর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকে নতুন অ্যাকাউন্ট করতে বলেন এবং তাদের বেতন সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে হবে বলে জানান তিনি। সেই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জুলাই মাসে এপ্রিল ও মে মাসের বেতন একসাথে হয়। কিন্তু তাতেও ছিলো ঝামেলা। অনেকেই প্রতিদিন ডিউটি করেও কম বেতন পেয়েছিল।

নিরাপত্তা-কর্মীরা অসহায়ত্বের সাথে বলেন, আমরা গরীব মানুষ। আমরা দুইবেলা খেয়ে পড়ে বাঁচার জন্য এই চাকরিতে আসছি। কিন্তু মাস শেষে যদি বেতন না পাই তাহলে আমরা কোথায় যাবো?

নিয়মিত বেতন না দেওয়ার কারণ, সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর, চেক বই তুলে নেওয়া এবং বেতন কম দেওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে জাহাঙ্গীর আলমের সাথে কথার চেষ্টা করলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এর আগে ৪ সেপ্টেম্বরে এই বিষয় নিয়ে কথা বললে তিনি সকল অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, আমি অসুস্থ থাকায় বেতন সাবমিট করতে পারিনি। সেজন্য ঈদের পরেই আমি জুন মাসের বেতন সাবমিট করেছি। এছাড়াও হল গুলো থেকে কাগজপত্র এবং সকল কাগজপত্র রেডি (তৈরি) করতে বেশকিছু সময় লেগে যায়। স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর ও চেক বইয়ের ব্যাপারে বলেন, কিছু নিরাপত্তা-কর্মী আমার কাছে চাঁদা দাবি করেছিল। চাঁদা দেইনি বলে তারা মিথ্যা প্রচার করছে আমার বিরুদ্ধে।

কিন্তু জাহাঙ্গীর আলম ঈদের পরেই জুন মাসের বেতন সাবমিট করলেও বেতন তালিকায় বারবার ভুল থাকায় নিরাপত্তাকর্মীরা জুন মাসের বেতন পেয়েছে গত বুধবার।

বিষয়টি নিয়ে শাবি প্রক্টর অধ্যাপক জহীর উদ্দীন আহমদ বলেন, এই কোম্পানি এবং বিশেষ করে এই কোম্পানি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম এসকল নিরাপত্তা-কর্মীদের বেতন নিয়ে যা করছে তা চরম অমানবিক। জাহাঙ্গীর প্রথমে তাদের বেতন ১৪ হাজার ৪৫০ টাকার জায়গায় ৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে এই মর্মে অনেক নিরাপত্তাকর্মীরা অভিযোগ করেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জানার পরে যখন ব্যবস্থা নেয় এবং নতুন অ্যাকাউন্টে বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করে তখন সে আর কোন টাকা আত্মসাৎ করতে পারেনি। আর টাকা আত্মসাৎ করতে পারছে না বলেই জাহাঙ্গীর ইচ্ছে করে নিরাপত্তা-কর্মীদের বেতন নিয়ে হয়রানি করছে। এছাড়াও নিরাপত্তাকর্মীরা বিভিন্ন রকমের অভিযোগ জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে করেছে। যার সত্যতা পাওয়া গেছে।

এবিষয়ে শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের স্বার্থ যেন সংরক্ষিত হয় তার জন্য প্রশাসন কাজ করছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ...