আজ সোমবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং

৩ জেলায় ১৩ বাড়ি রতনের

  • আপডেট টাইম : অক্টোবর ২৯, ২০১৯ ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ

জেলা প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ : মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য। পেশায় ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হিসেবে বেশ কিছুদিন লাইনম্যানের কাজ করেন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি বিটিসিএলে। ২০০৮ সালে হঠাৎ নৌকার টিকিট পেয়ে আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে যান।

নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। ঢাকা, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনায় ১৩টি বিলাসবহুল বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। চলমান শুদ্ধি অভিযানে ক্যাসিনোকাণ্ডেও এমপি রতনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে অবৈধ সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। কমিশনের কাছে আলোচিত এ সংসদ সদস্যের নামে আসছে ব্যাপক তথ্য। দুদক সেগুলো আমলে নিয়ে যাচাই-বাছাই করছে। রতনের নামে দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ, অনুসন্ধান দলের একাধিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এমপি বলেন, ‘অভিযোগ তো যার বিরুদ্ধে যা খুশি আসতেই পারে। আমি এসব নিয়ে কথা বলা বাদ দিয়েছি। আমি যেহেতু জীবিত আছি; আমার আয়কর বিবরণীতে সব তথ্য দেওয়া আছে, তাই আমি এসবের কোনো জবাব দিচ্ছি না।’ ক্যাসিনো-সংশ্লিষ্টতায় নিজের নাম আসা প্রসঙ্গে রতন বলেন, ‘ক্যাসিনো কী? আমার চৌদ্দগুষ্টির কেউ ক্যাসিনোর সামনে দিয়ে হেঁটেছে কি না সন্দেহ আছে।’

রতনের অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনের উপপরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, তার বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য আসছে। যদিও তার সব আমলে নেওয়া সম্ভব হয় না।’ অনুসন্ধান দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, আমরা রতনের ১৩টি বাড়ি, ৫টি গাড়ি, দুই স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ ও দেশ-বিদেশে নামে-বেনামে সম্পদের তথ্য পেয়েছি। তার সম্পদের বিষয়ে জানার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হবে। তার ব্যাংক হিসাব তলব করা হবে। এছাড়া তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

সুনামগঞ্জের-১ আসনের সরকারদলীয় এ সংসদ সদস্যের জন্ম ধর্মপাশা উপজেলার নওদা গ্রামে ১৯৭৩ সালে। নওদা গ্রামের দরিদ্র কৃষক আবদুর রশীদ ওরফে দারোগ আলীর চার ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে রতন দ্বিতীয়। তার বাবা ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জ বাজারে রাস্তার পাশে বসে একসময় আটা বিক্রি করতেন বলেও স্থানীয়দের ভাষ্য।

১৯৮৮ সালে ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথমে ফেল করে দ্বিতীয়বার পাস করেন রতন। পরে সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। যদিও জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটে ‘বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার’ লেখা রয়েছে। সিলেট পলিটেকনিকে পড়ার সময় সিলেটের সাবেক এমপির বাড়ির ছাদের স্টোররুমে থাকতেন রতন। সে সময় তিনি ওই এমপির একটি ফোন-ফ্যাক্সের দোকান তদারকি করতেন। অভিযোগ আছে, টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যান রতন। সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলায় টেলিফোন বিভাগে তার কর্মজীবন শুরু। ওই সময় তিনি জনৈক সিভিল সার্জনের স্ত্রী বিলকিস নূরের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়ে জগন্নাথপুরে আলাদা সার্ভার বসিয়ে অ্যান্টনাবিহীন ফোনের মাধ্যমে ভিওআইপি ব্যবসা শুরু করে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন। পাওনা নিয়ে বিলকিস নূর তার বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টে মামলাও করেছেন।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে খুব একটা যুক্ত না থাকলেও বিপুল অর্থ ব্যয়ে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। এ নিয়ে দলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। এরপর প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন একতরফা নির্বাচনে পরপর আরও দুবার এমপি হন তিনি।

দুদকে প্রাপ্ত অভিযোগ মতে, রতন রাজধানী ঢাকা, সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা, নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জে ১৩টি বাড়ির মালিক। এর মধ্যে ধর্মপাশায় নিজ গ্রামে ১০ কোটি টাকায় ‘হাওর বিলাস’ নামে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বাড়িটি অধিকাংশ জমি জনৈক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তির কাছ থেকে দখল করা। সুনামগঞ্জ শহরের মল্লিকপুরে জেলা পুলিশ লাইনসের বিপরীতে ৭ কোটি টাকায় বাড়ি কেনেন রতন। যার নাম দেওয়া হয়েছে পায়েল পিউ। বাড়িটি এক লন্ডনপ্রবাসীর কাছ থেকে কিনে নেন তিনি। ধর্মপাশা উপজেলা সদরে তার আরও সাতটি বাড়ি রয়েছে। মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরেও রয়েছে দুটি বাড়ি। নেত্রকোনা জেলা শহরেও একটি বাড়ি রয়েছে। নেত্রকোনা শহরে তার মা-বাবার নামে মেডিকেল কলেজ করার জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে জমি ক্রয় করেছেন তিনি। এছাড়া ঢাকার গুলশানের নিকেতনের কয়েকটি ফ্ল্যাটের মালিক রতন। অভিযোগ মতে, গত কয়েক বছরে তার সহোদর যতন মিয়ার নামে ৫০০ একর জমি কেনা হয়েছে। ওই জমিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্টের এজন্য একটি বিদেশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তি করে প্রকল্প তৈরি করেন তিনি। কিন্তু তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। ওই কোম্পানির সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও মোটা অঙ্কের পাওনা নিয়ে দেনদরবার চলছে। তাছাড়া রতনের নিজ নামেও আছে কমপক্ষে ৬০ একর জমি।

নির্বাচন কমিশনে নিজের স্বাক্ষর করা হলফনামায় তিনি ২০০৮ সালের ২১ নভেম্বর লেখেন, তার স্ত্রী মাহমুদা হোসেন লতা ৪০ তোলা স্বর্ণের মালিক। রয়েছে ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৪ টাকার জমি। তবে স্ত্রীর কোনো আয় নেই। নিজের মোট আয় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ টাকা। মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার ৩২২ টাকা। ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর দেওয়া হলফনামায় নিজ নামে সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্ত্রী লতার পরিচয় দেওয়া হয় ব্যবসায়ী। হলফনামায় স্ত্রী লতাকে পায়েল টেক্স লিমিটেডের পরিচালক বলা হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেওয়া হলফনামায় তিনি ৫২৩ দশমিক ২৭ একর কৃষিজমি, ৮ দশমিক ২৬ একর পরিমাণের অকৃষি জমি, একটি অ্যাপার্টমেন্ট এবং নিজের ও অংশীদারিত্বের তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা উল্লেখ করেন। একাদশ নির্বাচনের আগে রতনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে স্থানীয় ২১ জন নেতা সুনামগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দাবি করেন। রতন নিজের মনোনয়ন ঠিক রাখতে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় রতন তার নামে-বেনামে থাকা রাজধানী ঢাকা, আশুলিয়া, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু জমি পানির দরে বিক্রি করেন।

সংসদ সদস্য রতনের দ্বিতীয় স্ত্রী তানভী ঝুমুর ১০ মাস ধরে বিদ্যালয়ে না গিয়েও বেতন তুলে নিচ্ছেন বলে স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান। তাহিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা তানভী ঝুমুর। বিয়ের পর স্ত্রী ঝুমুরকে ডেপুটেশনে তাহিরপুর থেকে সুনামগঞ্জ সদরের তেঘরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এক দিনের ছুটি নিয়ে গত ১০ মাস তিনি বিদ্যালয়ে যান না। চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি থেকে তিনি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলেও বেতন তুলে নিচ্ছেন।

এদিকে রতনের দুই স্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ এখন চরমে। সম্প্রতি রতন তার প্রথম স্ত্রী ও তিন মেয়েকে স্থায়ীভাবে কানাডায় রাখার জন্য নিয়ে যান। ওই সময় বিশাল আকারের সাত-আটটি স্যুটকেসে করে বিপুল অর্থ পাচার করেন বলেও জনশ্রুতি আছে। কিন্তু পরে প্রথম স্ত্রী কানাডায় স্থায়ীভাবে থাকতে রাজি না হয়ে দেশে ফিরে আসেন। প্রথম স্ত্রী দেশে ফেরার পর দ্বিতীয় স্ত্রী রাগান্বিত হয়ে রতনের ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যান।

Print Friendly, PDF & Email

নিউজটি শেয়ার করুন..

এই সম্পর্কিত আরও নিউজ